কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ

ঢাকা, শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ২ ভাদ্র ১৪২৫

কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ

দিনাজপুর প্রতিনিধি ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৮

print
কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ

কয়লার অভাবে অবশেষে বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন। পাশ্ববর্তী কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কয়লা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় রোববার রাত ১০ টায় উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিদুৎ সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের আট জেলা। এর প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও। এদিকে আশ্বাস দিয়েও কয়লা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইতিমধ্যেই অপসারণ করা হয়েছে কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিবউদ্দীন আহমদকে।

এছাড়া সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে এবং তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে।

বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তত্ববধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান জানান, ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিদুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট চালু রাখতে দৈনিক কয়লার প্রয়োজন ৫ হাজার ২’শ মেট্রিক টন কয়লা।

কিন্তু বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি চলতি জুলাই মাস থেকে কয়লার সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ইউনিট। অপর ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি ইউনিট এর আগে থেকেই বন্ধ রাখা হয়। ফলে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন তৃতীয় ইউনিটটি কোনমতে চালু রাখা হয়।

কিন্তু কয়লা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোববার দিবাগত রাতে তৃতীয় ইউনিটটিরও উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়। ফলে ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন রোববার রাত থেকেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বিদুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লি. (নেসকো) এর রংপুর জোন এর প্রধান প্রকৌশলী শাহাদৎ হোসেন সরকার জানান, রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় প্রতিদিন ৬৫০ মেগওয়াট বিদুতের প্রয়োজন। এর মধ্যে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদুৎ আসে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদুৎকেন্দ্র থেকে।

কিন্তু কয়লা সংকটের কারণে গত এক মাস থেকে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদুৎকেন্দ্রের ২টি ইউনিট বন্ধ থাকায়, সেখান থেকে মাত্র ১৫০ মেগাওয়াট বিদুৎ আসতো। এই কারণে গত একমাস থেকে বিদুতের কিছু ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এখন পুরোপুরি বিদুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ায় এই ঘাটতি আরো বাড়লো।

তিনি আরো জানান, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হলেও, বাহির থেকে বিদুৎ এনে চাহিদা পূরণ করা হবে। তবে এতে বিদুতের ভোল্টেজ কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে, সেই সাথে লোডশেডিংও হতে পারে।

জানা গেছে, একটি ফেস থেকে নতুন ফেসে যন্ত্রপাতি স্থানান্তরের জন্য গত ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবে আগামী আগস্ট মাসের শেষের দিকে। এই সময়ের মধ্যে পাশ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ রয়েছে বলে গত ২০ জুন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ।

বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের তত্ববধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান জানান, গত ২০ জুন খনি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনির কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। মজুদকৃত এই কয়লা দিয়ে আগস্ট মাস পর্যন্ত তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখা যাবে বলে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু জুলাই মাসের শুরু থেকেই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হঠাৎ কয়লার সরবরাহ কমিয়ে দেয় খনি কর্তৃপক্ষ। খনি কর্তৃপক্ষ গত ৪/৫ দিন আগে পিডিবিকে জানিয়ে দেয়, খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ শেষ পর্যায়ে। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশী দিন কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

সূত্রমতে, খনির কোল ইয়ার্ডে বর্তমানে দেড় লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে শনিবার খনির কোল ইয়ার্ডে মজুদ ছিলো মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টন কয়লা। বাকি ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন কয়লার কোন হদিস নেই। কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় পেট্রোবাংলা ও খনি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলা এক অফিস আদেশে খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

এছাড়াও ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয় এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। বড়পুকুরিয়া খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পেট্রোবাংলার পরিচালক আইয়ুব খানকে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কয়লা বিক্রিতে অনিয়মের কারণেই খনিতে কয়লার এই ঘাটতি। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অপসারণ হওয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিবউদ্দীন আহমদ জানান, এক লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা সিস্টেম লস।

তিনি দাবি করেন, গত ১১ বছরে এক কোটি ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে এর মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা সিস্টেম লস। কোল ইয়ার্ড কখনই খালি না হওয়ায় তারা এই সিস্টেম লস আগে বুঝতে পারেননি।


এটি/আরজি

 
.


আলোচিত সংবাদ