লো-ভোল্টেজে নীলফামারীতে নাভিশ্বাস, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ | ১ ভাদ্র ১৪২৫

লো-ভোল্টেজে নীলফামারীতে নাভিশ্বাস, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত

নুর আলম, নীলফামারী ১০:২৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৮

print
লো-ভোল্টেজে নীলফামারীতে নাভিশ্বাস, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত

দোকানের ফ্রিজ ঠান্ডাই হয় না। ফটোকপি মেশিন লোড নিচ্ছে না, যার কারণে বন্ধ। কম্পিউটার চালানো যাচ্ছে না। এভাবে চরম ভোগান্তি নিয়ে কমপক্ষে দুই মাস দোকান চালাতে হচ্ছে। কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারী শহরের গাছবাড়ি এলাকার কনফেকশনারী অ্যান্ড রিপন টেলিকমের স্বত্বাধিকারী রিপন কুমার মজুমদার।

শহরের শাখামাছা বাজার এলাকার চাল ও পাট ব্যবসায়ী রাজিব কুণ্ডু আক্ষেপ করে বলেন, অস্থিরভাবে দিন কাটাতে হচ্ছে। বাসায় একটি এয়ারকন্ডিশনার (এসি), কয়েকটি ফ্যান আর দু’টি টিভি। লো-ভোল্টেজের কারণে এসিতো বন্ধ, চলে না। ফ্যানও ঠিকমত ঘুরে না। আর এলইডি টিভিও চলছে না।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ঠিকমতো না পাওয়া গেলেও মাসিক বিল ঠিকমত দিতে হচ্ছে, এমনকি বেশিও দিতে হচ্ছে। আমরা সঠিক বিদ্যুৎসেবা পাচ্ছি না।

লো-ভোল্টেজের কারণে বিদ্যুৎ নিয়ে এমন নাভিশ্বাস কেবল রিপন ও রাজিব কুণ্ডুরই নয়, নীলফামারীর প্রায় তিন লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কাজকর্ম। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন।

শহরের হাজী মহসিন হক সড়কে অবস্থিত পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ডস আই’র মালিক জীবন মজুমদার বলেন, আমার রুমের ভেতরে থাকাই যায় না। এসিতো চলেই না, মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে ভেতরে। ফ্যানও কাজ করে না।

এদিকে লো-ভোল্ডেজের কারণে জেলার শিল্প-কলকারখানার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। কারণার বৈদ্যুতিক সরঞ্জমাদি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায়শই। এসবের বাইরেও নষ্ট হচ্ছে টিভি, ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা, আয়রন মেশিন, ওভেনের মতো ইলেকট্রিক পণ্য।

যমুনা পণ্যের নীলফামারী এজেন্ট তাপস সাহা বলেন, বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হচ্ছে। গ্রাহকরা শো-রুমে এনে ঠিকঠাক করে দেয়ার জন্য দিয়ে যাচ্ছেন। অন্য সময় এমনটা না থাকলেও দেড়- দু’মাস থেকে এরকম চাপ বেড়েছে।

সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন চালানো না যাওয়ায় উৎপাদনে ভাটা পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে দামী যন্ত্রাংশ।

সানিটা টাইলস নীলফামারীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিউল ইসলাম শাওন বলেন, বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে দারুণ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ইতালি থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। এগুলো দেশে পাওয়া যায় না। এছাড়া সার্বক্ষণিক জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

দেশের অন্যতম শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান নীলসাগর গ্রুপের পোল্ট্রি ফিডমিলসহ গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ১১টি ইউনিটে উৎপাদন কার্যক্রমে ভাটা ফেলেছে বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ। প্রায় দিনই সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত চালাতে হচ্ছে জেনারেটর। বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি জেনারেটরের অতিরিক্ত খরচের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

গ্রুপ সূত্র জানায়, লো-ভোল্টেজের কারণে দৈনিক ছয় ঘণ্টা করে জেনারেটর দিয়ে কারখানার কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে দৈনিক ১,৪২০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে অতিরিক্ত হিসেবে। এরমধ্যে কিশোরগঞ্জে ৩০০ লিটার, চড়চড়াবাড়িতে ১৬০ লিটার, রাজারহাটে ১৪০ লিটার, হরিশচন্দ্র পাঠে ৬৫ লিটার, হঠাৎপাড়ায় ২০০ লিটার, রামনগরে ১৯৫ লিটার, ইউথ এ্যাগ্রোতে ৪০ লিটার, চিরিরকুটিতে ৫০ লিটার, ধোবাডাঙ্গায় ৪০ লিটার, বরাইবাড়িতে ১৯০ লিটার এবং টেঙ্গনমারীতে ৪০ লিটার ডিজেল লাগছে।

নীলসাগর গ্রুপের নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা নুরে আলম ছিদ্দিক জানান, লো-ভোল্টেজের কারণে ফিডমিলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কিছুদিন থেকে। এছাড়া নষ্ট হচ্ছে ইলেকট্রিক প্যানেল বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। বিদ্যুতের স্বাভাবিক অবস্থা না থাকায় পোল্ট্রি শিল্পে ব্যাঘাত ঘটছে।

নদার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) কর্মকর্তারা বলছেন, দিনের বেলা বিদ্যুতের চলমান ভোল্টেজে তেমন সমস্যা না হওয়ারই কথা। রাতের বেলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালালে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ পাবেন না গ্রাহকরা। সেক্ষেত্রে রাতের বেলায় লো-ভোল্টেজের প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।

নেসকো নীলফামারী বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাইদ চৌধুর জানান, লো-ভোল্টেজের কারণ জাতীয় গ্রিড। সেখান থেকে বিদ্যুৎ কম আসায় সন্ধ্যার পর শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা বন্ধ রাখার কঠোরভাবে পরামর্শ দিয়েছি যাতে করে স্বাভাবিক বিদ্যুতের প্রবাহ থাকে।

লো-ভোল্টেজের বিষয়টি স্বীকার করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (মহা-ব্যবস্থাপক) প্রকৌশলী এ কে এম হাসনাত হাসান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সৈয়দপুর গ্রিডে কম বিদ্যুৎ পাওয়ার কারণে লো-ভোল্টেজ সমস্যা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি।

জানতে চাইলে সৈয়দপুর পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশনের গ্রিড ইনচার্জ সহকারী প্রকৌশলী সাহিদুল আলম বলেন, আমাদের এখান থেকে যা করা দরকার সব করা হয়েছে। সমস্যা উপরের কোথাও।

তিনি বলেন, জেনারেশন থেকে কম পাওয়া যাওয়ায় এমনটা হচ্ছে। তবে স্পষ্টভাবে কোথায় ত্রুটি জানতে চাইলে ঢাকা থেকে জানার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, নীলফামারী জেলায় নেসকো এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় তিন লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন।

এনএ/এমএসআই

 
.


আলোচিত সংবাদ