‘এইঠে রোগী নিয়া আসিলে রংপুর যাও, রংপুর যাও, কওয়া হয়’

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

‘এইঠে রোগী নিয়া আসিলে রংপুর যাও, রংপুর যাও, কওয়া হয়’

নুর আলম, নীলফামারী ৯:৪৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮

‘এইঠে রোগী নিয়া আসিলে রংপুর যাও, রংপুর যাও, কওয়া হয়’

জোড়াতালি দিয়ে একশ’ শয্যা বিশিষ্ট নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতাল চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন হাসপাতালটির তত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ড. রণজিৎ কুমার বর্মণ।

তিনি বলেন, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জনবলেই অনেক ঘাটতি এখোনো। সেখানে সেই জনবল দিয়িই চালানো হচ্ছে একশ’ শয্যার হাসপাতালটি। তার উপর আরো দেড়শ’ শয্যার অবকাঠামো যুক্ত হচ্ছে এপ্রিলে।

যদি দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল দেয়া না হয়, তাহলে চিকিৎসা সেবা দিতে আরো বেগ পোহাতে হবে বলে জানান সিভিল সার্জন।

সোমবার দুপুরে নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ‘সেবাগ্রহীতাদের মুখোমুখি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ‘ শীর্ষক উন্মুক্ত সমাবেশে নিজের অসামর্থের এসব কথা বলেন তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অনুপ্রেরণায় গঠিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)‘সেবাগ্রহীতাদের মুখোমুখি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ‘ শীর্ষক এ মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সনাক সভাপতি প্রকৌশলী সফিকুল আলম ডাবলু।

‘চাই সেবা বান্ধব আদর্শ হাসপাতাল‘ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য দেন নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আসাদ আলম।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিব) নীলফামারী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মজিবুল হাসান চৌধুরী শাহিন, সনাকের সহ-সভাপতি আজমা আহসান ও আকতারুল আলম রাজু ।

সনাক সদস্য আফরোজা বিনতে গ্লোরির সঞ্চালনায় সনাকের হাসপাতাল সেবা কার্যক্রম উপস্থাপন করেন আয়োজক সংগঠনের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ কমিটির আহ্বায়ক নাছিমা বেগম।

অনুষ্ঠানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ২শ’ জন রোগী অন্তঃবিভাগে এবং বহিঃবিভাগে কোনো কোনো দিন ৭শ’ রোগীরও সেবা দেয়া হয়। নানান সংকটের কারণে অনেক সময় আমাদের কার্যকরী সেবা দিতে বিঘœ ঘটে।  

সিভিল সার্জন রণজিৎ কুমার বর্মণ আরো বলেন, চিকিৎসক অভাবে সৈয়দপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চারজনকে এবং নীলফামারী সদরের একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে একজনকে প্রেষণে এনে আধুনিক সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগ চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন আমাদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে কোন অনাগ্রহ নেই কিন্তু সাধ্যের বাহিরে হওয়ার কারণে বিঘœ ঘটছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

সিভিল সার্জন বলেন, দেখেন হাসপাতালটিতে গুরুত্বপুর্ণ কার্ডিওলজি বিভাগ খোলা হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই। ডোমারের একজনকে এনে কোন রকম চালানো হয়, সার্বক্ষণিক কি তার থাকা সম্ভব?

আরএমও ডা. আসাদ আলম বলেন, সংকটের মাঝেও গেল জানুয়ারি মাসে বহিঃবিভাগে ৯ হাজার ৯৯জন, অন্তঃবিভাগে ১ হাজার ১১জন, সিজার  বিভাগে ১৪ জন, অর্থোপেডিক বিভাগে ৩৬ জন, সার্জারী বিভাগে ২৯ জন, নাক-কান ও গলা বিভাগে ৬ জন, চক্ষু বিভাগে ২৮ জন এবং নিউনেটাল বিভাগে ৯৬ জন চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন।

তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার কারণে সেবার মানের দিক দিয়ে দেশের মধ্যে ভালো অবস্থান করছে নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতাল। যতটুকু আছে সেটুকু দিয়ে আমরা সেবা দিচ্ছি রোগীদের।

এসময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাশেদুর রহমান রাশেদ নামে এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, ওয়ার্ডে দুর্গন্ধ, ময়লা আবর্জনা জমে থাকে, প্রস্রাব-পায়খানার স্থান অস্বাস্থ্যকর। ভেতরে থাকাই যায় না। কুকুরের উপদ্রপও দেখা যায় ভেতরে।

এটা চিকিৎসা নিরাময় কেন্দ্র হলেও অব্যবস্থাপনার কারণে এমনটা ঘটছে বলে মন্তব্য করেন রাশেদ।

আরেক অংশগ্রহণকারি আবুজার রহমান বলেন, এইঠে রোগী নিয়া আসিলে রংপুর যাও, রংপুর যাও, কওয়া হয়। তা হইলে এইঠে কি চিকিৎসা হয়। কোনো কি ডাক্তার নাই, এইঠে।

অনুষ্ঠানে কচুকাটা ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামের হাবিবা খাতুন, বানিয়া পাড়ার মেহেরুন নেছা ও নীলফামারী শহরের ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আমজাদ হোসেন শাওন তাদের বক্তব্যে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও সেবার মান এবং দুর্ভোগের চিত্র উপস্থাপন করেন।

অতিথি হিসেবে অংশ নেয়া স্বাচিব নেতা ডা. মজিবুল হাসান চৌধুরী শাহিন কর্তৃপক্ষের আরো নজরদারী বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারি সুযোগ সুবিধা অনেক বেড়েছে। সেবার মানও বাড়ানো দরকার।

কোথায় কোথায় ত্রুটি রয়েছে সেটা নিরুপণ করে উচ্চ মহলে তদবির করে সমাধান করতে হবে। তাহলে উপকৃত হবে নীলফামারীর মানুষ।

শুধু কর্তৃপক্ষই নয় সেবার মান বাড়াতে আগতদেরও সচেতন হওয়ার আহবান জানান তিনি।

এক্ষেত্রে হাসপাতালকে নিজের বাড়ি মনে করে অবস্থান করার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক নেতা।

সনাক সভাপতি সফিকুল আলম ডাবলু বলেন, হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম নিয়ে বাহিরে অনেক কথা শোনা যায়। কিভাবে পরিচালিত হয়, কি প্রয়োজন রয়েছে, তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই।

বর্তমান অবস্থান থেকে জনগণকে আমরা অবহিত করতে চাই হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম নিয়ে। যাতে করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এবং সেবা সমন্ধে জানতে পারেন গ্রহীতারা।

বিভিন্ন শ্রেণী পেশার প্রতিনিধি ছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীও মুখোমুখি অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

এনএ/এএফ