যাকাতের নিসাবের বিবরণ

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

যাকাতের নিসাবের বিবরণ

পরিবর্তন ডেস্ক ১:১১ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৭

যাকাতের নিসাবের বিবরণ

কুরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা তার অনুগত বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সূরা মুমিনূন ৬০)

অন্য এক আয়াতে ইমানদারদের সতর্ক করা হয়েছে। তারা যেন অসংযত আচরণের মাধ্যমে তাদের দান-সদকাকে নষ্ট না করে দেয়।

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করো না সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ওই বস্তুর কোনো সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সূরা বাকারা ২৬৪)

সোনার জাকাতের নেসাব হল বিশ মিসকাল (বর্তমান হিসাবে সাড়ে সাত ভরি বা ৮৭.৪৮ গ্রাম) (সূনান আবু দাউদ ১৫৭৩)

রুপার নিসাব হল ২০০ দিরহাম। (সহীহ বুখারী ১৪৪৭)। বর্তমান মাপে সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ৬১২.৩৬ গ্রাম। এ পরিমাণ সোনা-রুপা থাকলে যাকাত দিতে হবে।

নিত্যপ্রয়োজনের উদ্বৃত্ত টাকা-পয়সা বা বাণিজ্যিক পণ্যের মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল সমপরিমাণ হয়, তবে যাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৬৭৯৭, ৬৮৫১)।

যদি সোনা, টাকা-পয়সা বা বাণিজ্য দ্রব্য এগুলোর কোনটি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু এসবের একাধিক সামগ্রী এই পরিমাণ থাকে, যা একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমাণ বা তার বেশি হয়, তাহলে এক্ষেত্রে সকল সম্পদের মূল্য হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৬/৩৯৩)।

কারো কাছে কিছু সোনার অলংকার আর কিছু টাকা উদ্বৃত্ত টাকা বা বাণিজ্য-সামগ্রী আছে, যা একত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে এর যাকাত দিতে হবে।

কারো কাছে সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা বা বাণিজ্য-সামগ্রী পৃথকভাবে বা সম্মিলিতভাবে নিসাব পরিমাণ ছিল, বছরের মাঝে বা শেষ দিকে এ জাতীয় আরও কিছু সম্পদ কোনো সূত্রে পাওয়া গেল, এক্ষেত্রে নতুন প্রাপ্ত সম্পদ পুরাতন সম্পদের সঙ্গে যোগ করতে হবে। যাকাত বর্ষ পূরণ হওয়ার সময় তার নিকট যত যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকবে, পুরোটার যাকাত দিতে হবে। বছরের মাঝে যা যোগ হয়েছে তার জন্য পৃথক বছর পূর্ণ করা লাগবে না। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৭০৪০, ৭০৪৪)।

বছরের শুরু ও শেষ নিসাব পূর্ণ থাকলে যাকাত আদায় করতে হবে। মাঝে নিসাব কমে যাওয়া ধর্তব্য নয়। অবশ্য বছরের মাঝে সম্পূর্ণ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ফের যদি নিসাব সম্পদের মালিক হয়, তবে ওই সময় থেকে নতুন করে বছরের হিসাব আরম্ভ হবে এবং এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর যাকাত আদায় করতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৭০৪২, ৭০৪৪)।


যাকাত
আদায় পদ্ধতি

বছর শেষ হওয়ার পর যাকাত আদায় বিলম্ব করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে করণীয়, নিসাবের মালিক হওয়ার সময়টি মনে রাখা এবং এটি তার এক বছর পর সেই সময়েই যাকাত আদায় করা। নির্দিষ্ট সময়টি জানা থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো মাসের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়।

* যেদিন চন্দ্রবছর হিসেবে এক বছর পূর্ণ হবে, যেমন এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত, সেদিন সঞ্চিত সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়ে যায়। তাই যাকাত ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব না করে আদায় করে দেয়া উত্তম। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ১০৫৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/৭৭)।

* যে সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (২.৫%) যাকাত আদায় করা ফরজ। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস : ৭০৭৭)।

* ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত আদায় করবে।

* যাকাতের উদ্দেশে টাকা পৃথক করে রাখলেও মালিক তা প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে। তবে ওই পরিমাণ টাকার যাকাত আদায় করে দিতে হবে।

* যাকাতের টাকা আলাদা করে রাখা হয়েছে, কিন্তু ফকির-মিসকিনকে দেওয়ার আগেই তা চুরি হয়ে গেল বা অন্য কোনোভাবে নষ্ট হয়ে গেল, তা যাকাত আদায় হয়নি। ফের যাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬/৫৩১-৫৩২)।

* যাকাত গ্রহণকারীকে একথা জানানোর প্রয়োজন নেই যে, তাকে যাকাত দেওয়া হচ্ছে। যে কোনোভাবে দরিদ্র ব্যক্তিকে যাকাতের মাল দেওয়া হলে মালিক যদি মনে মনে যাকাতের নিয়ত করে, তাহলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার ২/২৬৮)।

আল্লাহ আমাদের উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন

মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান (লেখক, আলোচক ও গবেষক)

শায়খুল হাদিস জামিয়া ইসলামীয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা, সানারপাড়

খতিব বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, শারুলিয়া, ডেমরা

 

রমজান প্রশ্ন ও উত্তর: আরও পড়ুন

আরও