কুরআন তিলাওয়াত ও তারাবীর তিলাওয়াতে আমাদের অসতর্কতা

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

কুরআন তিলাওয়াত ও তারাবীর তিলাওয়াতে আমাদের অসতর্কতা

পরিবর্তন ডেস্ক ২:২০ অপরাহ্ণ, জুন ০১, ২০১৭

কুরআন তিলাওয়াত ও তারাবীর তিলাওয়াতে আমাদের অসতর্কতা

কুরআনুল কারিম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কালাম। মহান প্রভুর মহান বার্তা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা অত্যন্ত পবিত্র তারাই কেবল একে স্পর্শ করে। এটা জগৎসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’ (সূরা (ওয়াকিয়াহ ৯-৮০)।

আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি। তিলাওয়াত কুরআনের একটি বড় হক্ব।  আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেছেন, ‘(হে নবী) ওহীর মাধ্যমে তোমার প্রতি যে কিতাব নাজিল করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর।’ (সূরা আনকাবূত ৪৫)

তিলাওয়াতের গুরুত্ব অনেক, অনেক ফজিলত। তিলাওয়াতকারীর লাভ ও সওয়াবকে আল্লাহ এমন ব্যবসায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, ‘যে ব্যবস্থায় কখনো ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া লাগে না। যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে (সৎ কাজে) ব্যয় করে গোপনে ও প্রকাশ্যে। তারা এমন ব্যবসায়ের আশাবাদী, যাতে কখনো লোকসান হয় না।’ (সূরা ফাতির ২৯)

মহান আল্লাহ তায়ালার কালাম তিলাওয়াতের বিশেষ নিয়ম ও আদব রয়েছে। আল্লাহ তায়লা ইরশাদ করেন ‘কুরআন তিলাওয়াত কর ধীরস্থিরভাবে, স্পষ্টরূপে।’ (৭৩: ৪)

হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, সুন্দর সুরের মাধ্যমে কুরআনকে (এর তিলাওয়াতকে) সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। (সুনানে আবু দাউদ ১৪৬৮)।

হযরত ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেছেন, কুরআন তিলাওয়াতকারী বা হাফেজকে বলা হবে- তিলাওয়াত করতে থাক এবং উপরে উঠতে থাক। ধীরে ধীরে দুনিয়াতে তিলাওয়াত করতে। তোমার অবস্থান হবে সর্বশেষ আয়াতের স্থলে যা তুমি তিলাওয়াত করতে। (সুনানে আবু দাউদ ১৪৬৮)

এই ধীরস্থিরে সঙ্গে তিলাওয়াত কেমন হবে তা প্রিয় নবী সাঃ দেখিয়ে গেছেন।

হযরত উম্মে সালামাহকে (রাঃ) রাসুলের (সাঃ) নামাজ ও তিলাওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তার (সাঃ) তিলাওয়াত ছিল প্রতিটি হরফ পৃথক পৃথকভাবে উচ্চারিত। (জামে তিরমিজি ২৯২৩)

অর্থাত কোনো জড়তা, অস্পষ্টতা ও তাড়াহুড়া ছিল না।

সাহাবায়ে কেরামগণের তিলাওয়াতের বৈশিষ্টও এমনই ছিল। ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করতেন তারা। নিজেরা করতেন, অন্যদেরও তাগিদ দিতেন।

হযরত আলকামাহ (রাঃ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রাঃ) সঙ্গে নামাজ পড়লাম দিনের শুরু থেকে ফজর পর্যন্ত। তিনি তিলাওয়াত করছিলেন দৃঢ়তার সঙ্গে, ধীরস্থিরভাবে। (মুখতাছারু কিয়ামিল লাইল ১৩১ পৃষ্ঠা)

আলকামাহ (রাঃ) একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে (রাঃ) তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন। তিনি সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। (তিনি কিছুটা দ্রুত পড়ছিলেন)। তখন ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, আমার মা-বাবা তোমার উপর কুরবান হোক! ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত কর। এটা কুরআনের তিলাওয়াতের ভূষণ। (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল পৃ ১৩১)

হযরত ইবনে মাসউদকে (রাঃ) এক ব্যক্তি বললেন, আমি এক রাকাতেই মুফাসসালোর (সূরা ক্বাফ থেকে সূরা নাস পর্যন্ত) সব সূরা পড়ে নেই। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তখন বললেন, এটাতো কবিতা আওড়ানোর মতো পাঠ করা।

অনেক মানুষ তিলাওয়াত করে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী নিচেও যায় না। অথচ কুরআন তিলাওয়াত তখনই (পরিপূর্ণ) উপকারি হয় যখন তা অন্তরে গিয়ে বসে। (সহিহ মুসলিম ৮২২)

হযরত ইবনে আবী মুলাইকা (রাঃ) বলেন, এক সফরে মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে আমি হযরত আব্দুল্লা ইবনে আব্বাসের (রাঃ) সাথে ছিলাম। দিনভর আমরা পথ চলতাম। আর রাতে কোথাও তাবু ফেলে বিশ্রাম করতাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং খুব ধীরে ধীরে থেমে থেমে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এক একটি শব্দ স্পশ্ট ও পৃথক পৃথক শোনা যেত। আর নামাজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতেন। এমনকি তার হেঁচকির আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যেত। (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল পৃ ১৩১)

আরেক বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লা ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, তোমরা কবিতা পাঠের মতো গড়গড় করে দ্রুত কালামে পাক তিলাওয়াত করো না। নষ্ট খেজুর যেমন ছুড়ে ছুড়ে ফেলা হয়, তেমন করে পড়ো না বরং বিষ্ময়কর বাণী ও বক্তব্যগুলোতে এসে থেমে যাও। হৃদয়কে নাড়া দাও। এ ভাবনা যেন না থাকে যে, এ সূরা কখন শেষ হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৮৮২৫)।

উলামায়ে কেরাম বলেন, কুরআন তারতীলের সাথে পড়া সুন্নত হওয়ার কয়েকটি কারণ :

১. তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করা হলে কুরআনের বর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি মনোনিবেশ করা যায়।

২. আল্লাহর কালামের প্রতি অধিক সম্মান প্রদর্শিত হয়।

৩. অন্তরে অধিক ক্রিয়া সৃষ্টি করে।

সুতরাং যারা অর্থ বুঝেন না তাদের জন্যও ধীরে তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। কারণ কুরআন অর্থ বুঝতে না পারলে কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও অন্তরে ক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াতো অবশ্যই সম্ভব।

উলামায়ে কেরামগণ এ বিষয়ে একমত যে, কুরআন তিলাওয়াত খুব দ্রুত করা ক্ষেত্রবিশেষে নাজায়েজ।

আল্লামা যারকাশী (রঃ) বলেন, তারতীল মানে কুরআনের শব্দগুলো ভরাট উচ্চারণ পাঠ করা এবং হরফগুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা। অন্যথায় এক হরফ আরেক হরফের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। কারও কারও মতে এটা তারতীলের সর্বনিম্ন মাত্রা।

নামাজে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করে থাকি নামাজের ফরজ বিধান হিসেবে। কুরআন তিলাওয়াতের যে আদবসমূহ উপরে আলোচিত হলো সেগুলো নামাজে তিলাওয়াতেরে ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযোজ্য। নামাজের তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা ও ভাবগাম্ভীর্য আরও বেশি মাত্রায় থাকতে হবে। তখন এগুলো শুধু তিলাওয়াতেরই বিষয় থাকে না, বরং এই ধীরস্থিরতা ও আত্মনিমগ্নতা নামাজেরও বিষয়।

নামাজের খুশু-খুযুর জন্য তিলাওয়াত তারতীলের সঙ্গে হওয়া খুব জরুরি। তাছাড়া এত দ্রুত তিলাওয়াতের কারণে মদ্দ-গুন্নাসহ তাজবীদের অনেক কায়েদা লঙ্ঘিত হয় এবং হরফের ছিফাতের প্রতি যথাযথ লক্ষ্য রাখা যায় না। ফলে দ্রুত পড়তে গিয়ে ‘ছিন’ এর জায়গায় ‘সীন’ হয়ে যাওয়া এবং ‘তোয়া’ এর জায়াগায় ‘তা’ হয়ে যাওয়া কিংবা যেখানে টান নেই সেখানে টান হয়ে যাওয়া বা কোথাও টান আছে সেখানে টান না হওয়া মতো ভুল হয়ে যেতে পারে।

মোটকথা নামাজে এত দ্রুত তিলাওয়াত করতে গিয়ে নামাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ভুল হয়ে যেতে পারে। আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কেউ সকল উচ্চারণ ঠিক রেখে খুব দ্রুত পড়ে যেতে পারেন তার জন্যওতো নামাজে অন্তত এমনটি না করা উচিত। কারণ তাতে কুরআনের তিলাওয়াতের নূন্যতম আদবটুকুও যেমন রক্ষিত হয় না, তেমনি নামাজে খুশু-খুযু রক্ষা করাও সহজ হয় না।

ফরজ নামাজ ও অন্যান্য নামাজে আমরা কিছুটা ধীরস্থির তিলাওয়াত করে থাকি। কিন্তু রমজানে তারাবীতে এত দ্রুত পড়ে থাকি, এতই দ্রুত যে তারতীলের নূন্যতম মাত্রাও সেখানে উপস্থিত থাকে না। মদ্দ, গুন্নাহ ও শব্দের উচ্চারণে বিঘ্নিত হয়ে তিলাওয়াত মাকরূহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। অর্থের পরির্তন হয়ে নামাজ নষ্ট হয়ে যায় আমাদের অজান্তেই। আর ধ্যান মগ্নতাতো নষ্ট হচ্ছেই।

আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সুমহান কালাম পড়ছি বা শুনছি এমন ভাব-তন্ময়তা তো দূরের কথা কখন বিশ রাকাত তারাবী শেষ হবে এই চিন্তাই যেন সবাইকে তাড়িত করতে থাকে।

নামাজ বা তিলাওয়াতের যে আদবটুকু ফরজ নামাজে রক্ষা করা হয় তারাবীতে সেটুকো পাওয়া দুষ্কর। অনেকের মাঝে ধারণা জন্মে গেছে, তারাবীহ মানেই তাড়াতাড়ি পড়া। যার কারণে দেখা গেছে, যারা সূরা তারাবীহ পড়েন তারাও ভীষণ দ্রুত পড়েন।

অনেকেই মুসল্লিদের কষ্টের কথা বলে থাকেন। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, ধীরস্থিরভাবে নামাজ পড়ার কারণে আমাদের যতটুকু কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশি হয় কিয়াম, রুকু, সেজদা ও তাসবীহ দ্রুত করার কারণে।

দুই রাকাতে শেষে সালাম ফিরিয়েই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যাওয়া, চার রাকাত পড়ে খুব সামান্য সময় বসে আবার শুরু করা। অথচ সালফে সালেহীনের সময় কেমন ছিল তা আমরা পূর্বে দেখে এসেছি।

মক্কা-মদিনার তারাবীর খোঁজ নিয়ে দেখুন, সেখানে কত ধীরস্থির তিলাওয়াত, দীর্ঘ বিশ্রাম, লম্বা সময় নিয়ে তারাবী হয়। সেখানে কত দেশের, কত ধরনের, কত বয়সের মানুষ রয়েছে। অথচ আমাদের অবস্থা হলো বিরতিহীন উঠবসের মাধ্যমে বিশ রাকাত শেষ করার এক প্রতিযোগিতা।

অথচ হাদিস শরীফে কাকের ঠোকরের মতো রুকু, সেজদা করা থেকে শক্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

এর চেয়ে তিলাওয়াত ধীরে করে কিয়াম একটু লম্বা করলে, রুকু, সেজদায় সময় নিলে এবং উঠবসে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করলে কষ্ট অনেকটাই কমে যাবে।

বয়স্কদের কথা যদি বলেন, তাদের জন্যতো ধীরস্থিরতাই সহজ। তাছাড়া বৃদ্ধ ও শিশুদের কেরাত ছোট করার কথা হাসিদে রয়েছে। তাড়াতাড়ির কথাতো নেই!

এদের যদি খতম তারাবী একেবারেই কষ্ট হয়ে যায় তাহলে সূরা তারাবী পড়তে পারেন।

তারাবীর নামাজ যেমন গুরুত্বপূর্ন আমল তেমনই ফজিলতের। হাদিস শরীফে ইরশাদ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে, সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করে, আল্লাহ তায়ালা তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। (সহিহ বুখারী ২০০৯)

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, সে যাবতীয় গুনাহ থেকে নবজাত শিশুর মতো পবিত্র হয়ে যাবে। (সুনানে নাসায়ী ২২১০)

এই যে এত সওয়াবের কথা হাদিস শরীফে উল্লেখ করা হল এগুলো পাওয়ার জন্য কি আমল সহিহ ও নির্ভুল হওয়া শর্ত নয়? কিংবা আল্লাহ আমাকে এত সওয়াব দান করবেন, এর জন্য একটু ধৈর্য, একটু ধীরস্থিরতা, অন্তত সর্বনিম্ন আদবটুকু রক্ষা কারাও কি আমাদের কর্তব্য নয়?

সুতরাং আমাদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, নামাজের কিয়াম, রুকু, সেজদা ও তিলাওয়াতে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা ও নির্ভুল পড়া।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।

মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান (লেখক, আলোচক ও গবেষক)

শায়খুল হাদিস জামিয়া ইসলামীয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা, সানারপাড়

খতিব বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, শারুলিয়া, ডেমরা

 

রমজান প্রশ্ন ও উত্তর: আরও পড়ুন

আরও