আত্রাইয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘সীতাতলার মেলা’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

আত্রাইয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘সীতাতলার মেলা’

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ ৩:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

print
আত্রাইয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘সীতাতলার মেলা’

নওগাঁর আত্রাইয়ে রোববার সকাল থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সীতারাণীর স্মৃতি বিজড়িত সীতাতলার মেলা। জেলার সর্ববৃহৎ এ মেলাকে ঘিরে এখন এলাকায় চলছে উৎসবের আমেজ।

আত্রাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে নিভৃত পল্লী জামগ্রাম। বর্ষাকালে নৌকার বিকল্প কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হাঁটারও কোনো বিকল্প নেই।

তবে ভোঁপাড়া তিলাবদুরী হয়ে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও ভ্যানের যোগাযোগ কিছুটা হলেও বৃষ্টি এলে এ দুঃখের শেষ নেই। এই জামগ্রামেই সেই যুগ যুগ থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সীতাতলার মেলা। প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সীতাতলার মেলা।

কথিত আছে, শত বছর পূর্বে রামচন্দ্র তার স্ত্রী সীতা রাণীকে এই আত্রাই উপজেলার গহীন বন জামগ্রামে বনবাস দিয়েছিলেন। আর সীতা বনবাসের এক পর্যায় জামগ্রামের এ বনে একটি প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে আশ্রয় নেন এবং জীবনের বাকি সময় এ বট গাছটির নিচেই তিনি কাটিয়ে দেন।

গাছটির পাশে রয়েছে এক বিরাট ইন্দারা। সীতা এই ইন্দারার পানিতেই স্নান করতেন। বিশ্বকর্মা এক রাতেই নাকি নির্মাণ করেছিলেন এই ইন্দারা। সেই রেশ ধরেই সীতার নামেই মেলার নামকরণ করা হয়েছে ‘সীতাতলার মেলা’। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সীতাতলার মেলা জমজমাটভাবে প্রতি বছর হয়ে আসছে। শুরুর দিকে এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মেলা থাকলেও বর্তমানে আর তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এ মেলা হিন্দু, মুসলিম সকলের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।

মেলাকে ঘিরে নওগাঁসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার লোক সমাগম হয় এই মেলায়। মূল মেলা তিনদিন হলেও মেলার আগেও পরে কয়েকদিনব্যাপী চলে মেলার বেচাকেনা।

মেলাকে ঘিরে উপজেলার জামগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এখন সাজসাজ রব পড়ে গেছে। মেলা উপলক্ষে যেন আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের ধুম পড়েছে।

দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনে ভরে গেছে প্রায় প্রতিটি বাড়ি। প্রতি বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের মিঠাই মিষ্টান্ন পিঠা ও ভালো খাবারের ব্যাবস্থাও করা হয়েছে। মেলাকে ঘিরে আশপাশের গ্রামে জামাই আদর রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ঘরে ঘরে শীতের রস-পাটালির নানান পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম। ঈদে না হলেও অন্তত মেলা উপলক্ষে জামাই-মেয়েকে দাওয়াত দেওয়া এ এলাকার রেওয়াজ। জামাই মেলা থেকে বড় মাছ-মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরালয়ে যান। আর শ্বশুর জামাইকেও উপহার দিয়ে থাকেন। তাই জামগ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন জামাই, মেয়ে বিয়াই, বিয়ানসহ আত্মীয়-জনের পদচারণায় মুখরিত।

ঐতিহাসিক এ মেলাকে কেন্দ্র করে জেলা সদরসহ পার্শ্ববর্তী বগুড়া, সান্তাহার, নাটোর, জয়পুরহাট, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর লোকজন এই মেলাই বেড়াতে এসে ব্যাপক কেনা-কাটাও করে।

জামগ্রামের গৃহবধূ নিশাত আনজুমান আরা বলেন, মেলা উপলক্ষে আমার পিত্রালয় সিরাজগঞ্জ থেকেও আত্মীয়-স্বজন এসেছে তারা আনন্দ করছে। আশা করছি মেলাতে আনন্দ ও হবে গত বছরের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি।

ওই গ্রামের ব্যবসায়ী জনি সোনার বলেন, ঈদ উৎসবে জামাই মেয়ে না এলেও এ মেলার সময় তাদের নিয়ে আসতেই হয়। এদিকে মূল মেলা তিনদিন হলেও আয়োজন চলছে বেশ কয়েকদিন থেকে এবং শেষ হবার পর অঘোষিতভাবে তা চলে আরও কয়েকদিন।

এ বিষয়ে মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি মোসলেম উদ্দিন বলেন, আজ রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার এই তিনদিন সকাল-সন্ধ্যা একটানা মেলা চলবে ঐতিহাসিক সীতাতলার এই মেলাটির ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমরা প্রতি বছর এই মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

আত্রাই থানার ওসি মোবারক হোসেন বলেন, সীতাতলার মেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আনন্দঘন পরিবেশে মেলায় আসা লোকজনের নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক, গ্রাম পুলিশ ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বিএআর/বিএইচ/

 
.



আলোচিত সংবাদ