তাড়াশের ১৪৮ রাজাকারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে, ৪৮ বছরেও বিচার হয়নি

ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

তাড়াশের ১৪৮ রাজাকারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে, ৪৮ বছরেও বিচার হয়নি

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ১:২২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

তাড়াশের ১৪৮ রাজাকারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে, ৪৮ বছরেও বিচার হয়নি

মুক্তিযুদ্ধে উত্তালদেশ। স্বাধীনতার আকাঙ্খায় মুক্তিপাগল বাঙালি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। ঠিক সেই সময় সারাদেশের ন্যায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশেও একদল স্বাধীনতা বিরোধী পাক সেনাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ অপরাধে মেতে ওঠে।

একের পর এক হত্যা, গণ হত্যা ও নারী নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ চালায় তারা। লুটে নেয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের ঘরবাড়ি— এমন অভিযোগ উঠে এসছে ১৪৮ জন রাজাকারের বিরুদ্ধে। অথচ স্বাধীনতার ৪৮ পরও তাদের কে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি এমনটাই দাবি করেছেন তাড়াশ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার গাজী মো: আরশেদ আলী।

তাড়াশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কর্তৃক প্রেরীত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে ৭ নং সেক্টরের অধীনে ছিল চলনবিল অধ্যূষিত তাড়াশ উপজেলা (তৎকালীন থানা)।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পরপরই তাড়াশের কৃতি সন্তান ম.ম.আমজাদ হোসেন মিলন, আতাউর রহমান, এম. মোবারক হোসেন মিয়া ও আনসার প্রশিক্ষক আব্দুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয়ভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

এ সময় পাকিস্তান সরকারের বেতন ও অস্ত্রপ্রাপ্ত এসব রাজাকাররা  শুরু করে গ্রামের পর গ্রাম হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট। আতংক ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেয়। এ সময় এসব স্বাধীনতা বিরোধীরা পাক সেনাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে রাজাকাররা একের পর এক হত্যা করে তাড়াশের জমিদার পরিবারের সন্তান অতুল চন্দ্র গোস্বামী (হীরা লাল গোস্বামী), প্রতুল চন্দ্র গোস্বামী (চুনিলাল গোস্বামী), শিক্ষক দিনেশ চন্দ্র সিংহসহ ২৪ জন মুক্তিকামী মানুষকে।

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে তাড়াশের মুক্তিযোদ্ধাগণ ৭নং সেক্টরের অধীনে আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাব সেক্টর পলাশডাঙা যুব শিবিরে যোগ দেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক সফল অপারেশান চালালে স্থানীয় রাজাকাররা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর পলাশডাঙা যুবশিবিরের মুক্তিযোদ্ধাগণ অবস্থান নেয় তাড়াশে নওগাঁ বাজারে।

এ সময় রাজাকাররা পাকসেনাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। ভোরে পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমন করে। সেদিন ভোর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে অবিরাম গোলা বর্ষণ। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় অর্জন করেন। জীবন্ত ধরা পড়ে ক্যাপন্টেন সেলিমসহ বেশ কয়েকজন পাক সেনা। পরে তাদের কে হত্যা করা হয়। পরে বিমান হামলা জোরদার করা হলে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।

মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করার অপরাধে এর একদিন পর অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনারা তাড়াশের আমবাড়িয়া গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে গণ হত্যা চালায়। এ সময় সাংবাদিক ইয়ার মোহাম্মদসহ ১৫ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়াও তাড়াশ সদরের রাজাকার বাবু খাঁর নেতৃত্বে পাক সেনাদের ক্যাম্পে নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এরমধ্যে রয়েছেন সদ্য মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পচি বেওয়া। যার গর্ভে জন্ম নেয় একজন যুদ্ধ শিশুর। রাজাকারদের সহায়তায় পাক সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার তিন জন বীরঙ্গনা এ বছর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। লোক লজ্জার ভয়ে দেশ ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন বীরঙ্গনা নারী।

এ প্রসঙ্গে গুরুতর অসুস্থ বীরঙ্গনা নারী অর্চনা রানী সিংহ জানান, লজ্জায় ঘৃণায় মরে যেতে ইচ্ছে করে, যখন দেখি সেইসব জানোয়াররা এখনো ঘুরে বেড়ায়। তাদের সন্তানরা রাজনৈতিক সুবিধা নেয়।

শহীদ ইয়ার মোহাম্মদের ছেলে দোবিলা ইসলামপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বলেন, যারা এতো বড় গণ হত্যা চালালো তাদের বিচার স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও হয়নি, এটা সত্যিই দু:খজনক। তবে আশার কথা সরকার শীর্ষ যুদ্ধাপরধীদের বিচার করে ফাঁসি দিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বিচারের জন্য আমরা আশায় বুক বাঁধতেই পারি।

তাড়াশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার গাজী মো: আরশেদুল ইসলাম জানান, তাড়াশ উপজেলার ১৪৮ জন রাজাকারের তালিকা আমরা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়েছি। যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণ হত্যা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এখন অপেক্ষা সরকারি  সিদ্ধান্তের।

তাড়াশ উপজেলার ১৪৮ জন রাজাকারের তালিকা...

এআইআর/জেডএস

 

রাজশাহী: আরও পড়ুন

আরও