নওগাঁয় পানি কমার সাথে বাড়ছে দুর্ভোগ

ঢাকা, ২৪ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

নওগাঁয় পানি কমার সাথে বাড়ছে দুর্ভোগ

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০১৯

বসতবাড়ির অদূরে ১৫ শতাংশ জমিতে পটলের চাষ করেছিলেন দেলবর হোসেন। তার সেই খেতে এখন কোমর সমান পানি। বাঁধ ভেঙে অন্য কৃষকদের মতো তার জমিও প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে ঘরেও। ভেঙে পড়েছে বাড়ির মাটির দেয়ালের একাংশ। এ অবস্থায় স্ত্রী, দুই ছেলে নিয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর ইটের তৈরি বাড়ির দোতালায়।

আর আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ছোট যমুনার পানি বৃদ্ধি পায়নি। তবে শুক্রবার ভোর রাতে জেলার রানীনগরে বাঁধ ভেঙ্গে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।   

ভরট্ট শিবনগর গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও মাঠের পানি নামতে অনেক সময় লাগবে। ফলে পাটসহ মাঠের কোনো ফসলই এই এলাকার কৃষকের ঘরে উঠবে না। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমনও রোপন করতে পারবে না দুর্গত এলাকার কৃষক। এতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।

উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দাসপাড়া, ভরট্ট শিবনগর, চককামদেব, কয়লাবাড়ি, কশব ইউনিয়নের দক্ষিণ চকবালু ও বনকুড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য- বন্যার পানিতে তাদের ফসলি জমি থেকে শুরু করে বসতভিটা প্লাবিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও তাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবে না।

এখনও গ্রামের নলকূপগুলো ডুবে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট হচ্ছে। অধিকাংশ শৌচাগারও ডুবে গিয়েছে। ফলে পানিতে সারতে হচ্ছে প্রাকৃতিক কাজ। মানুষের কাজকর্ম নেই। আরও কিছু দিন বন্যা স্থায়ী হলে চরম বিপাকে পড়বে দুর্গত এলাকার মানুষ।

বন্যাদুর্গতদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছেনি। ফলে অধিকাংশ বন্যাদুর্গত মানুষ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

নুরুল্লাবাদ ইউনিয়নের চকহরি নারায়ণ গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। বন্যার কারণে ৩দিন কোনো কাজ নাই। বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পকেটে চাল কেনার মতো কোনো টাকা নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা এখন পর্যন্ত আমাদের খোঁজ-খবর নেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া যায়নি।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম আযম বলেন, তার ওয়ার্ডের চারটি গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ বাড়িতে পানি ঢুকে অন্তত ৪০০ পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত এলাকার লোকজন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সরকারিভাবে যেটুকু সহায়তা পাওয়া গেছে চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ইউনিয়নের ১৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত। এতে ৩ হাজার ৭৯৩ পরিবার বন্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বন্যার্ত মানুষের মাঝে দ্রুত ত্রাণ দেওয়া প্রয়োজন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আগামীকাল ইউএনও কার্যালয়ে তা জমা দেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ৬০০ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার একটা তালিকা করা হয়েছে। তবে এটি অপূর্ণাঙ্গ তালিকা। এজন্য অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে ত্রাণ পৌঁছেনি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেয়া তথ্যানুসারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পূর্নাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকেই ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে মান্দা উপজেলার কশব ইউনিয়নের চকবালু নামক স্থানে আত্রাই নদীর ডান তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যানুসারে এবারের বন্যার পানিতে ৯৩০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধানের বীজতলা ও শস্য খেত তলিয়ে গেছে। ১৫০টি পুকুর ও জলাশয়ের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৭টি ব্রিজ-কালভার্ট, ৭টি পাকা রাস্তার ৫২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্থসহ ১৬৫টি নলকূপ ও ২০০টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার জানান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। ঝুঁকি মোকাবেলা করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। এমনকি পুরো বাঁধ সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। বালুর বস্তা এবং জিওব্যাগ দিয়ে পানি চোয়ানো বন্ধে কাজ করা হচ্ছে।

এআরই

 

রাজশাহী: আরও পড়ুন

আরও