পানি সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে রাজশাহী অঞ্চল

ঢাকা, রবিবার, ১৯ মে ২০১৯ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

পানি সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে রাজশাহী অঞ্চল

বিপ্লব হাসান, রাজশাহী ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ, মে ১৬, ২০১৯

পানি সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে রাজশাহী অঞ্চল

ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে ক্রমশই দেশের উত্তরাঞ্চল পানি শূন্য হয়ে পড়ছে। ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে পানির আধার। বিশেষ করে, খরা মওসুমে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় পানির সংকট। যত দিন গড়াচ্ছে এ সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠছে। পানির নায্য হিস্যার জন্য দীর্ঘ সাড়ে ৩ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসলেও এর সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। অথচ ফারাক্কার কারণে এ অঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে সেই ব্যাপারে প্রতিবাদের ঝড় উঠে সেই ১৯৭৬ সালের ১৬ মে।

সেই দিন থেকে প্রতি বছর এ অঞ্চলে ফারাক্কা দিবস পালন হয়ে আসছে। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গঙ্গার পানির নায্য হিস্যা পাবার দাবি জানাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

 বাঁধ নির্মাণের পর সত্তর দশকের শেষের দিক থেকে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লালগোলা, মালদহসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙ্গন শুরু হয়। প্রথমদিকে বিষয়টি তেমনভাবে আমলে না নেয়ায় আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

বিষয়টি নিয়ে ভারতেও চলছে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন সংগ্রাম। কিন্ত এখনও তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি দেশটির সরকার। ফলে নদী ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় ভূমিহীনের সংখ্যা বাড়ছে। এ ঘটনা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। ২০০৮ সালের ৩০ মার্চ আদালতের চারজন বিচারপতি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জিজ্ঞাসাবাদেরও নির্দেশ দিয়েছিল। আর তা তদন্তের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট ৪ জন বিচারপতিকে মালদহ পাঠান তদন্তের মাধ্যমে গণশুনানির জন্য।

২০০৬ সালের ২৩ নভেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে জর্জকোর্ট একটি গণশুনানি করেছিল। সেখানে দেখা হয়েছিল আসলে নদী ভাঙ্গনে এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। এর পর হাইকোর্ট থেকে ফরম দেয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ ডাটা দেবার জন্য। এত কিছুর পরও ফারাক্কা নিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি এখনও। যার কারণে বছরের পর বছর মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশে পানি শূন্যতার কারণে এক চতুর্থাংশ উর্বর কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তিন কোটি মানুষের জীবনে পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। কৃষি, মৎস, সেচ ও শিল্প খাতে আনুমানিক বছরে বাংলাদেশের ক্ষতি হচ্ছে ৫০ কোটি ডলার।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত একটি বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২ হাজার ২৪০ মিটার (৭ হাজার ৩৫০ ফুট) লম্বা। যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় বানানো হয়েছিল। বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল (৪০ কি:মি:)।

ফারাক্কা বাঁধ ভারত তৈরি করে কলকাতা বন্দরকে পলি জমা থেকে রক্ষা করার জন্য। তৎকালীন বিভিন্ন সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, গঙ্গা/পদ্মার মতো বিশাল নদীর গতি বাঁধ দিয়ে বিঘিœত করলে নদীর উজান এবং ভাটি উভয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে পারে। এ ধরনের অভিমত সত্ত্বেও ভারত সরকার ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর বাঁধ নির্মাণ ও হুগলী-ভাগরথীতে সংযোগ দেয়ার জন্য ফিডার খাল খননের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে যা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার রাজ্যে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে। এটি প্রায় ১৮ কি.মি লম্বা এবং মনহরপুরে অবস্থিত।

আজ সেই ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ১৯৭৬ সালে এই দিনে মরণফাঁদ ফারাক্কা ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও স্লোগানের মাধ্যমে মরহুম মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিলেন রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে। জনসভা শেষে ভারতের ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ আন্তর্জাতিক বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এর পরও আজ পর্যন্ত এর সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। বরং ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে আজ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানির আধার কমে যাচ্ছে।

দিনটি ছিল ১৬ মে রোববার। দেশের মানুষ পায়ে হাঁটার কষ্ট, রাত যাপন আর খাবার সমস্যাকে স্বীকার করেই মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এই দীর্ঘ পদযাত্রাকে মেনে নেয় হাসিমুখে। বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতিকালে খাবারের সম্বল বলতে ছিল কোথাও চিড়া-মুড়ি, আর কোথাও সামান্য গুড়-পানি। খিচুড়ি ছিল দুপুরের একমাত্র খাবার। তাও উপচে পড়া ভিড়ের কারণে সে খাবার পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হয়েছিল কেউ কেউ।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, এই লংমার্চ আরম্ভের পূর্বে মাওলানা ভাসানি মাদ্রাসা ময়দানে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে মঞ্চে উপস্থিত হন। জনসমুদ্রে বক্তব্য রাখেন ১০ মিনিট। তার  এই বক্তব্য কেবল জ্বালাময়ী ছিল না, তাতে ছিল দিক-নির্দেশনাও।

বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, আমরা আপসে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী। ভারত যদি আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রস্তাবে সাড়া না দেয় তাহলে বিশ্বের শান্তিকামী জনগণও ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করবে। বক্তৃতা শেষে তিনি মিছিলের পুরোভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তার সহচর হিসেবে ছিলেন মরহুম মশিউর রহমান যাদু মিয়া, কাজী জাফর আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

লং মার্চের মিছিলটি রাজশাহী কোর্ট পৌঁছানো মাত্র শুরু হয় ধুলিঝড় আর মুষলধারে শিলাবৃষ্টি। দুপুর ২টায় মিছিলটি ১৮ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মধ্যহ্ন বিরতি করে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রেমতলীতে। সন্ধ্যা ৬টায় মিছিল পৌঁছায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে। নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ মাঠে সমবেত জনতা বিশ্রাম নেয়। এ সময় জনতার উদ্যেশ্যে ভাসানী ঘোষণা করেন ভারত ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না করলে তিনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু করবেন।

ফারাক্কা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ জনতাকে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছর প্রায় ৩ শ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বচক্ষে ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের দূরবস্থা দেখারও আহবান জানান। রাত্রী যাপন করেন এখানেই।

পরদিন ১৭ মে সোমবার সকাল ৮টায় লংমার্চ পুনরায় যাত্রা শুরু করে। মহানন্দা নদী পাড়ি দেবার জন্য নৌকা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেতু। বর্তমানে যেখানে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু রয়েছে। নদী পার হয়ে শিবগঞ্জ অতিক্রম করে বিকেল সোয়া ৪টায় মিছিল পৌঁছায় কানসাট গ্রামে। কানসাট হাই স্কুল মাঠে বিশাল জনসভায় সমাপনী ভাষণ দেন তিনি। এই লং মার্চের ঐতিহাসিক ঘটনার ৬ মাস পরই মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মার যান।

নদী বাঁচাও, পরিবেশ বাচাঁও আন্দোলন ও ফারাক্কা লং মার্চ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এ্যাড. এনামুল হক বলেন, ভারত আন্তজার্তিক নদী গঙ্গার ১৭টি পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। যার কারণে রাজশাহী অঞ্চলের নদী-খাল-বিলে পানি শূন্যতা দেখা দিয়েছে। এখনও শুষ্ক মওসুম শুরু হয়নি। অথচ ইতোমধ্যে পদ্মা নদী শুকিয়ে বালির চর পড়েছে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খাঁন বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে রাজশাহী আজ ক্রমশই মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময় দাবি তোলা হচ্ছে। যাতে করে সরকার সেই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্ত হচ্ছে না। যার কারণে শুষ্ক মওসুম শুরু হলেই রাজশাহী অঞ্চলে পানি সঙ্কট দেখা দিচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে এ অঞ্চলের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাত কমেছে। যার কারণে পুকুর, খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাবার কারণে পানির স্তরও ক্রমশই নেমে যাচ্ছে। আর ভারত ফারাক্কার বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে খাল-বিল, নদীনালা, পুকুর, দিঘি এখন পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।

বিএইচএস/আরপি