কড়ইতলায় তাহেরুল মাস্টারের ‘বিনা পয়সার পাঠশালা’(ভিডিও)

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

কড়ইতলায় তাহেরুল মাস্টারের ‘বিনা পয়সার পাঠশালা’(ভিডিও)

রিজভী জয়, পাবনা ৩:২৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৯

দরিদ্র পরিবারের ঝরে পড়া শিশুদের পড়াতে বিনে পয়সার পাঠশালা গড়েছেন পাবনার তাহেরুল ইসলাম মাস্টার। কোচিংনির্ভর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের যুগে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত তাহেরুল ‘মাস্টারের বিনা পয়সার পাঠশালা’।

হতদরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বাড়ি থেকে এনে পড়ান পাঠশালায়, অক্ষর জ্ঞান হলে ভর্তি করে দেন স্কুলে। মানুষ গড়ার কারিগর বয়স্ক এই মানুষটির পাঠশালাটি যেন এক সাজানো বাগান, নানা রঙের ফুল হয়ে যেখানে রঙিন হয়ে ওঠে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন।

ঈশ্বরদী পৌর এলাকার বাসস্ট্যান্ড রেলগেট ছাড়িয়ে ঈশ্বরদী-রূপপুর মহাসড়ক ধরে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে, বেশ কিছু বস্তিঘর। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ছিন্নমূল মানুষ ও দিনমজুর পরিবারগুলোর বসতি এখানে। মহাসড়কের পাশে এক কড়ই গাছের নিচে সেসব দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে, তাহেরুল মাস্টার ২০১১ সালে গড়ে তোলেন বিনা পয়সার পাঠশালা।

সরকারি-বেসরকারি অনুদানে নয়, নিজ পেনশনের টাকা থেকেই চলছে তার পাঠশালার কার্যক্রম। আট বছর আগে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু করা এ পাঠশালায় এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাহেরুল ইসলাম দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেছেন ঈশ্বরদীর বিভিন্ন স্কুলে। ১৯৭৩ সাল থেকে টানা ৩৯ বছরের চাকরি জীবনের মুক্তি মেলে ২০১০ সালে এপ্রিলে। কিন্তু শিক্ষকতার নেশা রক্তে ঢুকে যাওয়া, তাহেরুলের সে মুক্তি ভালো লাগেনি।

রূপপুর সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসরের পরও ছাত্রছাত্রীদের টানে প্রতিদিনই ছুটে যেতেন স্কুলে। তবুও পড়াতে না পাড়ার যন্ত্রণা যেন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। একপর্যায়ে বাড়ির পাশে রেলওয়ের জায়গায় কড়ইতলায় পাঠশালা খুলে সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি খোঁজেন তাহেরুল মাস্টার।

গত আট বছরে ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া গোপালপুরে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর এক পরম আত্মীয় হয়ে উঠেছেন তাহেরুল মাস্টার। বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্কুলে না যাওয়া শিশুদের নিয়ে আসেন পাঠশালায়। নিজের পেনশনের টাকায় কিনে দেন শিক্ষার্থীদের বই-খাতা-পেন্সিল।

পাঠশালার পড়া শিখে বড় হয়ে ওঠাদের ভর্তি করে দেন গ্রামের স্কুলে। দরিদ্র এসব শিশুদের প্রাইভেট কোচিংয়ের সামর্থ্য নেই। তাতে কি? তাহেরুল মাস্টার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাদের পড়া তৈরির দায়িত্ব। কখনো পুরনো ছাত্রছাত্রীরাও স্বেচ্ছাসেবক হয়ে লেগে পড়েন প্রিয় স্যারের পাঠশালায়।

শুরুর দিকে তাহেরুল ইসলামের কাজটা খুব সহজ ছিল না। কারণ, রেলওয়ের বস্তির পরিবারগুলোর শিক্ষার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। বরং বাচ্চাদের দোকান কিংবা হকার হিসেবে কাজে লাগিয়ে কিংবা ঈশ্বরদী জংশনে ভিক্ষা করিয়েও টাকা পাওয়া যেত। সেসব পরিবারে তাহেরুল মাস্টার দিনের পর দিন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে তাদের বাচ্চাদের পাঠশালায় এনেছেন, শিক্ষা উপকরণ কিনে দিয়ে আগ্রহী করেছেন পড়াশোনায়।

সরেজমিন তাহেরুল মাস্টারের পাঠশালায় গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে দেখেছি, কত সম্ভাবনাময় কচি শিক্ষার্থী, অর্থাভাবে, সচেতনতার অভাবে ঝরে পড়েছে। চাকরিজীবনেই আমার ইচ্ছা ছিল, এদের জন্য কিছু করার। চাকরি থেকে অবসরের পর তাই এ পাঠশালা তৈরি করি আমি।

উপজেলা শিক্ষা অফিস বিনামূল্যের বই দিয়ে সহযোগিতা করে। এ ছাড়া, বাকি খরচ আমি নিজেই বহন করি।

ঈশ্বরদীর পৌর এলাকার বাসিন্দা সেলিম সরদার জানান, তাহেরুল স্যারের নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছেন। এর জন্য তিনি কখনো সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেননি। সব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে তিনি পাঠশালা চালিয়ে যাচ্ছেন । স্বার্থপর আত্মমগ্ন সমাজে তিনি এক বিরল দৃষ্টান্ত।

সকাল থেকেই বহুদিনের পুরোনো সঙ্গী ভাঙা সাইকেল চেপে বেরিয়ে পড়েন পাঠশালার কাজে। সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সেও ছুটে চলেন ক্লান্তিহীন। খোলা আকাশের নিচে তাহেরুল স্যারের পাঠশালায় কখনো বাদ সাধে রোদ, ঝড় কিংবা বেরসিক বৃষ্টি। শিক্ষাগুরুর মনোবলের কাছে, সব সময়ই প্রকৃতি হেরে গেলেও সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সড়ক প্রশস্ত করতে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, পাঠশালার জায়গাটি। আর এতেই পাঠশালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দরিদ্র অভিভাবকেরা।

নতুন কোনো জায়গায় বিনে পয়সার এই পাঠশালা চালাতে সরকারের সহযোগিতা চান তারা। তাতে আশ্বাসও দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের রেল বস্তির বাসিন্দা দিনমজুর রাবেয়া খাতুন বলেন, কয়েক বছর আগে তাহেরুল স্যার আমার ছেলেকে তার পাঠশালায় পাঠানোর জন্য বলেন। আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু স্যারের চাপাচাপিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাঠাতে বাধ্য হয়। সেটা যে আমার জীবনের অন্যতম সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল তা এখন বুঝতে পারি।

শুনছি এ জায়গা থেকে পাঠশালা তুলে দেয়া হবে, তাহলে আমাদের বাচ্চাদের লেখাপড়ার কী হবে? পাঠশালার জন্য স্থায়ীভাবে জায়গা বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, শিক্ষক তাহেরুল ইসলামের পাঠশালার কথা উপজেলা প্রশাসনের কাছে শুনেছি। মহৎ এই কাজের স্বীকৃতি দিতে আমরা তাকে পুরস্কৃত করব। নতুন কোনো স্থানে পাঠশালা স্থাপনে জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

এমএ