‘রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারী দানব-অসুর নিপাত যাক’

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

‘রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারী দানব-অসুর নিপাত যাক’

রিজভী জয়, পাবনা ৯:১২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

‘রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারী দানব-অসুর নিপাত যাক’

পাবনায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে দূর্গাপূজায় একাত্তরের শহীদ পল্টুর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হলেও আলাদাভাবে নজর কেড়েছে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে টাঙ্গানো একটি ফেস্টুন।

শহীদ পল্টু ক্লাব আয়োজিত এ পূজা মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমার বিপরীতেই টাঙ্গানো হয়েছে ফেস্টুনটি। এতে লেখা রয়েছে-‘রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারী দানব-অসুর নিপাত যাক।’

সহজেই বুঝা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনকারী মিয়ানমার সরকারকে অসুরের সাথে তুলনা করে তাদের বিনাশ কামনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শহীদ পল্টু ক্লাবের সভাপতি স্বাধীন মজুমদার বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মানবিক হৃদয়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আশ্রয় দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘দেবী দুর্গা পৃথিবীর সকল অশুভ দূর করতে মর্তে আসেন। মিয়ানমারের মানুষরূপী অসুরদের বিনাশ কামনায় আমরা এ বক্তব্য তুলে ধরেছি।’ 

কাছেই আরেকটি ফেস্টুন ওঠে এসেছে মাদকবিরোধী স্লোগান। তাতে লেখা আছে-‘যে মুখে মা ডাকি সে মুখে মাদক নয়’।  মাদকের বিরুদ্ধে অসাধারণ এমন স্লোগান তুলে এনে স্থানীয় মহলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে আয়োজকরা।  

তবে মণ্ডপটিতে এবারের মূল থিম হচ্ছে দেশমাতৃকার সম্মান রাখতে প্রাণ উৎসর্গ করা সাহসী কিশোর পল্টু মোহন চৌধুরীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা। 

আয়োজকরা জানান, পল্টু মোহন চৌধুরী ছিল পাবনা পৌর এলাকার গোপালপুর মহল্লার প্রচণ্ড সাহসী এক কিশোর । ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর একটি অপারেশনে অংশ নেয়ার পূর্বে ধরা পড়েন রাজাকার বাহিনীর হাতে। সদর উপজেলার কুচিয়ামোরা এলাকায় নৃশংস নির্যাতনে তাকে হত্যা করে রাজাকার আলবদররা। 

নিজ এলাকার সন্তানের এই সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ১৯৯১ সাল থেকে শহীদ পল্টুর নামে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে এলাকাবাসী। 

শত প্রতিবন্ধিকতা আর প্রতিকূলতার মাঝেও দীর্ঘ সাতাশ বছরের ধারাবাহিক আয়োজনে এ বছরও ছেদ পড়েনি। 

স্বাধীন মজুমদার বলেন, ‘দশম শ্রেণী পড়য়া এ দুঃসাহসী শহীদ মুক্তিযোদ্ধার  পরিবারের কাছে তার কোন ছবিও নেই, কিন্তু এ কিশোর যোদ্ধার বীরত্বের কথা আমরা শুনেছি পল্টুর সহযোদ্ধাদের মুখে। আমাদের এ উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের মাঝে তার দেশপ্রেমের গল্প ছড়িয়ে দিতে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদিন এ মণ্ডপে কয়েক হাজার দর্শনার্থী আসেন। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি তারা জেনে যান শহীদ পল্টুর আত্মত্যাগের কথা।’

আয়োজকরা জানান, কোন নির্ধারিত জায়গা না থাকলেও এলাকাবাসী হিন্দু-মুসলিম সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় পাড়ায় যেখানে জায়গা মেলে সেখানেই মণ্ডপ তৈরী করে হয় পূজোর আয়োজন। তবে এ বছর পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে এসেছেন এসপি গ্রুপের কর্ণধার ব্যবসায়ী সুবল সাহা।

কেবল তাই নয়, সামাজিক দায়বোধ থেকে সচেতনতামূলক নানা ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে এবারের মণ্ডপ। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে শহীদ পল্টুর নামে দূর্গাপূজার আয়োজনকে স্বাগত জানিয়েছেন দর্শণার্থীরাও। 

গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা পাবনা কলেজের প্রভাষক ইয়াদ আলী মৃধা পাভেল বলেন, ‘গোপালপুর এলাকা থেকেই পাবনার মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। এ এলাকার প্রতিটি গলিতেই শহীদের রক্তের দাগ লেগে আছে। দেশমাতৃকার বিপদে আকাতরে বিলিয়ে দেয়া সেসব শহীদের রক্ত হিন্দু কি মুসলিমের তা বিবেচ্য নয়। এখানে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর এখানকার পূজা আয়োজনে সেটিই প্রাধান্য পেয়েছে। যা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে’

জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মলয় চাকী বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যে চেতনা নিয়ে মুক্তিয্দ্ধু হয়েছিল তার অনন্য উদাহরণ যেন শহীদ পল্টু ক্লাবের পূজা। দুর্গা পূজায় মুক্তির আনন্দ আছে, বিসর্জনের ব্যথা আছে, আছে মাতৃভক্তির শিক্ষা। শহীদ পল্টু ক্লাবের এ ব্যাতিক্রমী আয়োজন সেসবের সাথে দেশপ্রেমের চমৎকার সমন্বয়।’

নান্দনিক সাজসজ্জার প্রায় এক কিলোমিটার আলোকিত পথ পেরিয়ে এ মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনে আসছেন ভক্তরা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে পরিচিত করতে পেরে খুশি আয়োজকরাও খুঁজে পেয়েছেন আয়োজনের সার্থকতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ কেবল শহীদ পল্টু নয় সম্মানিত করেছে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের, এমনই মত স্থানীয়দের।

আরজে/আরজি