তাহেরপুরের সেই উৎসব এখন বিশ্বজুড়ে

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

তাহেরপুরের সেই উৎসব এখন বিশ্বজুড়ে

বিপ্লব হাসান, রাজশাহী ৫:৩৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

তাহেরপুরের সেই উৎসব এখন বিশ্বজুড়ে

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। বিশ্বজুড়েই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করেন। বর্তমানে দুর্গাপূজা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হলেও এর মূল যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর এলাকায়। ভারত হিন্দুদের অন্যতম দেশ হিসেবে বিশ্বময় স্বীকৃতি পেলেও দেবীদুর্গার পূজা অর্চনা প্রথম বাংলাদেশেই শুরু হয়। ক্রমশই তা ভারতসহ দুনিয়ার আনাচে-কানাচে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়য়ের লোকজন দুর্গোৎসব উদযাপন করে চলেছেন।

আজ থেকে ৫৩৮ বছর আগের কথা। যতদূর জানা যায় ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুরের আহ্বানে দেবীদুর্গা সাধারণের মাঝে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাহেরপুরের এই ঐতিহাসিক ভূমিতে শরৎকালের আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠি তিথিতে দেবীর বোধন হয়। সেই থেকে বাঙালি হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ ও তীর্থ স্থান হিসেবে খ্যাত তাহেরপুরের কংস নারায়ণের দুর্গা মন্দিরটি।

স্থানীয় হিন্দুদের সূত্রে প্রকাশ, অবিভক্ত দুই বাংলার বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার মূল যাত্রা শুরু হয় ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে। সময়টা ছিল শরৎকাল। এলাকাটি ছিল প্রাচীন জনপদের রাজশাহী জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অঁজো পাড়া গাঁ তাহেরপুরের তৎকালীন হিন্দুপাড়ায়, বর্তমানে এটি নকলেজপাড়া হিসেবে পরিচিত। সেই সময় তখনকার মুদ্রায় র্দুগাপূজার আয়োজনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯ লাখ টাকা। যার পুরোটায় বহন করেছিলেন রাজা কংস নারায়ণ। বর্তমান মূল্যে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা। আর আয়োজনটা ছিল প্রথমবারের মতো। পূজায় পুরহিতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন রাজপণ্ডিত বাবু রমেশ শাস্ত্রী। ওই সময় থেকে সময়ের ধারাবাহিকতায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতসহ সারা বিশ্বে শুরু হয় দুর্গাপূজার উৎসব।

স্বীকৃতি না দেয়া হলেও মূলত এ কারণেই তাহেরপুর এলাকাটিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান বিবেচনা করা হয়। আর সেই থেকে রাজা-জমিদাররা ব্যাপকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে দুর্গাপূজার উৎসব পালন হয়ে আসছেন। কিন্ত দুর্গাপূজা পালনের জন্য যে মন্দিরে প্রথম মুর্তিটি রেখে পূজা করা হয়েছিল সেটি তাহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ আয়ত্তে নেয়ায় পরে ২০০৪ সালের দিকে নতুনভাবে পাশেই একটি নতুন মন্দির তৈরি করে সেখানে পূজা অর্চনা হচ্ছে। এটিকে বিশ্ব মন্দির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ঝুলে আছে নতুনভাবে করা মন্দিরটি। আর কলেজের দখলকৃত মন্দিরের স্থানটি কালের সাক্ষী হিসেবে গুরুত্ব বহন করছে।

সম্রাট আকবরের শাসনামলে বার ভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া ছিলেন রাজা কংস নারায়ণ। প্রথম দিকে রাজা কংস নারায়ণের এই মন্দিরের ৬০ বিঘা জমি থাকলেও বর্তমানে দুই বিঘার মতো জমি রয়েছে।

স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের দাবি- হিন্দু ধর্মের এই তীর্থ স্থানটির সংরক্ষণ, আর এর ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করা দরকার। যার মাধ্যমে রাজা কংস নারায়ণের চালু করা দুর্গার মূল মন্দিরটি সকলের কাছে ফিরে আসবে। শুধু তাই নয়, রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুরের সকল স্থাপত্ব বিভিন্ন ভূমিদস্যুদের দখল থেকে উদ্ধার করে প্রত্নতত্ত বিভাগের আওতায় এনে সংরক্ষণ করা এবং ধংসস্তূপগুলো পুনঃনির্মাণ করে রাষ্ট্রীয় ভাবে তাহেরপুরকে হিন্দুদের তীর্থ স্থান হিসেবে ঘোষণা করারও দাবি উঠেছে।

এলাকাবাসী জানান, শারদীয় দুর্গোৎসবের উৎপত্তি স্থলেই নেই কোনো স্থায়ী দুর্গামন্দির। রাজা কংস নারায়ণ রায়ের রাজবাড়ী সংলগ্ন স্থানে নির্মিত হয়েছিল শিব মন্দির, গবিন্দ মন্দির, দশভুজা মন্দির ও দোল মন্দির। যার অধিকাংশই এখন শুধু ধংসস্তূপ। ভূমিদস্যুদের দখলেও রয়েছে রাজ সম্পদের অনেক অংশ। দশভুজা মন্দিরটিতেই রাজা কংস নারায়ণ শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা করেন। দুর্গাপূজা প্রথম এদেশে পারিবারিক বা গোষ্ঠিভিত্তিকভাবে আদীবাসীরাই সূচনা করে। কিন্তু এত বছর হয়ে গেলেও এর কোনো রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি মেলেনি। রাজা কংস নারায়ণের রাজকীয় উৎসবের পর থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মেলাও বসতো তাহেরপুর এলাকায়। সেখানে দুর্গাদেবীর প্রথম সার্বজনীন আয়োজন এবং এক মাসব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠান করায় ওই জায়গাটির নাম প্রচারিত হয়েছিল দুর্গাপুরী হিসেবে। শীব মন্দিরটি আজও তার স্বাক্ষর বহন করছে।

তার সেই ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে বাগমারা আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক সেই শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরে স্থাপন করছেন অষ্টধাতু দিয়ে ব্রোঞ্জের তৈরি দুর্গাদেবীসহ ৫টি প্রতীমা। ফলে পুনরায় নতুন রূপে দেখা মিলছে মন্দিরটি। এমন নতুন রূপ পাওয়ায় আনন্দিত স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়। মন্দিরে রাখা অষ্টধাতু দিয়ে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রতীমা দেবীর পূজা অর্চনার মধ্য দিয়েই উদযাপন হচ্ছে দুর্গোৎসব। গত ১১ অক্টোবর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাগমারা আসনের সংসদ সদস্য।

মন্দির কমিটির সদস্য বিজয় চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, তার জন্মের ছয় বংশধর আগে থেকে এই পূজা করে আসছেন। বাপ-দাদার সেই ধর্মকে আজও পালন করে আসছেন। উৎপত্তি লগ্নে এক মাসব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজা করলেও বর্তমানে পাঁচ দিনব্যাপী উদযাপন করা হয় বলে জানান তিনি।

হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, এটা সত্যিই আনন্দের বিষয় যেখান থেকে দুর্গাদেবীর পূজা অর্চনা শুরু সেই মন্দিরে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রতীমা স্থাপন করে তার ইতিহাসকে ধরে রাখার প্রয়াস করা হচ্ছে। আগামীতে এই ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাছাড়াও এলাকাটিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেবারও দাবি জানান এই হিন্দু নেতা।

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুরের সেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রকৃত ইতিহাস যুগযুগান্তর ধরে রাখার জন্য স্থানীয়রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যে প্রয়াস চালাচ্ছেন তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অষ্টধাতু দিয়ে ব্রোঞ্জের প্রতীমা তৈরি করে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রতীমা স্থাপনের ফলে তাদের মাঝে একটা উৎসাহ কাজ করবে। বর্তমানে রাজার সেই মন্দিরকে বিশ্বমন্দির করার জন্য সবধরনের প্রচেষ্টা চলছে। তা করা হলে এটা একটা হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য সারাবছর ধরে তীর্থ স্থানে পরিণত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বরেন্দ্র জাদুঘরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিভিন্নভাবে দুর্গাদেবী আবির্ভূত হয়েছেন। তবে দুর্গাদেবীর আনুষ্ঠানিকতা বাংলাদেশের তাহেরপুরেই প্রথম শুরু হয়। আগে দুর্গাপূজার যে অর্চনা করা হতো তা ছিল কেবল পারিবারিক মণ্ডলে। তবে শারদীয় উৎসব তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ণ বাহাদুর শুরু করেছিলেন প্রথম। রাজা কংস নারায়ণের পিতলের মূর্তিটি রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘরে রাখা আছে। কৃত্তিবাস ১৫ শতকের মাঝামাঝি রামায়নের একাংশের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন যে পাথর খণ্ডে বসে, তাও রাখা আছে বরেন্দ্র জাদুঘরে।

বিএইচএস/এএল/