রাজশাহীতে ৪ শোধনাগারই বিকল, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পানি

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৫ পৌষ ১৪২৫

রাজশাহীতে ৪ শোধনাগারই বিকল, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পানি

বিপ্লব হাসান, রাজশাহী ৪:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮

রাজশাহীতে ৪ শোধনাগারই বিকল, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পানি

মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে চাহিদা। সরবরাহের ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়। কারণ সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ পাইপলাইন রয়েছে ড্রেনের মধ্যে। তাও আবার দীর্ঘদিন পরিষ্কার ও সংস্কার না করায় কোনো কোনো স্থানে ছিদ্র হয়ে ঢুকছে ময়লা আবর্জনা। আর এমন সব পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানি মানুষকে খাওয়ার জন্য দেয়া হচ্ছে হোটেল-রেস্টুরেন্টে।

মূলত সরবরাহকৃত পানি থালা-বাসন, কাপড়সহ অন্যান্য সামগ্রী ধোয়ার উপযোগী বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। এমন চিত্র পুরো রাজশাহী মহানগরী জুড়েই।

তবে মানতে নারাজ হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিকরা। তারা বলছেন- খেতে আসা অতিথিদের জন্য ফিল্টার পানি রয়েছে। ইচ্ছে করলে যে কেউ কিনে খেতে পারেন।

অন্যদিকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে বর্তমানে সরবরাহকৃত পানি ফুটিয়ে খাবার জন্য। মূলত পাইপলাইনগুলো নিয়মিত সংস্কার ও মেরামত না করার কারণে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া থেকে। আর এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে ২০০৬ সালের পর থেকেই। গভীর নলকূপে উত্তোলনকৃত পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকায় তা শোধন করে সরবরাহেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্ত মহানগরীর পানি শোধনাগারগুলো এখন অকেজো হয়ে আছে। ফলে পাইপ-লাইনে সরবরাহকৃত মুয়লাযুক্ত পানি খেয়ে অনেককেই ভুগতে হচ্ছে পেটের পীড়াসহ নানা অসুখে।

রাজশাহী মহানগরীতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৩৭ সালে মহারাণী হেমন্ত কুমারীর আমলে। এরপর রাজশাহী পৌরসভা ও পরে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা হলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয় এবং চাহিদামতো বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য বাস্তবায়ন করা হয় বিভিন্ন প্রকল্প।

এসবের মাধ্যমে চাহিদার ৬৫ ভাগ পানি সরবরাহ সম্ভব হয়। তবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠার জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ২০০৪ সালে ৩টি ও ২০০৭ সালে ১টি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) পানি শোধনাগার চালু করে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় এর সুবিধা খুব বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি মহানগরবাসী। বর্তমানে ৪টি পানি শোধনাগারই বিকল হয়ে পড়ে থাকায় পাম্পে তোলা অস্বাস্থ্যকর পানি পান করছেন নগরবাসী। এই শোধনাগারগুলো বন্ধ হওয়া নিয়ে সিটি কর্পোরেশন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করে। শুধু তাই নয় দীর্ঘদিনের পানি সমস্যা সমাধানের জন্য ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মহানগরীর শ্যামপুরে পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে স্থাপন করা হয় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান পানি শোধনাগার। শোধনাগারটি নির্মাণ করার পর ২০১৩ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত পানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর অবস্থা নাজুক। শোধনাগারটি থেকে এখন পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এত কিছুর মাঝেই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনের পানি বিভাগকে সম্পূর্ণ আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করা হয় রাজশাহী ওয়াসা। কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষও গেলো ৭ বছরে মহানগরীর চাহিদার শতভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ পারিবারিক কাজে ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানি একমাত্র ভরসা হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীতে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত পানিতে আয়রনের পরিমাণ বেশি। খুব কম এলাকা রয়েছে যেখানে উত্তোলনকৃত পানিতে এর পরিমাণ কম। ১৯৯৫ সালের দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হয় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে সেই সময় পানি সরবরাহকৃত পাইপলাইন বছরে অন্তত একবার হলেও পরিষ্কারের উদ্যোগ নেয়া হতো। যার কারণে তুলনামূলক কম হলেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ পেয়েছে নগরবাসী।
তবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠার জন্য রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৪ সালে ৩টি ও ২০০৭ সালে ১টি পানি শোধনাগার চালু করে। কিন্তু বর্তমানে ৪টি পানি শোধনাগারই বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পদ্মা নদী থেকে পানি শোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নেয় ওয়াসা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগরীতে হোটেল-রেস্টুরেন্ট রয়েছে ৮৩টা। এই হোটেলগুলোতে খাবার জন্য যে পানি দেয়া হয় তা পাইপ লাইনের সরবরাহকৃত। এই পানি হাত-মুখ, কিংবা থালা-বাসন ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। হোটেলগুলোতে নিজস্ব টিউবয়েলের কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁতেই ফিল্টার করা (মিনারেল ওয়াটার) পানি পাওয়ারও সুযোগ নেই। এ অবস্থায় হোটেল-রেস্তোরাঁয় আসা মানুষ বিপাকে পড়েছেন। যাদের টাকা আছে তারা বোতলজাত বা ফিল্টার পানি কিনে পান করার সুযোগ পেলেও নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে খাচ্ছেন পাইপলাইনের পানি।

কোনো কোনো হোটেলে ফিল্টার করা পানির জন্য গুনতে প্রতি প্লাসে এক টাকা করে। সাধারণ মানুষ এক টাকার বিনিময়ে এক গ্লাস পানি পান করতে চাইলেও বেশিরভাগ হোটেলেই সেই ব্যবস্থাও নেই। হয় ১৫ টাকা দিয়ে বোতল কিনে খেতে হবে, না হয় পাইপ লাইনের পানিই ভরসা। এনিয়ে হোটেল মালিকদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। তারা ক্রেতাদের সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন, পাইপের পানি পান করলে করেন, না করলে বাইরে গিয়ে কিনে খান। এমন আচরণে অনেক ক্রেতাই ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু কিছুই করার নেই। মহানগরীর রেলগেট বিন্দুর মোড়, দড়িখড়বোনার মোড়, বর্ণালী মোড়, রেল স্টেশন, সাহেব বাজার, লক্ষ্মীপুর, কোর্ট চত্বরসহ মহানগরীর সব এলাকার হোটেলগুলোতেই দেখা যায় ট্যাপের পানি বালতি বা বড় ড্রামে ভরে রাখা হয়। ওই পানি দিয়ে হোটেলের যাবতীয় কাজের পাশাপাশি মানুষকে পান করতে দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হোটেল কর্মচারী জানান, দিনে প্রায় ৭-৮শ জন লোক খেতে আসে। এতো লোকের জন্য টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসা সম্ভব না। তাছাড়া আশপাশে টিউবওয়েলের সঙ্কট রয়েছে। তারপরও ক্রেতাদের সাধ্যমতো পরিষ্কার পানি পান করানোর চেষ্টা করি। তাদের দাবি- ওয়াসার পানি পান করলে কোনো সমস্যা নেই। ড্রামে পানি রাখলেও পরিষ্কার থাকে। কিন্তু তলার কিছু পানি ময়লা হয়। সেটা ফেলে দেয়া হয়।

মহানগরীর কুমারপাড়া এলাকায় আলিম নামের এক কলেজ ছাত্র অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদিন সকালে কোচিংয়ে যাওয়ার সময় বিন্দু-২ হোটেলে খাই। কিন্তু একদিনও ভাল পানি পান না। প্রথমে এক গ্লাস পানি দেয় সেটা নাকি ফিল্টার। সেই পানিতেও ময়লা দেখা যায়। হোটেল কর্মচারীদের বিষয়টি জানালে তারা বলেন, এর চেয়ে ভালো পানি নেই। ভালো খেতে হলে বোতলজাত পানি খেতে হবে।

মহানগরীর হেতেমখাঁ এলাকায় ছাত্রীনিবাসে থাকা কলেজ ছাত্রী পাপিয়া বলেন, রাজশাহীতে প্রায় ৪ বছর যাবৎ আছি। এ পর্যন্ত কোনদিন হোটেলের ভালো পানি পাইনি। ভাল না জেনেও বাধ্য হয়েই পান করতে হয়। আর যখন টাকা থাকে তখন বোতল কিনে খাই।

রিকশা চালক আব্দুল জব্বার বলেন, উন্নত মানের হোটেল বা রাস্তার পাশের ফুটপাতের হোটেলগুলোতে পানির যে অবস্থা তাতে পান না করাই ভালো। পানিতে ময়লা থাকে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।

মহানগরীর উপশহর নিউমার্কেট এলাকার হোটেল মালিক রিপন বলেন, হোটেলটি প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ২টা পর্যন্ত চলে। যার কারণে ড্রামে পানি লোড করে রাখতে হয়। আর ওয়াসা ঠিকমতো লাইন পরিষ্কার করে না। যার কারণে আয়রন ও অনেক ময়লা বের হয়। ময়লা বের হলেও তাদের কিছু করার থাকে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজশাহী ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পারভেজ মাহমুদ জানান, মহানগরীতে দৈনিক ১ কোটি ৩৫ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে ৬১০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ৪০ হাজার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকের ৭২ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। মহানগরীতে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর পানি সরবরাহ এবং সুয়ারেজের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ওয়াসা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মাস্টারপ্লান বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এখন মহানগরীর ৩০ ওয়ার্ডের ১০৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় একটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ৯০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ৯ লাখ নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওয়াসার পানি পান নগরবাসী।

তিনি জানান, পাইপ লাইনে সরবরাহকৃত পানিতে ময়লা আবর্জনা রয়েছে। তবে পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৫০টি স্থান চিহ্নিত করে তার পরিষ্কার করা হয়েছে। মশুলত পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকায় পাইপ লাইনে ময়লা জমছে। তবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ইতমধ্যে জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুরে একটি পানি শোধনাগার স্থাপন করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদও হয়। পদ্মা নদীর পানি পাইপের মাধ্যমে এনে তা শোধন করে পুরো মহানগরীতে সরবরাহ করা হবে। তখন মহানগরবাসী বিশুদ্ধ পানি পাবে এবং পানির সঙ্কট থাকবে না বলে জানান ওয়াসার এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

ওয়াসার সচিব সফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আগের তুলনায় এখন কিছুদিন পরপর পানির লাইন পরিস্কার করা হয়। যে এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া যায় সাথে সাথে ওই এলাকার পানির লাইন পরিস্কার করা হয়। আর যখন পরিস্কার করা হয় তখন একটু ময়লা চারিদিকে চলে যায়।

তিনি আরো বলেন, সরাসরি সাপ্লাইয়ের পানি না পান করাই ভাল। কারণ সব সময় পানির লাইন পরিস্কার থাকে না। এতে ময়লা জমে। যার কারণে সাপ্লাইয়ের পানি পান করলে ফুটিয়ে করাই ভাল। এছাড়াও ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের পাইপ বসানোর কাজ শুরু করা হচ্ছে। আগামীতে এতে পানি খুব বেশি ময়লা হবে না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক খলিলুর রহমান জানান, বর্তমানে মেডিসিন বিভাগে যেসব রোগি ভর্তি হয় তাদের বেশিরভাগই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। পাইপ লাইনে সরবরাহকৃত পানি ফুটিয়ে খেলে এবং একটু সচেতন হলেই এসব রোগ থেকে দুরে থাকা যায় বলে জানান তিনি।

বিএইচএস/এএল/