পদ্মায় বাড়ছে পানি, ডুবছে নিম্নাঞ্চল

ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

পদ্মায় বাড়ছে পানি, ডুবছে নিম্নাঞ্চল

বিপ্লব হাসান, রাজশাহী ৬:০৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

পদ্মায় বাড়ছে পানি, ডুবছে নিম্নাঞ্চল

প্রতিদিন বাড়ছে পানি। বিপদসীমা ছুঁইছুঁই। একের পর এক ডুবছে নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়ছে একাধিক পরিবার। স্রোতের তোড়ে ভাঙছে নদীর পাড়। গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে শেষ সম্বল বসতবাটি আর আবাদি জমি। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মাঝে।

রাজশাহী জেলা সদরসহ চারটি উপজেলায় পদ্মার দুই কূলে বিরাজ করছে এমন পরিস্থিতি।

পদ্মায় গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উজান থেকে ধেয়ে আসা জলরাশির তোড়ে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পানি বাড়ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন পদ্মা তীরবর্তী ও চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরা। ইতোমধ্যে নিচু এলাকা ডুবে গেছে।

বিশেষ করে মহানগরীর শ্রীরামপুর থেকে পঞ্চবটির বিভিন্ন এলাকা। এছাড়াও সীমান্তবর্তী চরগুলোতেও দেখা দিয়েছে বন্যা। যদিও পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নীচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষের।

রাজশাহী মহানগরীসহ পদ্মা পাড়ের পবার চরখিদিরপুর ও গোদাগাড়ীর চর আষাঢ়িয়াদহ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে চরম দুভোর্গের মুখে পড়েছেন বন্যায় প্লাবিত পরিবারগুলো।

ইতোমধ্যে মহনগরীর নিম্নাঞ্চলসহ ওই দুই এলাকার তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন ওই পরিবারের সদস্যরা।

বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দারুণ দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। গবাদিপশু রাখার মতোও জায়গা নেই তাদের। কোথাও কোথাও ঘরের চালার ওপর পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। নলকূপ ডুবে যাওয়ার এলাকার মানুষ খাবার পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। উপায়হীন হয়ে তারা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে পানি বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে মহানগরীর পদ্মা তীর সংলগ্ন সিমলা পার্ক, লালন শাহ পার্ক, পদ্মা গার্ডেন, বড়কুঠি, কুমারপাড়া, আলুপট্টি, এলাকায় বাঁধের উচ্চতার অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে পানি।

এছাড়াও মহানগরীর পঞ্চবটি, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন নিচু এলাকাগুলোতে পানি উঠে গেছে। চরাঞ্চলগুলোতেও দেখা দিয়েছে বন্যা। বিশেষ করে পবা, গোদাগাড়ীর পাশাপাশি বাঘা, চারঘাট উপজেলার কয়েকটি চরে বন্যা দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এদিকে অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে জেলার চারঘাট ও বাঘায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বাঘার চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পড়াশোনা নিয়ে বিপাকে পড়েছে স্কুলটির প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন জানান, হঠাৎ পদ্মার পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে অনেকের সব কিছু বিলীন হয়ে গেছে। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে দিনপার করতে হচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর অধিকাংশ মানুষ দিন মজুর ও কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় আয় রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। আশে পাশের গ্রামের লোকজনও বন্যা আতঙ্কে দিন পার করছেন।

চরখিদিরপুরে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের নিম্নাঞ্চলের শতাধিক বাড়ি পানিবন্দী হয়ে আছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ার কারণে অনেকে গো-খাদ্য ও গৃহস্থালির তৈজসপত্র একটি গরুর গাড়ির ওপরে তুলে রেখেছেন।

গ্রামের বন্যায় কবলিত বেশির ভাগ বাড়ির মেঝেতে পানি উঠেছে। অনেকেই ঘরের বরান্দায় মাচা তৈরি করে ও চৌকি পেতে সেখানেই রান্না খাওয়া, সেখানেই ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছেন। যাদের বাড়িতে মাচা করার মতো পরিবেশ নেই, তারা আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। গ্রামের প্রায় সবকটি নলকূপের গলা পর্যন্ত পানি উঠেছে। এ জন্য এলাকাবাসী খাবার পানির সঙ্কটে ভুগছেন।

গোদাগাড়ীর উপজেলার চরআষাড়িয়াদহের চরবয়ারমারী আমিনপাড়া গ্রামের ৫০টি পরিবার পানিতে নিমজ্জিত। ভাঙনের ফলে বিলীন হয়েছে গ্রামের আরও প্রায় ৩০টি বাড়ি। এসব বাড়ির বাসিন্দারা গবাদিপশু নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস শুরু করেছেন।

চর খিদিরপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তার হোসেন (৬০) বলেন, দিনদিন পানি বাড়ছেই। তাদের ঘরের ধান, কলাই, মসুর পানিতে ভিজে গেছে। গরু ছাগল নিয়েও পড়েছেন বিপাকে। তাই সাতটা ছাগল ও তিনটা গরুকে বাঁচানোর জন্য সীমান্তের কাছে অবস্থান করছেন।

মহানগরীর খরবোনা এলাকার নয়ন প্রামানিক জানান, ২৫ থেকে ৩০টা বাড়ি সরিয়ে নিয়েছে স্থানীয়রা। তারা বাঁধের উপরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছেন।

গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য মাসুদ রানা উজ্জ্বল জানান, গত ১৫ দিনে টানা পদ্মার পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে করে চরবয়ারমারী আমিনপাড়া গ্রামের ৩৫টি বাড়িঘর পুরোটাই পদ্মায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছে। ১৫টির অধিকবাড়ি বিলিনের পথে। শুধু বাড়ি ঘর না এই গ্রামের একটি বড় জামে মসজিদ ও প্রায় ৫০ বিঘার আবাদি জমি পদ্মার বুকে চলে গেছে। ফলে গ্রামটির ৫০টির অধিক পরিবারের প্রায় ৩০০ জন লোক চরম আতঙ্কের মধ্য দিন পার করছেন।

মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরমান আলী দাবি করেন, তার এলাকার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৫ শতাধিক বসতবাড়িতে পানি ঢুকেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাকে জানিয়েছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল আকতার জানান, চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বন্যার কথা অবগত হয়েছে। চেয়ারম্যানকে ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক তালিকা করতে বলেছি।

তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু এখনও তেমন বড় ধরনের হুমকির কারণ হয়ে উঠেনি।

পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ নেওয়াজ জানান, ইতোমধ্যে তিনি চরখিদিরপুর ও পার্শ্ববর্তী মধ্যচর পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি সেখানকার বন্যাকবলিত ৫০টি পরিবারের প্রত্যেকটিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ২ হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল প্রদান করেছেন।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক জানান, রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। গেল ১৫ বছরে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে মাত্র দু’বার। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা ৯ বছর পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। কেবল ২০০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ মিটার। এরপর ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৭০ মিটার। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট পদ্মার পানির প্রবাহ উঠেছিল সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৪১ মিটার।

তিনি জানান, গত দু’সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ সেন্টিমিটার করে পদ্মার পানি বাড়ছে। মহানগরীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা গত ২৪ ঘণ্টায় ২ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, প্রতিবছর বর্ষায় ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়া থাকে। ফারাক্কা বাঁধের পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ৫০ হাজার কিউসেক। এর অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে পারে না। ফলে বর্ষণের পানি ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে এসে পদ্মার পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা আরো বাড়তে পারে। তবে বন্যা নিয়ে এখনো আমরা শঙ্কিত নয়। যদিও দিল্লি থেকে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পদ্মায়ি প্রতিদিন পানি বাড়লেও শহর রক্ষা বাঁধের কোথাও কোনো ধরনের ক্ষতি হলেই তা অস্থায়ীভাবে সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিএইচএস/এসবি
উজানের ঢলে বাড়ছে পদ্মার পানি, বন্যার শঙ্কা