বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা শেষ, কাল বসছে বউমেলা  

ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা শেষ, কাল বসছে বউমেলা  

আলমগীর হোসেন, বগুড়া ১১:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

print
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা শেষ, কাল বসছে বউমেলা  

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বগুড়ার গাবতলীতে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা শেষ হলো আজ। মেলাকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলসহ বগুড়া জেলা ও গাবতলী উপজেলাজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। সবার ঘরে ছিল আনন্দ হাসিখুশির বাৎসরিক পোড়াদহ মেলা উৎসবের দিন। পুলিশ প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বগুড়া গাবতলীর ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।

এবারের মেলায় আসা দেশি-বিদেশি সমুদ্রের বড় বড় বাঘার, কাতল, বোয়াল, চিতল, রুই, গুজি, ব্রিগেড, সিলভার ইত্যাদি মাছ থাকলেও ইলিশ মাছ চোখে পড়েনি।

গাবতলীর চকমড়িয়া গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী ভোলা, বিশাল আকৃতির মাছ মেলায় নিয়ে এসেছেন। যমুনা নদীর ৮০ কেজি ওজনের বাঘাইড় কেটে বিক্রি করছেন ১২০০ টাকা কেজি দরে। আর ১০০ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির মাছটি বিক্রি হবে ১২৫০ টাকা কেজিতে।

এছাড়া এই মেলায় ১৭ কেজি ওজনের বোয়াল মাছের দাম হাঁকানো হয়েছে প্রতি কেজি ১৬০০ টাকা, ১৫ থেকে ১৮ কেজি ওজনের কাতলা মাছ ২২০০ টাকা কেজি, ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের কাতলা মাছ ১২০০ টাকা, ১০ কেজির উপরে আইড় মাছ ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রুই, পাঙ্গাস, ব্রিগেড অন্যান্য জাতের মাছ উঠেছে মেলায়।

জানা যায়, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ী বন্দরের পূর্বধারে গাড়ীদহ নদী ঘেঁষে পোড়াদহ নামক স্থানে সন্ন্যাসী পূঁজা উপলক্ষে ১ দিনের জন্য ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা বুধবার অনুষ্ঠিত হয়। মেলা চত্বর এলাকায় কাল হবে বউমেলা। প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার মেলাটি উদযাপিত হলেও এবার ফাগ্লুন মাসের প্রথম বুধবারে অনুষ্ঠিত হলো। মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছিল আশপাশের গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ। একদিনের মেলা হলেও উৎসব চলে সপ্তাহজুড়ে। মেলায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে।

এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে থেকে মেলাটি উদযাপিত হয়ে আসছে। ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবে মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত না দিলেও পোড়াদহ মেলায় দাওয়াত দিয়ে ধুমধাম করে খাওয়াতে হয়, যা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

এবারের মেলার মূল আকর্ষণ ছিল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ, কুল (বরই), কাঠের তৈরি ফার্নিচার। বিক্রি হয়েছে হাজার হাজার মণ হরেক রকমের ছোট-বড় মিষ্টি।

এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, কৃষি সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্য হাট-বাজারের আগের মতোই বেচাকেনা হয়েছে। মেলায় শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও মটরসাইকেল এবং ট্রেন খেলাসহ নানা রকমের বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। কাঠ-বাঁশ ও মাটির তৈরি পুতুল-খেলনা ও বেলুনসহ হরেক রকমের জিনিস বিক্রি হয়েছে বেশি।

সবার সমাগমে জমে উঠেছিল পোড়াদহ মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় হিজড়াদের সমাগম ছিল আগের মতোই। ফলে উপস্থিত শতাধিক হিজড়ার জন্য ছিল ‘পোড়াদহ উৎসব মেলা’।

মেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।

মেলার প্রধান আয়োজক সাইফুল ইসলাম মন্ডল জানান, প্রশাসনের সহযোগিতায় পোড়াদহ মেলা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. আহসান হাবিব জানান, মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহযোগিতা ছিল। ফলে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মেলাটি উদযাপিত হয়েছে।

মেলায় ১০ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির মিষ্টিসহ বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি বেচাকেনা হয়েছে। এছাড়াও কাঠ ও স্টিলের ফার্নিচার গতবারের চেয়ে এবার মেলায় কম উঠেছে। প্রতি বছরের মেলায় লাখো মানুষের ভীর থাকলেও এবারের মেলায় মানুষের মধ্যে তেমনভাবে সাড়া পড়েনি। তারপরও মেলায় হাজারো মানুষের ভিড় ছিল।

এবারের মেলায় মাছ, মিষ্টি, বড়ই (কুল), ফার্নিচার কসমেটিকসহ যেসব জিনিস বেচাকেনার জন্য উঠেছিল, তার থেকে প্রায় ২৪/২৫ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এছাড়াও গাবতলীর দুর্গাহাটা, দাড়াইল বাজার, বাইগুনি হাটসহ বিভিন্ন বাজারে বাজারে মাছসহ মেলা বসেছিল। বিপুল উৎসাহ- উদ্দীপনার মধ্যে আশপাশের বাড়িতে আসা আত্মীয়-স্বজনের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ী বন্দর সংলগ্ন পোড়াদহ নামক স্থানে প্রায় চারশত বছর আগে স্থানীয় সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে গাড়ীদহ নদী ঘেঁষে সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে একদিনের জন্য মেলাটি আয়োজন করেছিলেন। এর পর থেকে প্রতি বছর মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে এক দিনের হলেও মেলাটির জনপ্রিয়তা থাকায় মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়।

পূর্ব বগুড়া তথা গাবতলীর ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ নামক স্থানে পোড়াদহ মেলা নামে পরিচিত এটি। মেলাকে ঘিরে এখনও আনন্দের জোয়ার বইছে আশপাশের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে। এ মেলায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে কেনাবেচা করে থাকেন। ঈদ বা কোনো উৎসবে জামাই-মেয়েসহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত না দিলেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না। তবে মেলা উপলক্ষে সবাইকে দাওয়াত না দিলে এবং না আনলে নাকি আত্মার তৃপ্তি হয় না।

গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল বাসার জানান, মেলায় জুয়া-অশ্লীল নাচ-গান চলতে দেয়া হয়নি। পোড়াদহ মেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে ছিল পুলিশ।

এএইচ/এএল

 
.


আলোচিত সংবাদ