মাটি আমাদের, আমরা মাটির

ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫

মাটি আমাদের, আমরা মাটির

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী ৬:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

print
মাটি আমাদের, আমরা মাটির

মাটি বা মৃত্তিকা হলো পৃথিবীর উপরিভাগের নরম ও দানাদার আবরণের নাম। যার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া পাহাড়, সবুজের বাগান। তারই বুক চিড়ে বয়ে যায় ছলাৎছলাৎ স্রোতধারা। হেঁটে যায় মানুষসহ আরো কতো শত প্রাণী। রেখে যায় তাদের পদছাপ। কারণ তারা এই মাটিরই সন্তান। বিশেষত মানুষ, মানুষ তো এই মাটিরই গড়া। মাটির ওপরই মানুষের জীবন যাপন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতেই তোমাদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন।’ (১১ সূরা হুদ, আয়াত : ৬১)। বেলা শেষে আবার এই মাটির কোলেই নিতে হয় অনন্তকালের আশ্রয়। যেমনটি বলা হয়েছে পবিত্র কুরআনের অপর এক জায়গায়, 'তিনিই তোমাদের জন্য মাটিকে ব্যবহারের উপযোগী করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা এর দিকে বিচরণ করো এবং তার দেয়া রিযিক আহার করো, পুনরুত্থান তাঁরই কাছে হবে।’ (সূরা মূলক, আয়াত : ১৫)।

সুতরাং মাটি আমাদের। আমরা মাটির। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষটিও এই মাটিরই সৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন পোড়ামাটির মতো শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে।’ (সূরা রহমান, আয়াত : ১৪)। এই যে পৃথিবীর একেক প্রান্তের মানুষজন একেক রকমের, এর পেছনেও রয়েছে মাটিরই মাহাত্ম্য। এ প্রসঙ্গে একটি বহুল পরিচিত হাদিসও রয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সব অংশের মাটি জমা করে তা দিয়ে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেন। অতঃপর আদমসন্তান পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে। আদমসন্তানদের মাঝে কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কৃষ্ণবর্ণ, কেউ নম্রস্বভাব, কেউ শক্তস্বভাব, কেউ ভালো, কেউ মন্দ।’ (তিরমিজি : ২৫৬৩; আবু দাউদ : ২৭৫৩)।

হযরত আদম (আ.)  জান্নাত থেকে নেমে এই মাটিতেই স্বপ্নের চারা বুনেছিলেন। মাটিতে বেঁধেছিলেন সুখের ঘর। জীবন ধারণের জন্য তার প্রধান কাজ ছিল কৃষিকাজ। মানে মাটির সঙ্গে মাখামাখি। এই মাখামাখি তিনি একা নন, করেছেন পৃথিবীতে আগত প্রত্যেক নবী রাসূলগণই। এমন কি আমাদের নবীজিও (সা.) ছিলেন এই মাটিরই সেবক। হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূল (সা.) ‘জারেক’ নামক স্থানে কৃষি ফসলাদি উৎপাদন করতেন। তাছাড়া তিনি বাল্যকালে পাহাড়ের পাদদেশে মেষপাল চরিয়েছেন। নিজ হাতে খেজুর গাছ রোপণ করেছেন। সাহাবিদের কৃষি কাজে উৎসাহিত করেছেন। আর বলেছেন, ‘তোমরা জমি আবাদ করো। কেউ যদি নিজে আবাদ করতে না পারে, সে যেন ভূমিটি অন্য ভাইকে দিয়ে দেয়, যাতে সে আবাদ করে ভোগ করতে পারে।’ (মুসলিম : ৭১)।
পবিত্র কুরআনেও কৃষি উৎপাদনকে আখ্যায়িত করা হয়েছে বিশ্বমানবের প্রতি একটি বিরাট অনুগ্রহ বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক, আমি আশ্চর্য উপায়ে পানি বর্ষণ করেছি। এরপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। অতঃপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জয়তুন, খেজুর, ঘন উদ্যান, ফল এবং ঘাস তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের উপকারার্থে।’ (সূরা আবাসা, আয়াত : ২৪-৩২)।

এই যে এতো এতো কোদালের কোপ, লাঙলের ঘা, শাবলের গুতোয় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে মাটির দেহাঙ্গ, মাটি কি কোনোদিন এর প্রতিবাদ করেছে? টু শব্দটিও তো করে না। বরং আমাদের সকল আঘাত নীরবে সহ্য করে যায়। আর মায়ের মতো মুখে তুলে দেয় নানান খাবার। তাই তো কোনো এক কবি বলে গেছেন ‘যার বুকে তুই জন্ম নিলি তারে চিনলি না। মাটির মঙ্গল করো রে ভাই মাটি যে তোর মা।’

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য সেবা, পথ্য, শিক্ষা সরঞ্জাম, পানি, বিদ্যুৎ, যানবাহনসহ মানুষের প্রয়োজনীয় উপাদানের কী না দিচ্ছে মাটি? নিঃস্বার্থভাবে সব কিছুরই যোগান দিয়ে যাচ্ছে এই উদার ভূমি। আর আমরা সেই মাটিকে দূষিত করে চলছি বিভিন্নভাবে। আমাদের কল-কারখানার বর্জ, বালাইনাশক, আগাছানাশক, হাসপাতালের বর্জ, ইটভাটার ছাইসহ নানান বর্জ মাটির বুকে ঢালছি। একটুও কি ভেবেছি? এতে মাটির কতোটা কষ্ট হতে পারে!

এই উপলব্ধি থেকেই জাতিসংঘের ৬৮ তম সাধারণ সভায় ২০১৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক মৃত্তিকা বর্ষ’ হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে ১৫ ডিসেম্বরকে ‘বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস’ বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যবান মাটি’। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবান মাটি ছাড়া এ পৃথিবীতে মানবজীবন টেকসই হবে না’। তাই মাটির স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা প্রতিটি মানুষেররই আবশ্যিক কর্তব্য। কেন না দূষিত মাটি দ্বারা মানুষেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়ে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ বলেন, 'মানুষ নানাভাবে দূষিত মাটির সংস্পর্শে আসার কারণে বিভিন্ন রোগে রোগাক্রান্ত হয়। উল্লেখযোগ্য রোগগুলির মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, ম্যালেরিয়া, কলেরা, আমাশয়, চর্ম ও পাকস্থলীর সংক্রামন।

তাই আমাদের উচিৎ মাটিকে মায়ের মতো ভালোবাসা। মাটি দূষণের প্রতিবাদ করা। প্রতিরোধ করা। পাশাপাশি মাটির উৎপাদিকা শক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাটির পাশাপাশি আরো যত প্রাকৃতিক সম্পদ আছে সবকিছুর যথাযথ ব্যবহার, পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করলে মানব সভ্যতায় নেমে আসবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বাইতুল আমান জামে মসজিদ, বাঙ্গরা, কুমিল্লা।

এএইচটি/

 
.



আলোচিত সংবাদ