পাঁচটি মন্দচরিত্র থেকে বাঁচুন

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

পাঁচটি মন্দচরিত্র থেকে বাঁচুন

পরিবর্তন ডেস্ক ৭:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৯

পাঁচটি মন্দচরিত্র থেকে বাঁচুন

উত্তম চরিত্র আনে উন্নত জীবন। একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য  তার অধিবাসীদের উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। এছাড়া ইসলামে চরিত্রে সুন্দর ব্যক্তিকে বলা হয়েছে ঈমানে অধিক পরিপূর্ণ।–তিরমিযী

স্বয়ং রাসূল (সা.) নিজের সম্পর্কে বলেছেন, “কোমল চরিত্রের পূর্ণতা দান করতেই আমি প্রেরিত হয়েছি।”–মুসনাদে আহমাদ

কুরআনের আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসে দেখা যায় ইসলামে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব কতটা গভীর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মুসলিম সমাজে আজকাল চরিত্রকে বিশ্বস্ততার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় হিসেবে দেখা হয় না।

প্রকৃতপক্ষে চরিত্র এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আল্লাহ পবিত্র কুর’আনে এটিকে সবকিছুর উপরে উল্লেখ করেছেন। সূরা হুজুরাত হল এমন একটি সূরা যার মূল বিষয়ই হল বিশ্বাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং অন্যদের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হবে- এ সম্পর্কে।

এই নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ, পাঁচটি মন্দ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হবে, সূরা হুজুরাতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে যেগুলো থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ করেছেন।

১. শোনা কথা প্রচার করা
আজকের তথ্য প্রযুক্তির যুগে, যাচাই না করে অন্য কারো কাছে তথ্য প্রেরণ করা খুবই সহজ। তবে প্রেরিত অনেক তথ্যই মিথ্যা হয়ে থাকে। মিথ্যা তথ্যগুলো অন্যান্য লোকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে গৃহীত হলে প্রায়ই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে উঠে, যার ফলে পরিবারগুলোতে অনেক কষ্ট ও আঘাত নেমে আসে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে–

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ

মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ৬) 

রাসূল (সা.) বলেছেন,

كفى بالمرء كذبا أن يحدث بكل ما سمع

অর্থ: মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনবে, তা প্রচার করে বেড়াবে।-মুসলিম, সহীহ আল-জামে

যা আমরা শুধুমাত্র শুনেছি তা মিথ্যা বলে গণ্য করা হয় এবং আল্লাহ কুরআনে ১০ বার মিথ্যাবাদীকে অভিশাপ দিয়েছেন। নিশ্চিতভাবে আমাদের একাজ থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

২. ঠাট্টা করা
বর্তমানে মজা করা বা ঠাট্টা করাটা যেন প্রতিদিনের জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলে দিয়েছেন, সম্ভবত যাদের নিয়ে আমরা ঠাট্টা করছি তারা আসলে আমাদের চেয়ে ভাল হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَومٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّن نِّسَاء عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

অর্থ: মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গুনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম। (সূরা হুজুরাত, আয়াত:১১) 

আল্লাহ এই আয়াতে আমাদেরকে বলেছেন যে কি ভাবে মন্দ নামে ডেকে মানুষকে অপমান করা হয়। জ্ঞানী ও ভদ্রলোকদের জন্য এই একটি আয়াতই যথেষ্ট হতে পারে। প্রায় সকল ক্ষেত্রে, ঠাট্টার শব্দগুলো বাজে ধরণেরই হয়ে থাকে।

৩. সন্দেহ করা
স্পষ্টতই, কেউ যদি পরিচিত কারো কাছ থেকে প্রতারণা মূলক কিছু শোনে বা দেখে তবে তা সন্দেহজনক হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় আমরা সবাইকে সন্দেহ করে থাকি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ

অর্থ: মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গুনাহ। (সূরা হুজুরাত, আয়াত:১২)

এই আয়াত থেকে আমরা জানলাম, আল্লাহ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন কিছু প্রকার সন্দেহ আছে যেগুলো পাপ।

শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ.) এ সমন্ধে বলেছেন, “এই আয়াতে বিশ্বাসীদের বলা হয়েছে যে তার ভাইকে যেন সে সম্মান দেখায়, যদি সে কোন বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থী হয় তাহলে সম্ভব হলে যেন তা ক্ষমা করে দেয়, এবং তার সমন্ধে ভালো ধারণা রাখে, তার অন্তরকে যেন বক্রতা থেকে দূরে রাখে এবং ভাল কাজে পরস্পরের সহায়ক হয়ে উঠে।”

ওমর (রা.) বলেছেন- “তোমার ভাইয়ের মন্দ কথায় কুচিন্তা থেকে দূরে থাকো কেননা তাতেও কোন কল্যাণ নিহিত আছে।”

৪. পরনিন্দা করা
গীবত করা আজকাল এতই সাধারণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে যে এটিকে এখন আর তেমন কিছুই মনে করা হয় না। তবু আল্লাহ একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদেরকে এর ভয়াবহতা জানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

অর্থ: এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সূরা ৪৯: আয়াত ১২)

আয়াত থেকে আমরা জানলাম, এ কাজ ব্যক্তির জন্য তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতোই ঘৃণিত ও জঘন্য বিষয়।

৫. এ কথা মনে করা যে ইসলামকে আমরাই রক্ষা করেছি

মাঝে মাঝে আমরা মনে করি আমরা মুসলমান হয়ে মুসলিম হিসাবে ইসলামের সেবা করছি। যদি আমাদের অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটি একটি খুব ভয়ানক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ইসলাম আমাদের কাছে আল্লাহর একটি উপহার, এবং তিনি যে কোন প্রয়োজন মুক্ত। আমাদের ইসলাম প্রয়োজন, আমাদের আল্লাহকে প্রয়োজন, আমাদের তাঁর রহমত প্রয়োজন।

তাঁর বড়ত্ব আমাদেরকে ছাড়াও যথেষ্টই থাকবে, এবং তাঁর মহত্ব আমাদের ছাড়াও দ্যূতিময় থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُل لَّا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُم بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ

অর্থ: তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না। বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো। (সূরা ৪৯: আয়াত ১৭)

এমএফ/

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও