সূরা আন-নাসর : ভবিষ্যদ্বাণী ও শিক্ষা 

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

সূরা আন-নাসর : ভবিষ্যদ্বাণী ও শিক্ষা 

ড. আলী আল-হালওয়ানী ২:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৩, ২০১৯

সূরা আন-নাসর : ভবিষ্যদ্বাণী ও শিক্ষা 

সূরা আন-নাসর মাদানী যুগে অবতীর্ণ একটি সূরা। ইমাম নাসায়ী (রহ.) এর মতে, রাসূল (সা.) এর উপর সর্বশেষ নাযিলকৃত পূর্ণাঙ্গ সূরা হল এটি। সূরাটি আকারে ছোট হলেও আমাদের জন্য এ সূরায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ও শিক্ষা। পাশাপাশি এই নাযিলের সময় এসূরায় ইসলামের ভবিষ্যত সম্পর্কে বিশেষ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

এখানে সূরাটি দেখে নেওয়া যাক,

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّـهِ وَالْفَتْحُ ﴿١﴾  وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّـهِ أَفْوَاجًا ﴿٢﴾ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا﴿٣﴾

“যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় (১) এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, (২) তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী(৩)।

বিশেষ ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত

ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)সহ অধিকাংশ মুফাসসিরীনে কেরামের মতে, এই সূরা নাযিলের মাধ্যমে রাসূল (সা.) এর জীবনের শেষের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কে এই সূরা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “এখানে রাসূল (সা.) এর জীবনাবসান সম্পর্কে আল্লাহ তাকে জানিয়েছিলেন।” (বুখারী)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বর্ণনা করেন, হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) তার জীবনের শেষদিকে বেশি বেশি পাঠ করতেন,

‏ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, আস্তাগফিরুল্লাহি ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: সকল সম্মান ও প্রশংসার অধিকারী আল্লাহ, আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছে আমার গুনাহের তাওবা করছি।

নবীজি (সা.) বলেছেন, “আমার রব আমাকে আমার সম্প্রদায়ের একটি নিদর্শন সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি আমাকে তার প্রশংসা ও মহত্বের ঘোষণার, তার ক্ষমা প্রার্থনার এবং তার কাছে তাওবার আদেশ দিয়েছেন যখন আমি সেই নিদর্শনটি দেখতে পারি। নিশ্চয়ই, আমি তা পেরেছি।”

খোদায়ী নিদর্শন

উপরিউক্ত হাদীসের বিবরণ ছাড়াও তখন ইসলামের জন্য অগ্রগতির এক সুসংবাদ বহন করেছিল এই সূরাটি।

মুফাসসিররা বলেন, সূরায় বর্ণিত বিজয় দ্বারা মক্কা বিজয়কে বোঝানো হয়েছে। মক্কা বিজয় না হওয়া পর্যন্ত অনেক আরব গোত্রই ইসলাম গ্রহণ না করে বরং ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা বলতো, “যদি মুহাম্মদ তার নিজের লোকদের উপর বিজয়ী হয়, তবে সে নিশ্চিতভাবে নবী।”

ঘটনাক্রমে আল্লাহ যখন মক্কাবাসীদের উপর রাসূল (সা.) কে বিজয় দান করলেন, তখন তারা বিলম্ব না করে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করা শুরু করলো। মাত্র দুই বছরের মধ্যে সমগ্র আরব ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।

সূরা নাসরে মক্কা বিজয়ের এই ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। পাশাপাশি এই সূরায় একইসাথে পৃথিবীতে রাসূল (সা.) এর নবুওয়াতি দায়িত্বের সমাপ্তি এবং তার ইন্তেকালের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এসকল ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশিত হলে আল্লাহ রাসূল (সা.) কে বিশেষ কিছু কাজ করতে এই সূরায় নির্দেশনা দিয়েছেন। তা হল, বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ পাঠ করা এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকা।

সূরা নাসরের শিক্ষা

 ১. বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে
এই সূরাটি শুরু হয়েছে, “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে” আয়াতের মাধ্যমে। এখান থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, সকল বিজয় ও সাহায্য একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনি যখন চাবেন, যে মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন এবং যে উদ্দেশ্যের জন্য তিনি নির্ধারিত করবেন, সেসময়, সেই মাধ্যমে ও সেই উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই সাহায্য ও বিজয় আসবে।

মুমিনদের এমনকি আল্লাহর রাসূলেরও এখানে কিছু করার নেই যতক্ষণ না আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানের মাধ্যমে সম্মানিত না করছেন। 

২. আল্লাহর প্রশংসা
বিজয় ও সাহায্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার কারণেই আমাদের উচিত বেশি বেশি তার প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করা।

আমাদেরকে আল্লাহ যে নেয়ামত দান করে আসছেন এবং আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করছেন, সেই নেয়ামত ও প্রয়োজন পূরণের জন্য তার প্রশংসা ও শোকর করা উচিত। পাশাপাশি বিজয়ের জন্য নিজেদের যোগ্যতার বৃদ্ধি ও তার পক্ষ থেকে সাহায্য চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।

৩. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
বিজয়ের মুহূর্তে আনন্দে আত্মহারা না হয়ে এই সূরায় আল্লাহর প্রশংসা এবং নিজেদের অপূর্ণতা ও ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে। 

কোন অত্যাচার বা শাস্তির মুখে পরাজিতরা কখনো পরিবর্তিত হয় না। সুতরাং, তাদের প্রতিও ক্ষমা ও দয়ার প্রদর্শনের এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত এই সূরায় প্রদান করা হয়েছে।

সূরা আন-নাসরের শিক্ষা অনুযায়ীই রাসূল (সা.) মক্কা বিজয়ের সময় যখন মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, কোন প্রকার গর্ব প্রকাশের পরিবর্তে তিনি বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসা পাঠ করছিলেন। পাশাপাশি তিনি মক্কাবাসীর পূর্বের সকল শত্রুতা ভুলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহ যখন আপনাকে আপনার শত্রুর উপর বিজয় দান করবেন এবং আপনার শত্রুদের অপমানের জবাবে আপনাকে সম্মানিত করবেন, তখন সকল প্রকার গর্ব প্রকাশ থেকে বিরত থেকে একমাত্র আল্লাহর শোকর ও প্রশংসা করুন। পাশাপাশি নিজের ত্রুটি ও অপূর্ণতার জন্য তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। 

সকল কিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন এবং যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেন, সকল বস্তুই সেভাবে পরিচালিত হয়। সকল বড়ত্ব ও গৌরবের একমাত্র অধিকারী তিনি।

এমএফ/

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও