মানুষ এমন নির্দয় নৃশংস হয়ে উঠছে কেন?

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

মানুষ এমন নির্দয় নৃশংস হয়ে উঠছে কেন?

পরিবর্তন ডেস্ক   ১:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ০১, ২০১৯

মানুষ এমন নির্দয় নৃশংস হয়ে উঠছে কেন?

প্রতীকী ছবি

পৃথিবীজুড়ে নানা সহিংসতার ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পত্রিকার সংবাদে আমরা প্রতিদিন দেখছি নিত্য নতুন নৃশংসতার সংবাদ। সম্প্রতি বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছে। পাশাপাশি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা হল হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত সাধারণ মানুষের প্রতিবাদহীন নিষ্ক্রিয়তা। বলা হচ্ছে, এই নৃশংসতা এবং বাঁচানোর চেষ্টা না করে মানুষকে এভাবে মরতে দেওয়া দুটিই সামাজিক অধঃপতনের নিদর্শন।

এমন নির্দয় হয়ে ওঠা মানব হৃদয়ের কথা পবিত্র কুরআনেও পাওয়া যায়। এমন হৃদয়কে পাথরের সঙ্গে তুলনা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّن بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً

“অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন।”–সূরা বাকারাহ, আয়াত:৭৪

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلَوْلا إِذْ جَاءهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُواْ وَلَـكِن قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ

“অতঃপর তাদের কাছে যখন আমার আযাব আসে, তখন কেন কাকুতি-মিনতি করে না? বস্তুতঃ তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেছে এবং শয়তান তাদের কাছে তাদের কৃতকর্মকে সুশোভিত করে তুলেছে।”–সূরা আনআম, আয়াত: ৪৩

কুরআনের এই আয়াতটি যেন বর্তমান সমাজচিত্রই তুলে ধরছে। আজ নানা রকম সামাজিক ব্যাধিতে আমরা আক্রান্ত। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা–এমন চরম বিপদেও মানুষ আল্লাহবিমুখ ও আত্মচিন্তায় নিমগ্ন হয়ে আছে।

ফেসবুক-ইন্টারনেটে রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বেপরোয়া জীবনের দৃশ্য উঠে আসছে। পাপ ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়লে একসময় তাদের হৃদয় ও বিবেক উভয়ের মৃত্যু ঘটে। ফলে তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। এরা কেবল অন্যের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে না, তারা আত্মঘাতীও হয়।

রিফাতের হত্যাকারীরা কি জানত না যে প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে হত্যা করলে পরিণামে তাদের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে? তারপরও কেন তারা তা করল? আল্লাহ তাআলা রিফাতের হত্যাকারীদের মতো বেপরোয়া অপরাধীদের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন,

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

“তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদের কথাও ভুলিয়ে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য।”–সূরা হাশর, আয়াত:১৯

হৃদয়ের নির্দয়তা ও কঠোরতার প্রতিষেধকও পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,

فَوَيْلٌ لِّلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

“দুর্ভোগ সেই কঠোর হৃদয়ের জন্য, যা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ।”–সূরা যুমার, আয়াত:২২

অর্থাৎ, আল্লাহর স্মরণ ও ভয় থেকে বিমুখ হলেই মানুষের হৃদয় নির্জীব ও কঠোর হয়। আর আল্লাহর স্মরণ মানুষের হৃদয়কে সতেজ ও কোমল করে, হৃদয়ের রূঢ়তা ও কঠোরতা দূর করে।

মূলত মৃত্যুচিন্তা, পরকালীন জবাবদিহিতা ও শাস্তির ভয় না থাকলে মানুষ আত্মবিভোর ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে। স্বার্থচিন্তা ও আত্মনিমগ্নতা তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে নেয় যে সে সমাজের ভালো-মন্দ অনুভব করতে পারে না। তা নিয়ে সে চিন্তাও করে না। অথচ ইসলামী সমাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে সামগ্রিক কল্যাণের চিন্তা থাকবে। এই চিন্তা থেকেই ইসলামী সমাজে ভালোর চর্চা হবে এবং মন্দের বিলোপ হবে। এবং তা হবে সামগ্রিকভাবেই। সমাজের সবাই পরস্পরকে ভালোকাজে উৎসাহিত করবে এবং মন্দকাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। সবাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, প্রয়োজনে প্রতিরোধও করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

من رأي منكم منكراً فليغيره بيده ، فإن لم يستطع فبلسانه فإن لم يستطع فبقلبه ، وذلك أضعف الإيمان

‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি না পারে তাহলে যেন মুখে প্রতিবাদ করে। আর যদি তাতেও সক্ষম না হয় তাহলে যেন অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। আর এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস:৭৩)

এছাড়া নৃশংসতা বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো রাষ্ট্রীয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। চাঞ্চল্যকর বহু হত্যাকাণ্ডের আসামিদেরও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এছাড়া পক্ষপাতমূলক বিচারেরও অভিযোগ রয়েছে। এতে অপরাধীরা যেমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তেমনি মানুষও অজানা ভয়ে প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে।

ইসলাম অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলে; বিশেষত যদি তা খুন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ হয়।

সাধারণভাবেই প্রাণহত্যা ইসলামে চরম নিন্দনীয় কাজ। বৈধ ও যৌক্তিক কারণ ব্যতীত প্রাণনাশ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে পৃথিবীর সব মানুষকে হত্যা করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টির দায় ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’–সূরা মায়েদাহ, আয়াত:৩২

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিনা প্রয়োজনে একটি গাছের পাতাও ছিঁড়তে নিষেধ করেছেন। কারণ গাছেরও প্রাণ আছে। কুরআনের বাণী ও রাসুলের এই নির্দেশনা থেকে নিরপরাধ মানুষ হত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা জঘন্য অপরাধ তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এমএফ/

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও