২১তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, ২২ মে, ২০১৯ | 2 0 1

বিষয় :

২১ তারাবীহ

২১ রমযান

সূরা জুমআ

সূরা মু’মিন

হা-মীম আস-সাজদাহ

২৪ পারা

তারাবীহ’র আলোচনা

তারাবীহ’র বয়ান

আজকের তারাবীহ

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

২১তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

মুফতী জিয়াউর রহমান ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, মে ২৬, ২০১৯

২১তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

২১তম তারাবীহ আজ। আজকের তারাবীহতে সূরা জুমআর ৩২ থেকে সূরার শেষ ৭৫ নম্বর আয়াত ও সঙ্গে সূরা মু’মিন, সূরা হামিম সাজদার ১ থেকে ৪৬ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে ২৪তম পারা। আজকের তারাবীহতে পঠিতব্য অংশের আলোচনা সংক্ষেপে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হল।

সূরা জুমআর অবশিষ্ট আলোচনা
১. একবার কাফেররা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে একথা বলে ভয় দেখিয়েছিল যে, যদি আপনি আমাদের প্রতিমাদের প্রতি বেআদবি প্রদর্শন করেন, তবে তাদের কোপানল থেকে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তাদের প্রভাব খুব সাংঘাতিক! এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা যুমারের এই আয়াত নাযিল হলো-

আল্লাহ তাআলা তাদের এই ভয় প্রদর্শনের জবাবে বলছেন: “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় দেখায়।” (৩৬)

২. এখান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও শরীয়ত বিরোধি কাজ করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা শাসকশ্রেণী চাপ দেয়। উপরের লোকদের কোপানলে পড়ার, চাকরি হারানোর ভয় ভেতরে কাজ করে। তাকওয়াবান মুমিনদের জন্যে এখানে বড় সুসংবাদ এবং বিরাট সান্ত্বনার বাণী নিহিত রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের হেফাজতের জন্যে যথেষ্ট নন? তোমরা খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্যে গোনাহ না করার সংকল্প করলে এবং আল্লাহর বিধানাবলীর বিপক্ষে কোনো শাসক ও কর্মকর্তার রক্তচক্ষুর পরওয়া না করলে আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সাথে থাকবে। (মা’আরিফ)

৩. কুরআন সারা দুনিয়ার মানুষকে দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছে। একভাগ কাফিরদের, যারা আল্লাহ, রাসূল এবং কুরআনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। দ্বিতীয় ভাগ হলো, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের অনুসারীদের; তাদের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত।

বান্দার উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত, অনুগ্রহের এটিও একটি মাধ্যম যে তিনি অপরাধী এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহর রহমত ও তাওবার দরোজা এখানো খোলা রেখেছেন। তিনি নিজেও আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়ার দাওয়াত দেন। তিনি গোনাহগারদেরও নিরাশ করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

বলুন! হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। (৫৩-৫৪)

৪. বান্দাদেরকে তাওবা এবং আল্লাহমুখী হওয়ার আহবান জানানোর পর এই সূরা কিয়ামতের নানা দৃশ্যের বর্ণনা করা হয়েছে। যখন মিথ্যাবাদীদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। সবাই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, জীবনের হিসাব নেওয়া হবে, এরপর কাফিরদের টেনে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। মুত্তাকিদের জান্নাতে প্রবেশের আহবান জানানো হবে, ফেরেশতারা সালাম বলে বলে তাদের অভ্যর্থনা জানাবে এবং তারা আল্লাহর প্রশংসা করে করে নিজ নিজ ঠিকানায় শুভাগমন করবে।

সূরা গাফির/সূরা মু’মিন
৫. সূরা গাফির মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৮২ টি আয়াত এবং ৯ টি রুকু রয়েছে। এই সূরাকে সূরায়ে মু’মিনও বলা হয়।

এই সূরা হুরূফে মুকাত্তা’আতের “হা-মীম” দ্বারা শুরু হয়েছে। এখান থেকে “হা-মীম” দ্বারা শুরু হওয়া সাতটি সূরা ধারাবাহিকভাবে এসেছে। সূরাগুলো এই ধারাবাহিকতায় নাযিলও হয়েছে। এগুলোকে একসাথে “হাওয়ামীমে সাব’আ” এবং “আলে-হামীম”ও বলে। সূরাগুলো হলো: সূরা মুমিন, সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ, সূরা শুরা, সূরা যুখরুফ, সূরা দুখান, সূরা জাসিয়া, সূরা আহকাফ।

ইবনে মাসউদ রা, এই সূরাগুলোকে কুরআনের সৌন্দর্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে আব্বাস রা, এই সূরাগুলোকে কুরআনের মগজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

৬. এই সূরার মৌলিক বিষয়বস্তু হচ্ছে, হক-বাতিল এবং হেদায়াত ও গোমরাহীর মধ্যকার দ্বন্দ্বের বর্ণনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিরন্তন মু’জিযা কুরআনের আলোচনার মাধ্যমে এই সূরা শুরু হয়েছে। এই কুরআন শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাওয়ার পরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্য নবুওয়তের সাক্ষী। কুরআনী জ্ঞান-বিজ্ঞান পুরাতন হওয়ার কোনো আলামত নেই, বরং আজও তরতাজা এবং সজীব আল্লাহর কালাম। আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতি এবং নতুন নতুন আবিষ্কার এই কুরআন বর্ণিত চিরন্তন সত্যকেই সত্যায়ন করে। মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান যতই উন্নতি সাধন করবে, কুরআন আল্লাহর কালাম এবং মু’জিযা হওয়ারই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

৭. এরপর আল্লাহ তাআলার চারটি সিফাতের আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি গোনাহ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠিন শাস্তি প্রদানকারী, বান্দাদের উপর করুণা ও অনুগ্রহকারী।

৮. ফেরেশতাদের মধ্যে যারা আরশ বহনকারী, আরশের চতুর্দিক বেষ্টন করে আছেন, তারা সকলেই আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও তাসবীহ পাঠের সাথে সাথে ঈমানদারদের মাগফিরাতের দুআ করেন। তারা বলেন:

“হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।

হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য।”

৯. কুরআনের এক বিশেষ বর্ণনারীতি হচ্ছে, সুসংবাদ ও উৎসাহ প্রদানের পর ভীতি প্রদর্শন, জান্নাতের আলোচনার পর জাহান্নামের আলোচনা, ঈমানদারদের আলোচনার পর কাফিরদের আলোচনা করা হয়। এই সূরায়ও এমনটা হয়েছে। প্রথমে বলা হলো, আল্লাহর নৈকট্যশীল ফেরেশতা মুমিনদের জন্য দুআ করেন। এখন কাফির এবং পাপিষ্ঠদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যখন তাদেরকে উত্তপ্ত ও প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে এবং নিজেদের মন্দ কৃতকর্মের পরিণতি দেখবে, তখন নিজে নিজেকেই ধিক্কার দিবে। অত্যন্ত অপদস্থতা ও জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতির আবেদন জানাবে। কিন্তু তাদের আবেদন নামঞ্জুর হবে। তাদের আবেদনের জবাবে জাহান্নামের তত্বাবধায়ক ফেরেশতা বলবেন, আজ আল্লাহর কঠিন আযাব দেখে তোমরা নিজেদের দোষারোপ করছ, ধিক্কার জানাচ্ছ; এরচেয়ে কয়েকগুণ বেশি আল্লাহ তোমাদের ধিক্কার দিয়েছেন, যখন তোমাদের ঈমানের দাওয়াত দেওয়া হতো, কিন্তু তোমরা অহংকার এবং নাফরমানি করে কুফরি করতে, ঈমানের দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে। কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদানের দিন, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দিন। এদিন কোনো যুলুম হবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার আমলের প্রতিদান সেদিন পাবে।

১০. এরপর যুলুম-নাফরমানির প্রসিদ্ধ মোড়ল ফেরাউনের কাহিনি যা হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সাথে ঘটেছিল তার আলোচনা করলেন একথা বোঝাবার জন্যে যে, যালিম এবং অহংকারীদের শেষ পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। হযরত মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনি তো কয়েক সূরাতেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সূরা গাফিরে এক বিশেষ মুমিন বান্দার আলোচনা করা হয়েছে, এজন্যে এই সূরার অপর নাম ‘মুমিন’ রাখা হয়েছে। এই লোক গোপনে ঈমান কবুল করে নিয়েছিলেন। যখন মুসা আলাইহিস সালামকে হত্যার শলাপরামর্শ হলো, তখন এই মুমিন ব্যক্তি মুসা আলাইহিস সালামের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কি শুধু এজন্যে একজন লোককে হত্যা করতে চাচ্ছ? যে, তিনি বলেন: আমার প্রতিপালক আল্লাহ। অথচ তিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রকাশ্য মু’জিযা নিয়ে এসেছেন। কিন্তু ফেরাউন তার কথার উপর অটল থাকল এবং পরিষ্কারভাবে বলে দিলো যে, আমার সিদ্ধান্তই সঠিক। চিন্তাভাবনা ও বোঝাপড়ার পর আমার সিদ্ধান্ত এটাই যে, মুসাকে হত্যা করা হবে। এটাই হচ্ছে, সকল স্বৈরাচারি স্বভাব। তারা তাদের বুঝ এবং চিন্তাকেই সবসময় চূড়ান্ত মনে করে। বড় আলিম, জ্ঞানী-গুণী কারো কথাতেই পাত্তা দেয় না তারা।

১১. সভাসদবর্গের সামনে মুমিন ব্যক্তির কথাগুলো প্রভাব ফেলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় ফেরাউন তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলো। এখন থেকে মুসা আর হারুনের অস্তিত্বই সহ্য করা হবে না। এরপর মুমিন ব্যক্তির প্রভাবপূর্ণ কথা হাসি-টাট্টা করে উড়িয়ে দেয়ার নিমিত্তে তার প্রধানমন্ত্রী হামানকে হুকুম দিলো তার জন্যে একটি উঁচু ভবন নির্মাণ করার জন্য, যাতে সে মুসার আল্লাহকে দেখতে পায় কোথায় আছেন? নাউযুবিল্লাহ!

ফেরাউনের এই ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও মুমিন ব্যক্তি তাঁর সত্য কথা বলা জারি রাখলেন। কিন্তু ফেরাউন এতে ঈমান আনল না এবং এসব কথায় প্রভাবিতও হলো না। ফলাফল এই দাঁড়াল যে, ফেরাউন ও তার সঙ্গী-সাথী সবাই ধ্বংস হয়ে গেলো, কিন্তু মুমিন ব্যক্তি বেঁচে গেলো। এটাই নিয়ম আল্লাহর নাফরমান এবং প্রকাশ্য শত্রুদের সামনে নির্ভয়ে সত্য কথা বললে সে মানুক না মানুক এই সত্য বলার কারণে নিজের হেফাজতের ব্যবস্থা হয়, আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার কারণ হয়।

১২. পাপিষ্ঠদের এই আযাব শুধু দুনিয়াতে নয়, কবরেও তাদের পিছু ছাড়বে না, বরং সকাল-বিকাল তাদের সামনে সেই আযাব পেশ করা হবে। আর জাহান্নামের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি তো হতেই হবে। এখানে কবর দ্বারা আলমে বরযখ উদ্দেশ্য। কারণ ফেরাউন ও তার সাথীরা তো পানি ডুবে ধ্বংস হয়েছে, তাদের তো কবরস্থ করা হয় নি। এজন্যে এখানে কবর মানে কবরজগত উদ্দেশ্য, কিয়ামতের দিন এবং দুনিয়ার জীবনের মাঝামাঝি যে অবস্থানকাল।

১৩. ফেরাউনের মতো অকৃতজ্ঞ, অহংকারী ও যালিমের আলোচনার পর আল্লাহ তাআলা কিছু নিয়ামতের আলোচনা করলেন। আল্লাহ তাআলা প্রশান্তির জন্য রাত এবং জীবিকা নির্বাহ এবং সবকিছু দৃশ্যমান হওয়ার জন্য দিন বানিয়েছেন। যমীনকে স্থির ও অবস্থান গ্রহণের জন্যে এবং আসমানকে ছাদ হিসেবে বানিয়েছেন। সুন্দর আকৃতি এবং আহারের জন্য পবিত্র জিনিস দান করেছেন। এ সব আল্লাহ তাআলার নিয়ামত, কিন্তু মানুষ সেই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না। যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামত দান করেছেন, সেই উদ্দেশ্যে সেগুলো কাজেও লাগায় না। চিন্তা-ফিকির করে আপন সৃষ্টিকর্তার পরিচয়ও লাভ করে না।

১৪. বাইরের সৃষ্টি বাদেও মানুষ যদি নিজের সৃষ্টির উপর চিন্তা-ফিকির করত, তাহলেও তারা আল্লাহকে চিনতে পারত। নানা স্তর পারি দিয়ে মানুষ মানুষে পরিণত হয়েছে। প্রথমে মাটি থেকে শুরু, পরে বীর্য, জমাট রক্ত, গোশতের টুকরো, হাড্ডি, আকৃতি, প্রাণ, বুদ্ধি, পঞ্চ-ইন্দ্রীয়সহ পুরো শরীরে হাজার মাইল দীর্ঘ রগের ছড়ানো জাল, রক্তের চলাচল, হৃদকম্পন, ৩৬০ টি জোড়াসহ শরীরের গঠন স্থির হওয়ার পর প্রথমে খুবই দুর্বল, কথা বলতে পারে না, ভালোমন্দ বিচারের শক্তি থাকে না। পরে আস্তে আস্তে আল্লাহ তাআলা তাকে জ্ঞানবুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ দান করেন। যৌবনে পদার্পণ করে, তারপর বার্ধক্যে, আবার শিশুকালের ন্যায় দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ যদি এ সবগুলো স্তর নিয়ে গভীর চিন্তা করে, তাহলে তো তার আল্লাহকে না চিনে থাকার কথা ছিলো না।

১৫. সূরার শেষের দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়া হচ্ছে। এরপর মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের যমীনে চলাচল করে ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়সমূহের পরিণাম ও ধ্বংসাবশেষ দেখে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ওই সম্প্রদায়সমূহ ছিলো চরম বস্তুবাদী। বস্তুর উপর ছিলো তাদের খুব নির্ভর এবং অহংকার। তারা সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া সত্ত্বেও নবীগণকে অস্বীকার করেছিলো। পরে যখন আল্লাহর আযাব দেখতে পেলো, তখন তাওহিদের স্বীকৃতি দিলো, মূর্তিপূজা ত্যাগ করার ঘোষণা করল। কিন্তু তাদের সেই স্বীকৃতি আর ঘোষণা কোনো কাজে এলো না। কেননা আল্লাহ তাআলার নিয়ম হচ্ছে, স্বচক্ষে আযাব দেখে নেয়ার পর আর ঈমান আনয়নের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

সূরা ফুসসিলাত/সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ
১৬. সূরা ফুসসিলাত যাকে হা-মীম আস-সাজদাহও বলা হয়। মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। ৫৪ টি আয়াত ও ৬ টি রুকু রয়েছে। শুরুতেই বলা হচ্ছে, এই কিতাব এমন সত্তার পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং মেহেরবান। এই কুরআনের আহকাম, অর্থ, বিষয়বস্তু, কাহিনি, উপদেশ, দৃষ্টান্ত, ওয়াদা এবং ভীতি প্রদর্শন সবকিছু সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট। কোনো অস্পষ্টতা নেই। এতদসত্ত্বেও অনেক মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। এবং এই হতভাগারা নিজেদেরকে অন্ধ ও বধিরদের কাতারে শামিল করে নেয়। তারা বলে, আমাদের অন্তরে পর্দা পড়ে গেছে, কান বন্ধ হয়ে গেছে। হে নবী! আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে পর্দা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং আমরা তোমাদের দাওয়াত বুঝিও না, শুনিও না এবং তোমাদের দেখতেও পাই না। মুশরিকদের এই বিদ্রুপাত্মক জবাবের পর আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম দিলেন, আপনি আপনার ব্যক্তিত্বের পরিচয় এবং আপনি নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার উদ্দেশ্য তাদের বলে দিন। আপনি বলে দিন, আমিও তোমাদের মতই মানুষ, আমার প্রতি ওহী আসে যে, তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ। অতএব তাঁর দিকেই সোজা হয়ে থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর মুশরিকদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ। (২-৬)

১৭. এরপর মুশরিকদের কুফর, শিরকের উপর আশ্চর্যের বহিঃপ্রকাশ করা হচ্ছে যে, তাদের সামনে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব, মহত্ব প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা আল্লাহকে অস্বীকার করে। এরপর কওমে আ’দ, সামুদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ও তাদের শেষ পরিণতির আলোচনা করা হয়েছে। আ’দ সম্প্রদায়কে আল্লাহ তাআলা যে বিস্ময়কর শারীরিক শক্তি দান করেছিলেন যে, পাহাড় থেকে প্রস্তরখণ্ড তুলে পৃথক করে নিতে পারত। এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা তো দূরের কথা গর্ব আর অহংকারের বশে চ্যালেঞ্জ দেয়া শুরু করল এই বলে যে, আমাদের থেকে শক্তিশালী কে আছে?

১৮. তাদের এই অজ্ঞতা ও অপরিণামদর্শী গরিমার জবাব দেয়া হলো, তোমরা তো কি ওই সত্তার শক্তি ও কুদরত সম্পর্কে অজ্ঞ ও উদাসীন রয়েছ, যে সত্তা তোমাদের মতো শক্তিশালীদেরও সৃষ্টি করেছেন? অথচ সেই মহা ক্ষমতাধর সত্তার সামনে তোমাদের এই শক্তি কিছুই না। তারপর এই জাতিকে আল্লাহ তাআলা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং ধারাবাহিক ৭ দিন পর্যন্ত প্রবল ঝড়ের কবলে ফেলে তাদের ধ্বংস করে দেয়া হলো। সামুদ সম্প্রদায়ও ঈমানের বদলে কুফর, আলোর পরিবর্তে অন্ধকার, হেদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহীকে প্রাধান্য দিলো। এরপর তাদেরকেও কঠিন আযাবের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হলো।

১৯. এরপর পরকালেও আল্লাহর সামনে সবার একত্রে দাঁড়ানো এবং সেদিন তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে। অহংকারী ও অস্বীকারকারীদের আলোচনার পর একনিষ্ঠ মুমিনদের পরিচয় দেয়া হচ্ছে যে, তাদের প্রথম এবং প্রধানতম সিফাত হচ্ছে, ঈমানের উপর ইস্তেকামত থাকা। একবার আল্লাহকে নিজের পালনকর্তা স্বীকার করার পর জীবনের জন্য এই কথার উপর অবিচলতা অর্জন করে নিলেন। এই ইস্তেকামত হচ্ছে, ওলী হওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বড় কারামত ও জান্নাতে যাওয়ার সোপান। এই ইস্তেকামত জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে বলবে, থাক এখানে অনন্তকাল।

২০. অনুরূপ আল্লাহ তাআলার কাছে সবচে সম্মানিত ও প্রশংসনীয় ব্যক্তি হচ্ছেন, যারা ইখলাস ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার দিকে আহবান করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে এই পথের কঠিন পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতা সহ্য করে নেয়।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
২০তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৯তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৮তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৬তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৪তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও