১৯তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

১৯তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

মুফতী জিয়াউর রহমান ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৯

১৯তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

আজ ১৯তম তারাবীহ। আজকের তারাবীহতে সূরা আহযাবের ৩১ থেকে সূরার শেষ ৭৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত ও সঙ্গে সূরা সাবা, সূরা ফাতির এবং সূরা ইয়াসিনের ১ থেকে ২১ নম্বর আয়াতপর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। ২২তম পারা পড়া হবে আজ। আজকের তারাবিতে পঠিতব্য অংশের আলোচনা সংক্ষিপ্তভাবে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো

সূরা আহযাবের অবশিষ্ট আলোচনা
১. একুশতম পারার শেষ এবং বাইশতম পারার শুরুর দিকের কয়েকটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্রতম স্ত্রীগণের প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে। যখন চতুর্দিকে ইসলামের বিজয় শুরু হয়ে গেলো, তখন নবীপত্নিগণ রাসূলে আকরাম (সা.) এর কাছে এই আবেদন করলেন যে, আমাদের ভরণপোষণ এবং ভাতা কিছুটা বৃদ্ধি করা হোক। এই প্রেক্ষাপটে আয়াত নাযিল হলো। সেখানে তাদেরকে দুটির মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণের সুযোগ দেয়া হলো। হয়ত দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন-যাপনের জন্য পৃথক হয়ে যাও। নতুবা অভাব-অনটনের সাথে জীবন কাটিয়ে দাও এবং পরকালের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখো। তাদেরকে এই ইচ্ছা প্রদানের পর সকলেই পরকালকে প্রাধান্য দিলেন।

২. এই অবস্থায় তাঁদের (নবীপত্নি) ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে তাদেরকে সাতটি হুকুম দেয়া হয়েছে।

এক. পরপুরুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হলে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় যেন কথা না বলে।
দুই. অপ্রয়োজনে ঘর হতে বের হয়ো না। কেননা মুসলিম নারীদের আসল এবং নিরাপদ ঠিকানা হলো তাদের ঘর।
তিন. জাহিলিয়াতের যুগের নারীদের মতো তোমাদের সৌন্দর্যের প্রকাশ করে বাইরে বের হয়ো না।
চার. নামায কায়েম করো।
পাঁচ. যাকাত আদায় করো।
ছয়. আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।
সাত. কুরআনের আয়াতের তিলাওয়াত এবং হাদীসের চর্চা করো।

৩. মুসলমানের সামাজিক জীবনে উন্নতি এবং আলাদা ব্যক্তিত্বের জন্য দশটি গুণাগুণ রয়েছে। এই গুণাগুণ পুরুষ, নারী সকলের জন্য প্রযোজ্য। তাদেরকে মাগফিরাত এবং মহা পুরস্কারের উপযুক্ত বানিয়ে দেয়। সেগুলো হচ্ছে- ইসলাম, ঈমান, সার্বক্ষণিক আনুগত্য, সত্যবাদিতা, ধৈর্যধারণ, নম্রতা, সাদাকা, রোযা, নিজের সম্ভ্রমের হেফাজত এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করতে থাকা।

৪. সূরা য়ে আহযাবে ওই ঘটনার আলোচনা রয়েছে, যার কারণে বিরোধীরা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে চরম নিন্দা, কুৎসা ও অপবাদে জর্জরিত করেছিল। যখন হুজুর (সা.) এর মুখডাকা পুত্র হযরত যায়দ বিন হারিসা রা. ও ফুফাত বোন যায়নব রা. এর মধ্যকার দাম্পত্য জীবন কোনোভাবেই খাপ খাচ্ছিল না, বনিবনা হচ্ছিল না এবং তাদের বিবাহবিচ্ছেদও হয়ে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তিনি নিজেই যায়নব রা.কে বিবাহ করে নিলেন। এই ঘটনায় সমাজে একটি অপপ্রচার শুরু হলো যে, মুহাম্মাদ পুত্রবধূকে বিয়ে করে ফেলেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। যদিও জাহেলি ধারণায় এই বিবাহ হারাম ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন: এই বিবাহ আমি করিয়ে দিলাম যাতে ভবিষ্যতে মুখডাকা পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করতে মুসলমানদের জন্য কোনো অসুবিধা না হয়। কারণ মুখডাকা পুত্র তো মুখ ডাকাই, ঔরষজাত পুত্র না।

৫. এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নেয়া দরকার যে, ইসলাম এবং ইসলামের নবী (সা.) এর বিরোধীরা আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর বহুবিবাহের মধ্যে প্রবৃত্তি চরিতার্থের বিষয়টি খুঁজে পায়, প্রবৃত্তির অনুসরণ প্রমাণে ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। এখানে যদি দুটি মৌলিক সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখা যায়, তাহলে অভিযোগ অনর্থক এবং ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

প্রথম সূক্ষ্ম বিষয় হলো, তিনি তাঁর ভরা যৌবনের সময়টুকু এমন একজন পত্নির সঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছেন, যিনি বয়সের দিক দিয়ে দ্বিগুণ হওয়ার কাছাকাছি। সেই উম্মুল মুমিনীন খাদিজাতুল কুবরা রা.র জীবদ্দশায় অন্য কোনো পত্নির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নাই। খাদিজা রা. ছাড়া যে কয়টি শাদি করেছেন, সবগুলোই বার্ধক্য তথা পঞ্চাশোর্ধ বয়স পেরোনোর পর করেছেন। (সুবহানাল্লাহ)

দ্বিতীয় বিষয় হলো উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) ছাড়া আর কোনো পত্নি কুমারী ছিলেন না। সবাই ছিলেন বিধবা, বিপত্নিক। রাসূলে পাক (সা.) এর বহুবিবাহের উদ্দেশ্য যদি -নাউযুবিল্লাহ- খাহেশ চরিতার্থ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তো তিনি সেই বিয়েগুলো যৌবনকালে এবং কুমারী নারী দেখে দেখে করতেন। মোটকথা এসমস্ত বিয়েতে তা’লীমি, শরয়ী, সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক অনেক কারণ নিহিত রয়েছে, যা স্থূল মস্তিষ্কের বিরুদ্ধবাদীরা অনুভব করতে পারে না।

৬. আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে মুমিনদের জন্য যে মহা নিয়ামত হিসেবে পাঠিয়েছেন, তা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পাঁচটি বৈশিষ্টের আলোচনা করেছেন।

এক. তিনি তাঁর উম্মত এবং অন্যান্য উম্মতের জন্যেও কিয়ামতের দিন সাক্ষী হবেন। কেননা সারা দুনিয়ার মানুষই তো রাসূল (সা.) এর উম্মতের মধ্যে শামিল। যারা দাওয়াত কবুল করে নিয়েছে, তারা উম্মতে ইজাবাত, আর যারা দাওয়াত কবুল করে নাই, তারা হচ্ছে, উম্মতে দাওয়াত।
দুই. মুমিনদের জন্য তিনি জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী।
তিন. কাফির এবং পাপাচারীদের আল্লাহর আযাব এবং ধ্বংসাত্মক পরিণতির ভয় দেখানো তাঁর দায়িত্ব।
চার. তিনি নেক আমল, ইসলাহ, উত্তম চরিত্র এবং দ্বীনের উপর দৃঢ়পদ থাকার আহবানকারী।
পাঁচ. তিনি তো উজ্জ্বল প্রদীপ। তাঁর আলোয় সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হয়ে গেছে এবং সকল সন্দেহের নিরসন হয়ে গেছে।

৭. আল্লাহ তাআলা রাসূলে আকরাম (সা.)কে আলোকোজ্জ্বল সূর্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেননা আল্লাহ তাআলা রাসূলের মাধ্যমে শিরক এবং গোমরাহীর অন্ধকার দূরীভূত করেছেন। গোমরাহদের হেদায়াত দান করেছেন। একেবারে সেরকম যে, যখন সূর্যের কিরণরশ্মি পৃথিবী ছেয়ে যায়, তখন রাতের অন্ধকার মুহূর্তই নিঃশেষ হয়ে যায়।

৮. সূরা  আহযাবে কিছু সামাজিক আচরণের শিক্ষা দেয়া হয়েছে, যা সম্পর্কে জাহেলি যুগের মানুষরা অজ্ঞাত ছিলো। এখানে তিনটি বিষয় উল্লিখিত হয়েছে-

এক. কারো ঘরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করো না।
দুই. কোথাও খাবারের দাওয়াত করা হলে খানা শেষে উঠে যাও। গল্পগুজবে লেগে পড়ো না। ঘরবাসির সময় নষ্ট করো না।
তিন. কোনো পরনারীর কাছে কোনো জিনিস চাওয়ার প্রয়োজন পড়লে, পর্দার আড়াল থেকে চাও। পর্দাহীন তাদের সামনে চলে এসো না। অবশ্য মাহরাম হলে সামনে আসার অনুমতি রয়েছে।

৯. উম্মাহাতুল মুমিনীনের মর্যাদার আলোচনার পর আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.) এর সম্মান এবং মর্যাদার আলোচনা করলেন। মুমিনদেরকে তাঁর উপর দরূদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিলেন। রাসূলের উপর দরূদ পাঠ মূলত আমাদের জন্যেই ইজ্জত, সম্মান, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গোনাহ মাফের কারণ।

১০. প্রথমে নবীপত্নিদের উপর তারপর সাধারণভাবে সমস্ত মুসলিম নারীদের উপর পর্দার হুকুম নাযিল হয়েছে। পর্দা হচ্ছে, নারীদের সম্মান এবং নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। সমীহ এবং প্রশংসনীয় বিষয়। পর্দা পালনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি-

এক. পর্দা এমনভাবে হওয়া চাই, যাতে পুরো শরীর ঢেকে দেয়।
দুই. পর্দা রক্ষার জন্যে যা পরলেন, সেটা যেন এমন আকর্ষণীয় না হয় যে, অন্য পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ হয়ে যায়।
তিন. পর্দার পোশাকটি যেন এমন চিকন ও পাতলা না হয় যে, ভেতর থেকে শরীরের রং ঠিকরে বেরোয়।
চার. ঢিলেঢালা হবে। এত টাইটফিট যেন না হয় যে, ভেতর থেকে ফিতনায় পতিত হওয়ার সম্ভাব্য অঙ্গ প্রকাশিত হয়ে না যায়।
পাঁচ. সুগন্ধি মেখে বের হওয়া যাবে না, যাতে পথচারীদের মোহনীয় করে তুলে।
ছয়. পুরুষের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাক যেন না হয়।
সাত. কাফির-মুশরিক তথা বিধর্মী নারীদের ধর্মীয় পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো পোশাক যেন না হয়।
আট. নামধাম ও খ্যাতির পোশাক যেন না হয়। যে পোশাকগুলো সাধারণত খ্যাতি ও নামধামের জন্য পরা হয়।

১১. সূরার শেষের দিকে ফরয, ওয়াজিব এবং শরয়ী বিধিবিধানের গুরুত্ব বিবৃত হয়েছে যে, এই বিধানাবলী সেই আমানতের অংশ যা আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সোপর্দ করেছেন। আসমান, যমীন এবং পাহাড়-পর্বত যে আমানতের দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কেননা সেগুলোর ভেতর তো সেই আমানত গ্রহণের যোগ্যতাই ছিলো না। যেহেতু মানুষকে আল্লাহ তাআলা বুদ্ধি ও ফিকির দিয়েছেন, ভালোমন্দ পার্থক্য করার যোগ্যতা দিয়েছেন। তারা তো সেই দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে, কিন্তু সে দায়িত্বের হক আদায় করতে পারছে না।

সূরা সাবা
১২. সূরা সাবা মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৫৪ টি আয়াত ও ৬ টি রুকু রয়েছে। এই সূরা শুরু হয়েছে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও স্তুতির মাধ্যমে। যিনি সমস্ত মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন। পুরো জগত পরিচালিত হওয়ার জন্য মজবুত নিয়ম এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সব বিষয়ের খবর রাখেন তিনি। তাঁর কোনো কাজই প্রজ্ঞা ছাড়া নয়।

এরপর মুশরিকদের বেলায় বলা হয়েছে যে, তারা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভ, হিসাব-নিকাশ, পুরস্কার এসব বিষয় অস্বীকার করে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে হুকুম দিয়ে বললেন, আপনি কসম করে বলুন কিয়ামত আসবেই। এবং অবশ্যই নেক আমলের জন্য পুরস্কার এবং নাফরমানির জন্য শাস্তি পেতে হবেই।

১৩. হযরত দাউদ, হযরত সুলাইমান এবং আহলে সাবা’র উপর আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের আলোচনা করে মূলত কৃতজ্ঞ অকৃতজ্ঞদের সামনে নিয়ে এলেন। প্রথম উল্লিখিত দুজন আল্লাহর নবী এবং কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। হযরত দাউদ আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা অসাধারণ অলৌকিক কণ্ঠস্বর দান করলেন। তিনি যখন আল্লাহর জপতেন, তখন পাহাড় এবং পাখীরা পর্যন্ত তাঁর সাথে জিকিরে শামিল হয়ে যেত। তিনি যখন যাবুর কিতাব তিলাওয়াত করতেন, প্রাণীরা তাঁর তিলাওয়াত শোনার জন্য চলে আসত। অন্যরকম অবস্থা তাদের মাঝে সৃষ্টি হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য লোহা নরম করে দিলেন। তিনি সেই লোহা যেদিকে চাইতেন সেদিকে ফেরাতে পারতেন। যা চাইতেন, বানাতে পারতেন।

হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম লোহার ফ্যাক্টরি বানিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে লোহার শক্তিশালী বর্ম তৈরি হতো। এটাকেই পৃথিবীর সর্বপ্রথম স্টিলমিল হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৪. হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামকেও আল্লাহ তাআলা অনেক নিয়ামত প্রদান করেছিলেন। তাঁকে পাখিদের ভাষা শিখিয়েছিলেন। বাতাস তাঁর অধীন করে দিয়েছিলেন। তামা জাতীয় ধাতুকে আল্লাহ তাআলা সুলাইমান আলাইহিস সালামের জন্য পানির ন্যায় বহমান তরল পদার্থে পরিণত করে দিয়েছিলেন। তাই সহজেই যা বানাতে পারতেন। আজকাল আধুনিক যুগে উড়োজাহাজ চলে। সেসময় সুলাইমান আলাইহিস সালামের সিংহাসনও আকাশে উড়তো। পরিবার-পরিজন ও সভাসদ সকলেই সেই সিংহাসনে আরোহন করে যেখানে ইচ্ছা যেতে পারতেন।

আল্লাহ তাআলা বাবা-ছেলে উভয়কে বিস্ময়কর নিয়ামতরাজি দেওয়ার পরও তারা অহংকার করেন নি, ঔদ্ধত্যভাব তাদের মাঝে চলে আসে নি। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও গাফেল হন নি।

১৫. দ্বিতীয় কাহিনি হচ্ছে আহলে সাবা’র। আগের কাহিনি ঈমানদার ও কৃতজ্ঞদের জন্য আলোর মিনার ছিলো। দ্বিতীয় কাহিনি নাফরমান ও অকৃতজ্ঞদের জন্য গভীর অন্ধকারের কারণ। আহলে সাবা’কে আল্লাহ তাআলা অসামান্য রিযিক, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও আবহাওয়া, উর্বর জমিন, ফলবান বাগান প্রভৃতি নিয়ামতে ভূষিত করেছিলেন। দীর্ঘ পথ পর্যন্ত দু’ধারে বাগান আর বাগানের সারি থাকত। প্রচণ্ড গরমও ছিলো না, ক্ষুধাও পেরেশান করে তুলত না। পানি জমা করার জন্য বিরাট জলাধার তৈরি করল। কিন্তু তারা এ সমস্ত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে নি। বরং অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকল। পরে সেই পরিণতি তাদের হলো, যে পরিণতি সকল অকৃতজ্ঞ জাতির হয়েছিল। পানির বাঁধ ভেঙে সবাই আযাবে পতিত হলো। ধ্বংসে পতিত হলো। সবগুলো বাগান বিরান হয়ে গেলো। যে এলাকা ফলমূলে ভরপুর ছিলো, নিমিষে তা জঙ্গলে পরিণত হলো।

১৬. মুশরিকদের নাফরমানি এবং বিদ্রোহী হওয়ার পেছনে মৌলিক কারণ বলা হয়েছে যে, তাদের প্রচুর ধন-সম্পদ ছিলো। তারা এর উপর অহংকার এবং আত্মগরিমায় লিপ্ত হয়েছিল। তারা মনে করত তাদের মতো সন্তান ও সম্পদশালীদের দুনিয়াতেও শাস্তি হবে না, আখেরাতেও হবে না। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, যাকে চান তিনি রিযিক বৃদ্ধি করে দেন এবং যাকে ইচ্ছা অভাব ও সংকীর্ণতায়ও ফেলেন।

১৭. তাদের এই সম্পদ রাসূল (সা.) এর সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা. তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার প্রতি আগ্রহী করে তুলে। তারা তাঁকে উন্মাদ পর্যন্ত বলতে বিরত হয় না। তাদের জবাবে বলা হলো, “বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি: তোমরা আল্লাহর নামে এক একজন করে ও দু দুজন করে দাঁড়াও, তারপর চিন্তাভাবনা করো। তোমাদের সঙ্গীর মধ্যে কোনো উন্মাদনা নেই। তিনি তো আসন্ন কঠোর শাস্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করেন মাত্র।” (৪৭)

সূরা ফাতির
১৮. সূরা  ফাতির মক্কায় অবতীর্ণ সূরা । এতে ৪৫ টি আয়াত ও ৫ টি রুকু রয়েছে। এই সূরা য় তাওহিদের দাওয়াত, শিরকের মূলোৎপাঠন এবং সত্য দ্বীনের উপর অবিচল থাকার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সূরার শুরুতেই সেই মহান স্রষ্টার আলোচনা এসেছে যিনি এই জগত সৃষ্টি করেছেন। মানুষ, ফেরেশতা এবং জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হওয়ার এমন সুস্পষ্ট এবং যুক্তিসংগত দলিল পেশ করা হয়েছে, যা প্রত্যেক শহুরে এবং গ্রাম্য লোকের বুঝে আসতে পারে। ইরশাদ হচ্ছে যে, “আমি বৃষ্টি দ্বারা ভূখণ্ডকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করে দেই।”

যিনি রাত-দিনকে একের পর এক ধারাবাহিকভাবে নিয়ে আসেন। তাই তিনি মৃত মানুষকে পুনর্জীবিত করতেও পারেন।

১৯. ঈমান এবং কুফরের মধ্যকার সহজ পার্থক্য নির্ণয় করে দেয়া হয়েছে এই সূরা য়। বলা হয়েছে, দৃষ্টিসম্পন্ন ও দৃষ্টিহীন, আন্ধকার ও আলো, ছায়া ও তপ্ত রোদ, জীবিত ও মৃত কোনোটাই সমান হতে পারে না। ঠিক তদ্রূপ মুমিন ও কাফির সমান হতে পারে না।

২০. এরপর আল্লাহ তাআলার কুদরতের আলোচনা। বিভিন্ন রং ও স্বাদের ফলমূল, কালো, লাল এবং সাদা পাহাড়, বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা ও স্বভাবের মানুষ, হাজার প্রকারের পাখি, জন্তু ও চতুষ্পদ প্রাণী; সবকিছুতেই আল্লাহ তাআলার সীমাহীন কুদরতের নিদর্শন বিদ্যমান। যে ইলম সম্পন্ন ও জ্ঞানী, এসবের গভীরে যাওয়া এবং চিন্তা করার সুযোগ ও যোগ্যতা রয়েছে তারাই আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহর বড়ত্ব এবং মহত্ব তাদের ভেতরই জাগ্রত হয়। এজন্য বলা হয়েছে যে, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।” (২৮)

এজন্যে এই আয়াতে উলামা দ্বারা কেবল শরীয়তের আলিম নন, বরং জগত এবং জগত সংশ্লিষ্ট যা কিছু আছে, সেসবের ইলম যারা রাখেন, যেমন: চিকিৎসা বিজ্ঞান, সৌরজগত, উদ্ভিদ ও যমীন সম্পর্কিত আলিম যারা রয়েছেন, সবাই এখানে শামিল।

২১. এরপর কুরআনের আলোচনা এবং কুরআন তিলাওয়াতকারীর প্রশংসা করা হয়েছে। এই প্রশংসার পর সাধারণভাবে উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, যাদের উপর আল্লাহ তাআলা এই কুরআন নাযিল করেছেন। কিন্তু কুরআন নাযিলের পর এই উম্মত তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে-

এক. যালিম, ওই গোনাহগার মুসলমান, যাদের গোনাহ তাদের সওয়াব থেকে অধিক পরিমাণ।
দুই. মধ্যমপন্থী, যাদের গোনাহ এবং নেকি সমান সমান।
তিন. ওই সত্য মুমিনগণ, যারা ইবাদত-বন্দেগীতে অন্যদের থেকে এগিয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত এই তিন শ্রেণীর ঠিকানাই জান্নাত। তবে গোনাহের উপর ভিত্তি করে আগ-পিছ হবে।

২২. সূরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলার ধৈর্য ও সহনশীলতার আলোচনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা গোনাহের উপর সাথে সাথেই শাস্তি প্রদান করেন না। যদি এমনটা হতো, তাহলে এই যমীনে মানুষ তো দূরের কথা, কোনো জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ পর্যন্ত জীবিত থাকা সম্ভব হতো না।

সূরা ইয়াসীন
২৩. সূরা ইয়াসীন মক্কায় অবতীর্ণ সূরা । এতে ৩৩ টি আয়াত এবং ৫ টি রুকু রয়েছে। আমাদের মুসলিম সমাজে এই সূরার কথা মৃত্যুর সময় স্মরণ হয়, মৃত্যুকালীন কঠিন অবস্থা সহজ হওয়ার জন্য। কিন্তু এই সূরার উপর আমলকারীর সংখ্যা খুব কম। অথচ প্রকৃত সওয়াব এবং আল্লাহর নৈকট্য তো এই সূরার অন্তর্নিহিত বিষয়ের উপর আমলের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

এই সূরার শুরুতে রাসূল (সা.) এর রিসালাতের সত্যতার উপর আল্লাহ তাআলা কুরআনের শপথ করেছেন। এরপর কুরাইশের কাফিরদের আলোচনা, যারা কুফর এবং গোমরাহীতে নিমজ্জিত, যার কারণে তারা আল্লাহর আযাবের উপযুক্ত হয়ে গেছে।

২৪. তারপর ওই বস্তিবাসীর আলোচনা, যারা একাধারে তিনজন নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। আর যখনই তাদের মধ্যে একজন সত্যপন্থী, নসিহতকারী তাদেরকে বোঝাতে লাগলেন, তাঁকেও তারা শহীদ করে দিলো। এই নসীহতকারীর নসীহতের কিছু ২৩ তম পারার আলোচিত হবে ইনশাআল্লাহ!

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১৮তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৬তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৪তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা