১৮তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

১৮তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

মুফতী জিয়াউর রহমান ৩:০৩ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০১৯

১৮তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

আজ ১৮তম তারাবীহ। আজকের তারাবীহতে সূরা আনকাবুতের ৪৫ থেকে সূরার শেষ ৬৯ আয়াত, সূরা রুম, সূরা লোকমান, সূরা আলিফ-লাম সাজদা এবং সূরা আহযাবের ১ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। আজ পড়া হবে ২১তম পারা। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবীহতে পঠিতব্য অংশের আলোচনা সংক্ষেপে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো।

সূরা আনকাবুতের অবশিষ্ট আলোচনা

১. এই পারার শুরুতে আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীম তিলাওয়াত এবং নামায কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন। নামাযের এই উপকারের কথা বলা হয়েছে যে, তা সকল অশ্লীল এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। বাস্তবতাও এমন যে, যদি নামাযের সকল শর্ত, নিয়ম এবং আদাব রক্ষা করে আদায় করা যায়, তাহলে তার উপকার এবং ফলাফল অর্জিত হবেই। সেই নামায নামায আদায়কারী ব্যক্তি এবং গোনাহের মধ্যে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

২. এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, “নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে” এর মানে কী? জবাবে বললেন: যে ব্যক্তিকে তার নামায অশ্লীল ও গর্হিত কর্ম থেকে বিরত রাখে না, তার নামায কিছুই নয়।

ইমাম আবুল আলিয়াহ রাহ, বলেন: নামাযে তিনটি গুণাগুণ পাওয়া যায়। ইখলাস, আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর যিকর অর্থাৎ কুরআন তিলাওয়াত। এই গুণগুলো নামাযীকে নেক কাজের হুকুমও করে, মন্দ কাজ থেকে বিরতও রাখে। যার নামাযে এই তিনটি গুণাগুণ পাওয়া যায় না, প্রকৃত অর্থে তার নামায কোনো নামাযই নয়। এখন একটু আত্মসমালোচনার বসলে ফলাফল বেরিয়ে আসবে খুব সহজেই। আমাদের নামাযী লোক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে, তবুও সর্বত্র গোনাহের বাজার রমরমা হওয়ার এটাই কারণ যে, আমরা নামায আদায় করি ঠিক, কিন্তু প্রাণহীন নামায হওয়ার কারণে ব্যক্তি এবং সমাজে এর প্রভাব চোখে পড়ে না বললেই চলে।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্য নবী হওয়ার এক সুস্পষ্ট আলামত হলো যে, তিনি ছিলেন উম্মি; লিখতে-পড়তে জানতেন না। যদি তিনি লিখতে-পড়তে জানতেন, তাহলে বাতিলরা এই বলে অপপ্রচার করত যে, তিনি হয়ত পূর্বের কিতাবাদি থেকে এই ইলম অর্জন করে নিয়েছেন। এত স্পষ্ট দলিল সত্ত্বেও তারা মু'জেযা দেখতে চায়। অথচ কুরআনের চাইতে বড় মু'জিযা আর কী হতে পারে? আল্লাহ তাআলা বলেন, কুরআনের মু'জিযা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়?

সেই সময় বড় বড় ভাষাবিদ, সাহিত্যিক থাকা সত্ত্বেও তারা কুরআনের অনুরূপ কিছু বানিয়ে দেখাতে সক্ষম হয় নি। কুরআন তো মু'জিযারও মু'জিযা। সর্বকালের মু'জিযা। তাহলে অন্য মু'জিযা চাওয়া কেবল জিদ আর মূর্খতাপ্রসূত কাজ নয় কি?

৪. বিরুদ্ধবাদীদের আলোচনার পর এখন মুত্তাকিদের আলোচনা করা হচ্ছে। তাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হিজরত এবং দ্বীনের উপর চলতে গিয়ে মুসিবতে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিলেন। যারা ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করে, নিঃসন্দেহে জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন এবং চিন্তা তাদের সামনে চলে আসে যে, অচেনা-অজানা পরদেশে চুলায় আগুন জ্বলবে কেমনে? এজন্যে সান্ত্বনা দেয়ার লক্ষে বলা হলো; যে আল্লাহ দুর্বল প্রাণীর রিযিকের ব্যবস্থা করেন, তিনি তোমাদের রিযিকও প্রদান করবেন। এজন্যে হিজরত করার পর তোমাদের অভাবের ভয় করার কোনো প্রয়োজন নেই।

৫. বলা যেতে পারে এই সূরার একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা পুরো সূরার সারবস্তু বর্ণনা করে দিয়েছেন এভাবে- যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন।

তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে নিজের নফস, শয়তান এবং দ্বীনের দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া এবং আখিরাতে সৌভাগ্যের পথে চালিত হবার তাওফীক দান করবেন।

সূরা রুম
৫. সূরা রুম মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৬০ টি আয়াত এবং ৬ টি রুকু রয়েছে। কুরআনে কারীমের অলৌকিকত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো এই সূরায় বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী। সূরার শুরুতে একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয় আলোচিত হয়েছে যে, রুমীয়রা বিজয়ী হবে। অথচ ভবিষ্যদ্বাণীটি ঠিক বাস্তবের উল্টো ছিলো। কারণ পারস্যরা তখন রুমীদের উপর পূর্ণ বিজয়ী হয়েছিল এবং রোমের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছিলো। এসময় রুমীদের সাম্রাজ্য জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলো।

৬. ইরানি পারস্যরা মুশরিক তথা অগ্নিপূজক ছিলো। এদিকে রুমীরা তাওহিদে বিশ্বাসী ছিলো। তো মক্কার মুশরিকরা তাদের জ্ঞাতি ভাই ইরানি মুশরিকদের বিজয়ের সংবাদ শুনে আনন্দে বগল বাজাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় কুরআন ভবিষ্যদ্বাণী করল যে, নয় বছরের ভেতর ইরানিদের উপর রুমীরা বিজয়ী হবে। মুশরিকরা পরিস্থিতির ঠিক উল্টো এই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগল। কিন্তু ঠিক নয় বছরের ভেতরেই কুরআনের এই গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন হলো। রুমীয়দের হাতে ইরানিদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো।

৭. সূরা রুম এই যুদ্ধের বাস্তব ফলাফল এটা বর্ণনা করল যে, আদিকাল থেকেই আল্লাহর বাহিনী এবং শয়তানের বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ চলমান রয়েছে। কুফর এবং ঈমান, হক এবং বাতিলের এই লড়াই কিয়ামত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। কিয়ামতের দিন তো উভয়পক্ষের পৃথক পৃথক ঠিকানাও নির্ধারিত হয়ে যাবে।

৮. আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসকে তার বিপরীত থেকে সৃষ্টি করেন। যেমন জীবিত এবং মৃত একে অপরের বিপরীত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার পরিপূর্ণ কুদরতের দ্বারা বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি করেন। ডিম থেকে বাচ্চার জন্ম দেন। বীজ থেকে বৃক্ষ উৎপন্ন করেন। আবার গাছ থেকে বীজও উৎপাদন করেন।

-তিনি মানুষকে প্রাণহীন মাটি থেকে সৃষ্টি করলেন। মানুষ দ্বারা আদম আলাইহিস সালামও উদ্দেশ্য হতে আবার প্রত্যেক মানুষও উদ্দেশ্য হতে পারে। কেননা মানুষের খাবার তো মাটি থেকে উৎপন্ন হয়।

-স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আল্লাহ এমন ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন, যেন মনে হয় একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বিয়ের পূর্বে তাদের মধ্যে কোনো পরিচিতিই ছিলো না।

-তিনি আসমান-যমীন এবং এর মধ্যে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, মানুষের ভাষা এবং রং ভিন্ন ভিন্ন। কারো ভাষা আরবি, কারো ভাষা ইংরেজি, কারো ভাষা বাংলা, কারো ভাষা ফারসি, কারো ভাষা ফ্রেঞ্চ। কারো রং কালো কারো রং লাল।

-তিনি রাতে এবং দিনে ঘুমের মাধ্যমে মানুষকে প্রশান্তি দান করেন। মানুষের শরীর এমন মেশিন যে, নানা ব্যস্ততার পর যদি একটু বিরাম না নেয়া যায়, তাহলে মেশিনে সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায়।

-আকাশে বিদ্যুৎ চমকে, এতে ভয়ও লাগে আবার বৃষ্টির আশাও জাগ্রত হয়। তখন বৃষ্টির মাধ্যমে মৃতপ্রায় জমি নতুন জীবন পায়।

-আসমান ও যমীনের এই সিস্টেম আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের জীবন্ত দলিল। আসমান কোনো স্তম্ভ ছাড়াই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরমধ্যে তারকাগুলো চলছে, ঠিক তদ্রূপ যমীনও সবসময় নড়ছে, কিন্তু তার বাসিন্দারা টেরই পাচ্ছে না।

-প্রত্যেক যামানায় আল্লাহ তাআলার এই নিয়ম রয়েছে যে, তিনি হককে বাতিলের উপর বিজয় দান করেন। যদিও কোথাও হকপন্থীরা পরাজিত হয়ে যায়, তাহলে আত্মসমালোচনা করা উচিত যে, আহলে হক হয়ত বাতিলের পথে চলছে এবং বাতিলরা হকের কিছু বিষয় ও নীতি গ্রহণ করে নিয়েছে। যার কারণে আল্লাহ তাঁর নেযামের মধ্যে পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।

-তাই তো আল্লাহ তাআলা বলেন: স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে। (৪১)

৯. সূরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলা মক্কার কাফিরদের আলোচনা করলেন। তারা মৃতদের মতো আল্লাহ তাআলার আয়াত শুনেও না, দেখেও না, চিন্তাভাবনাও করে না, গ্রহণও করে না। ইরশাদ হচ্ছে- আমি এই কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি। আপনি যদি তাদের কাছে কোনো নিদর্শন উপস্থিত করেন, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, তোমরা সবাই মিথ্যাপন্থী।

সূরা লুকমান
১০. সূরা লুকমান মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ২৩ টি আয়াত ও ৪ টি রুকু রয়েছে। এই সূরার শুরুতে কুরআনে কারীমের মর্যাদার আলোচনা এসেছে। এ বিষয়ে মানুষ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একভাগ মুমিনদের, যারা এই হেদায়াতের বাণীকে সত্য হিসেবে স্বীকার করেছে। আরেক ভাগ কাফিরদের, যারা আল্লাহর আয়াত শুনে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

১১. এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত ও একত্ববাদের চারটি দলিল পেশ করেছেন।

প্রথম দলিল- তিনি আসমানকে কোনো স্তম্ভ বা খুঁটি ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। অথচ এখানে আলোক রয়েছে, তারকা রয়েছে সূর্য-চন্দ্র রয়েছে।

দ্বিতীয় দলিল- ওই পাহাড়সমূহ যেগুলোকে জমিনের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য আল্লাহ স্থাপন করেছেন। পাহাড়গুলো না থাকলে বাতাশ এবং পানির কারণে যমীন এদিকসেদিক নড়াচড়া করত।

তৃতীয় দলিল- অসংখ্য প্রাণী, জীবজন্তু, গৃহপালিত ও অন্যান্য চতুষ্পদ জন্তু, কীটপতঙ্গসহ উপরে-নিচে হাজার হাজার মাখলুকাত সেগুলোর আকৃতি ও রং ভিন্ন ভিন্ন। এ সবকিছুর খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেই না।

চতুর্থ দলিল- তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামান। যার মাধ্যমে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বস্তু উৎপন্ন হয়।

১২. হযরত লুকমান (রহ.) নবী না হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রজ্ঞা ও ইলম দিয়ে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর কথাগুলো শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের বিশাল সম্ভার। আল্লাহ তাআলা তাঁর পাঁচটি নসিহতের আলোচনা করেছেন। যেগুলো আকিদা, ইবাদাত, আত্মশুদ্ধি ও উত্তম চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।

প্রথম নসিহত- হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। কেননা শিরক হচ্ছে, অনেক বড় যুলুম এবং এর পরিণাম ধ্বংসাত্মক। এরপর আল্লাহ তাআলা মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণের হুকুম দিলেন।

দ্বিতীয় নসিহত- আখেরাতের ব্যাপারে যে, আল্লাহর ইলমে কোনো জিনিস লুকায়িত নয়। যত ছোট গোনাহই হোক না কেন? কোনো জিনিস গোপনও না।

তৃতীয় নসিহত- আল্লাহ তাআলার দিকে মনোযোগ প্রদানের ব্যাপারে। এটা হাসিল হবে পরিপূর্ণরূপে নামাযের অদায়ের মাধ্যমে, কল্যাণের দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে এবং মন্দ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে।

চতুর্থ নসিহত- স্বীয় পুত্রকে অহংকার এবং আত্মগরিমা থেকে নিষেধ করেছেন।

পঞ্চম নসিহত- সন্তানকে উত্তম চরিত্র অবলম্বনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

১৩. সূরার শেষের দিকে বলা হচ্ছে, পাঁচটি জিনিসের ইলম শুধু আল্লাহ তাআলার কাছে আছে। আর কারো কাছে নেই! কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? বৃষ্টি কখন এবং কোথায় হবে? মায়ের গর্ভে সন্তান কী অবস্থায় আছে? মানুষ আগামিকাল কী করবে? মৃত্যু কখন এবং কোথায় হবে?

সূরা সিজদা
১৪. সূরা সিজদা মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৩০ টি আয়াত এবং ৩ টি রুকু রয়েছে। সূরার শুরুতে কুরআনের সত্যতার আলোচনা এসেছে। এই সূরায় আল্লাহর একত্ববাদ এবং কুদরতের দলিল আলোচিত হয়েছে।

১৫. এই সূরা অপরাধী এবং ঈমানদারগণের অবস্থার বিবরণ দিয়েছে। কিয়ামতের দিন অপরাধীদের উপর অপদস্থতা চাপিয়ে দেয়া হবে। তারা আফসোস করে বলবে হায়! আবার যদি দুনিয়াতে ফিরে যেতে পারতাম।

অপরদিকে ঈমানদারগণের অবস্থার কথা বলা হচ্ছে যে, তারা দুনিয়াতে আল্লাহর সামনে মাথা নত করে চলে। রাতে বিছানা থেকে উঠে আল্লাহর ইবাদত করে। তারা আল্লাহর শাস্তির ভয় করে। তাঁর রহমতের আশা করে। আল্লাহর দানকৃত বস্তু আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে। তারা লুকিয়ে লুকিয়ে ইবাদত করেছিল, আল্লাহ তাআলাও তাদের নিয়ামতরাজি পরকালের জন্য লুকিয়ে রেখেছেন।

সূরা আহযাব
১৬. সূরা আহযাব মদিনায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৭৩ টি আয়াত ও ৯ টি রুকু রয়েছে। প্রথম দুই আয়াতে স্বীয় নবীর মাধ্যমে নবীর সমস্ত উম্মতকে চারটি বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেগুলো মূলত সফলতা এবং সৌভাগ্যের উপাদান।

প্রথম: আল্লাহকে ভয় করতে থাকা।
দ্বিতীয়: কাফির এবং মুনাফিকদের রায়ের অনুসরণ না করা। তৃতীয়: ওহীর অনুসরণ করতে থাকা।
চতুর্থ: আল্লাহ তাআলার উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখা।

১৭. জাহিলিয়াতের যুগের মানুষের এই আকিদা ছিলো যে, আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের ভেতর দুটি অন্তর সৃষ্টি করেছেন। সেই বাতিল কথা প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের ভেতর দুটি অন্তর সৃষ্টি করেন নি।” একই অন্তর ঈমান এবং কুফর একসাথে একত্র হবে না। হয়ত ঈমান, নয়তো কুফর।

১৮. জাহেলী যুগে এই প্রথা ছিলো যে, কেউ যদি তার স্ত্রীকে “তুমি আমার জন্য আমার পিঠের মতো” এজাতীয় কোনো কথা বলত, তখন তারা ওই স্ত্রীকে ওই স্বামীর জন্য চিরদিনের জন্য হারাম করে দিতো। কিন্তু কুরআন বলছে, কাফফারা দিয়ে দিলে স্ত্রী হালাল হয়ে যাবে।

১৯. ইসলামের পূর্বে পালকপুত্র বা মুখডাকা পুত্রকে আপন পুত্রের মতো মনে করা হতো। কুরআন সেটাও বাতিল করে দিয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পালকপুত্র হযরত যায়দ বিন হারিসা যে আপন পুত্র নয়, সেটাও পরিষ্কার করে দেয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত উম্মতের জন্য পিতৃতুল্য। সকল উম্মুল মু'মিনীন উম্মতের জন্য মাতৃতুল্য।

২০. এরপর আহযাবের যুদ্ধ ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের বিস্তারিত এসেছে। আহযাবের যুদ্ধ যাকে গাজওয়ায়ে খন্দকও বলা হয়। ৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে দশ থেকে পনেরো হাজার মুশরিকদের দল মদিনা অবরোধ করে নিয়েছিল। এই যুদ্ধ অনেক গোত্র সংশ্লিষ্ট ছিলো। ইয়াহুদে বনু নাযীর এবং ইয়াহুদে বনু কুরায়যার সঙ্গে মুসলমানদের চুক্তি ছিলো। একে অপরের দুশমনদের সাহায্য না করার অঙ্গীকার ছিলো। কিন্তু ইহুদিরা উন্মুক্তভাবে সব চুক্তি ভেঙ্গে ফেলল। এবং আবু সুফিয়ানের বাহিনীর সাহায্যকারী হয়ে গেলো। মুসলমান মাত্র ৩ হাজার ছিলেন। হযরত সালমান ফারসি রা,র পরামর্শ এবং ফর্মুলায় দুশমন আক্রমণের সম্ভাব্য এরিয়ায় খন্দক তথা পরিখা খনন করা হলো। এজন্য এই যুদ্ধকে খন্দক তথা পরিখা যুদ্ধ বলা হয়। আহযাব এ জন্য বলা হয়, যারা মদিনায় আক্রমণ করেছিল, তারা ছিলো বিভিন্ন গোত্রের সম্মিলিত বা কোয়ালিশন বাহিনী।

২১. এই যুদ্ধে প্রায় একমাস মদিনা অবরুদ্ধ ছিলো। অবশেষে নুআইম ইবনে মাসউদ গাতফানীর প্রচেষ্টায় তাদের মাঝে বিক্ষিপ্ততা এবং হুলুস্থুল সৃষ্টি হলো। এদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এদিন প্রবল ঝড়-তুফান শুরু হলো। তাদের তাবুগুলো উপড়ে গেলো। তাদের হিম্মত নষ্ট হয়ে গেলো। ভীতির সঞ্চার হয়ে গেলো। আল্লাহ তাআলার সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হবেই যে, তিনি বলেছিলেন: শেষ নবী প্রেরণ করেছেন এজন্য, যাতে অন্যান্য দ্বীনের উপর ইসলামকে বিজয়ী করেন। এই বিজয় ছিলো সুনিশ্চিত।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৬তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৪তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও