১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, ২৫ মে, ২০১৯ | 2 0 1

বিষয় :

১৭ তারাবীহ

১৭ রমযান

সূরা নামল

সূরা কাসাস

সূরা আনকাবুত

২০ পারা

তারাবীহ’র আলোচনা

তারাবীহ’র বয়ান

আজকের তারাবীহ

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

শাইখ জিয়াউর রহমান ৩:২৩ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৯

১৭তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৭তম তারাবীহ আজ। আজকের তারাবীহতে সূরা নামলের ৬০ থেকে সূরার শেষ ৯৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত এবং সূরা কাসাস ও সঙ্গে সূরা আনকাবুতের ১ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে ২০তম পারা। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবীহতে পঠিতব্য অংশের আলোচনা পয়েন্ট আকারে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।

সূরা নামল (অবশিষ্টাংশের আলোচনা)

১. ২০ নং পারার শুরুতে আল্লাহ তাআলার কুদরত এবং একত্ববাদের পাঁচটি দলিলের আলোচনা করা হয়েছে। সেই পাঁচটি দলিল প্রশ্ন আকারে উল্লিখিত হয়েছে।

এক. বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।

দুই. বল তো কে পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং তাকে স্থিত রাখার জন্যে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।

তিন. বল তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পুর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই ধ্যান কর।

চার. বল তো কে তোমাদেরকে জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তাঁর অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।

পাঁচ. বল তো কে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদেরকে আকাশ ও যমীন থেকে রিযিক দান করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।

২. কুরআনের সাধারণ রীতি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা যে একমাত্র উপাস্য ও একক সত্তা তার দলিল দৃশ্যমান সৃষ্টি ও মনুষ্য সত্তার মৌলিকত্ব থেকে প্রদান করে। এতে করে বিরুদ্ধবাদীরা মানতে বাধ্য হয় যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই যে, এই সমস্ত কাজ আঞ্জাম দিবেন।

৩. তাওহিদের আকিদার আলোচনা করার পর দ্বিতীয় মৌলিক যে মাসআলা মুশরিকদের বুঝে আসে না সেটি হচ্ছে, দ্বিতীয়বার পুনর্জীবনের মাসআলা। তাদের কথা হচ্ছে, এটা কিভাবে সম্ভব যে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষরা মরে মাটির সঙ্গে মিশে যাব আবার আমাদেরকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা হবে?

তাদের এই অন্তঃসারশূন্য আপত্তির জবাবে আল্লাহ তাআলা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনাও দিলেন এবং মুশরিকদেরকে ভীতি প্রদর্শন করলেন যে, যা কিছু পূর্বেকার অপরাধীদের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছে, তোমাদের সঙ্গেও তেমনটা হতে পারে। যমীনে চলাফেরা করে দেখে নাও তাদের সাথে কী হয়েছে?

৪. এরপর কিয়ামতের কিছু দৃশ্যের আলোচনা করলেন। বলা হয়েছে যে, এই অবস্থা শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার আগ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এরপর ইস্রাফিল আলাইহিস সালাম যখন প্রথমবার ফুৎকার দিয়ে দেবেন, তখন আসমান-যমীনের সমস্ত মাখলুকাতের উপর ভীতির সঞ্চার হয়ে যাবে। দ্বিতীয় ফুৎকারের পর সমস্ত মাখলুকাত মারা যাবে। যখন তৃতীয় ফুৎকার দিবেন, তখন কবর থেকে সবাই জীবিত উঠে দাঁড়াবে।

সূরা কাসাস
৫. এই সূরা শুরু হয়েছিল কুরআনের মর্যাদার আলোচনার মাধ্যমে, সূরার শেষ পর্যায়ে এসেও বলা হচ্ছে, মানুষের জন্যে কল্যাণ এবং সৌভাগ্যের ব্যাপার হবে, যদি এই কুরআনের শিক্ষাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা হয়।

৬. সূরা কাসাস মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৮৮ টি আয়াত এবং ৯ টি রুকু রয়েছে। এই সূরার বেশিরভাগ আলোচনা ফেরাউনের সঙ্গে মুসা আলাইহিস সালামের যে বিষয়গুলো সামনে এসেছিল, তার আলোচনা। বলা হচ্ছে মিসরে ফেরাউন বড়ত্ব ও অহংকার নিয়ে বসে আছে। যুলুম-নির্যাতনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মিসরবাসীকে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত করেছে। শ্রেণীবৈষম্য সৃষ্টি করেছে। যাতে তার রাজত্বের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তি নিয়ে বিদ্রোহ করা সম্ভব না হয়। একক সাম্রাজ্য হুমকির মুখে না পড়ে। বিশেষত বনী ইসরাইল ছিলো তার যুলুম-নির্যাতনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ফয়সালা ছিলো দুর্বলদের শক্তিশালী করার, পরাজিতদের বিজয়ীরূপে আবির্ভূত করার। সে হিসেবে সাইয়্যিদুনা মুসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয়ে গেলো।

৭. মুসা আলাইহিস সালাম সম্মানিত মাতা পেরেশান হয়ে গেলেন। কেননা তিনি জানেন, ফেরাউন সংবাদ পেলে শিশু মুসাকে জীবিত রাখবে না। সর্বোচ্চ কৌশলী আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের যিম্মাদার হয়ে গেলেন। মাতা সিন্দুক বানালেন। শিশু মুসাকে সেই সিন্দুকে বসিয়ে নীলনদে ভাসিয়ে দিলেন। পানির ঢেউয়ে ভাসতে থাকা সিন্দুকের ভেতর থেকে শিশু মুসাকে তুলে কোনো এক সেবিকা ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার রা, কোলে এনে দিলো। এই শিশুকেও ফেরাউন হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কৌশলের কাছে সকল ষড়যন্ত্র আর নীলনকশা নস্যাৎ হয়ে যায় নিমিষেই। সব প্ল্যান-প্রোগ্রাম তছনছ হয়ে যায় মুহূর্তেই। আল্লাহ তাআলা যা ফয়সালা করে রেখেছেন, তা-ই হবে। সেভাবেই সবকিছু এগুচ্ছে।

৮. এদিকে নানান চিন্তা ও বিষণ্নতায় মমতাময়ী মায়ের অস্থির অবস্থা। সারাক্ষণ সন্তানকে নিয়েই কল্পনা। ফেরাউনের হাতে পড়ে হত্যা ও খুনের ফোয়ারা যেন চোখে ভাসছে সবসময়। কিন্তু দয়াময় আল্লাহ তাঁর অস্থির চিত্তে প্রশান্তি এনে দিলেন। ওয়াদা দিলেন, সন্তান তোমার কোলেই আবার ফিরে আসবে। এটা কিভাবে সম্ভব হবে, সেটা আল্লাহর বিষয়। তিনিই ভালো জানেন।

ক্ষুধার্ত বাচ্চাকে দুধ পান করানোর জন্যে কয়েকজন দাই চেষ্টা করেও কাজ হলো না। কারো দুধ পান করতে রাজি হলেন না শিশু মুসা। কাছ থেকেই অপরিচিত হিসেবে এই দৃশ্য দেখছেন মুসা আলাইহিস সালামের বোন। শেষে অপরিচিত বেশে থাকা বোনের পরামর্শেই অস্থির মাকে ডাকা হলো। ফেরাউন এই নিয়ম জারি করেছিল যে, বনী ইসরাইলের কোনো সন্তানই যেন আপন মায়ের দুধ পান করতে না পারে। আল্লাহর কী আজীব কুদরতের লীলা- যে কোল মুসার পরশের পরম অপেক্ষায় ছিলো; দাই হিসেবে দুধ পান করানোর জন্য আপন মায়ের সেই কোলেই তুলে দেওয়া হলো মুসাকে।

৯. আল্লাহর ফয়সালা এটাই ছিলো যে, সেই সময়কার সবচে বড় যালিম ফেরাউন তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হিসেবে চিরন্তন শত্রু থেকে বেঁচে থাকার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তার ঘর থেকেই লালিত-পালিত হয়ে বড় হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রভুত্বের মিথ্যা দাবিদারকে ব্যর্থ প্রমাণিত করাই ছিলো মহান পালনকর্তার ফয়সালা। ঠিক তা-ই হলো।

১০. মুসা আলাইহিস সালাম যৌবনে পদার্পণ করলেন। দুর্ঘটনাবশত এক কিবতি নিহত হয়ে গেলো তাঁর হাতে। এক সহমর্মী লোক তাঁকে মিসর থেকে চলে যাবার পরামর্শ দিলো। তিনি মিসর ছেড়ে মাদয়ান চলে গেলেন। সেখানে সবকিছু অপরিচিত, জীবিকা ও ঠিকানাবিহীন অসহায় অবস্থায় আল্লাহ তাআলার কাছে হাত তুললেন। তিনিই তো বিষাক্ত, মানুষখেকো হিংস্র লোকটির হাতে লালিত-পালিত করালেন। সুতরাং হে রব! তোমারই করুণা ও দয়ার ভিখারি আমি!

১১. এক বৃক্ষের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন। পর্দানশীন ও লাজুক ভঙ্গিমার দুই কিশোরী ছাগল নিয়ে এলো কূপের কিনারে পানি পান করাতে। তিনি তাদের সাহায্য করে পানি পান করালেন। কিশোরীদ্বয় যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ছিলো। বাবা শুয়াইব আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে অপরিচিত যুবকের শক্তিসামর্থ ও আমানতদারীর প্রশংসা করল। শুয়াইব আলাইহিস সালাম এক কন্যাকে পাঠিয়ে আগন্তুক যুবককে ঘরে ডাকলেন। এখানে শুধু সসম্মানে থাকার ব্যবস্থা হলো না, বরং কিছু শর্তে আত্মীয়তার সুযোগও সৃষ্টি হলো। এক কন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের পর আহলিয়াকে নিয়ে মিসর রওয়ানা দিলেন। পথিমধ্যে জঙ্গলের ভেতর আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেলেন। প্রয়োজনের জন্য একটু আগুন আনতে গিয়ে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন। আল্লাহ তাআলাই লাঠি এবং আলোকোজ্জ্বল হাতের মু'জিযা দিয়ে সেই যালিমের সামনে হকের কালিমা বুলন্দ করার হুকুম দিলেন, যে লোকটি আল্লাহর বান্দাদের জন্য এই প্রশস্ত যমীনকে সংকীর্ণ করে রেখেছিল। যে নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে বড় মানতে প্রস্তুত ছিলো না। অবশেষে তাকে একাই নয়, আল্লাহ তাআলা তার সমস্ত সৈন্য-সামন্তসহ উত্তাল সমুদ্রের হাওয়ালা করে দিলেন।

১২. মুসা আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণ কাহিনি থেকে যে উপদেশ ও শিক্ষা অর্জিত হয়-

এক. যদি মানুষ কষ্ট ও মুসিবতের উপর ধৈর্যধারণ করতে পারে, তাহলে দুনিয়া এবং আখিরাতে তার উত্তম ফলাফল দেখতে পাবে।

দুই. যে ব্যক্তি সমস্যাগ্রস্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা রাখে, আল্লাহ তাআলা তার সমস্যা ও সংকট সহজ করে দেন।

তিন. যদি কোনো বান্দা হকের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে পরিপূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়, শত্রুদল থেকেও সাহায্য আসে।

চার. যার ভেতর ঈমান বদ্ধমূল হয়ে যায়, সে ঈমানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে এমনকি প্রাণ বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়।

পাঁচ. গোলামির জীবনের সবচে বড় প্রভাব হচ্ছে, সাহস, হিম্মত এবং অবিচলতা থেকে মাহরূম হতে হয়। যেমনটা বনী ইসরাইলের হয়েছিল।

ছয়. বাতিল যত বড়ই শক্তিশালী হোক না কেন অবশেষে ব্যর্থতার মুখ দেখতেই হবে।

সাত. আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে, যে সম্প্রদায়কে একেবারে তুচ্ছ এবং হেয় মনে করা হয়, এমনও দিন আসে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। রাজত্ব ও ক্ষমতা তাদের হাতে সোপর্দ করে দেন।

আট. যে ব্যক্তি অথবা দল জেনেশুনে হক গ্রহণ করতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে হক গ্রহণ করার যোগ্যতাই ছিনিয়ে নেন।

নয়. এক বড় গোমরাহী হচ্ছে, মানুষ হকের অনুসারী হওয়ার পরিবর্তে হককে নিজের প্রবৃত্তির অনুসারী বানাতে শুরু করে। শনিবার মাছ শিকার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বনী ইসরাইল চালবাজি শুরু করে দিয়েছিল।

দশ. হক কবুল করুক, না করুক দাঈর জন্য ফরয হলো দাওয়াতের যিম্মাদারি আদায় করতে থাকা।

এগারো. জাতির আমলি অধপতনের কারণেই যালিম শাসক সেই জাতির উপর চেপে বসে।

বারো. নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা আম্বিয়া কেরামের সুন্নাত।

১৩. হযরত মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনি ও ফেরাউনের পরিণতি বর্ণনার পর বিভিন্ন আয়াতে মক্কাবাসীদের সতর্ক করা হয়েছে।

১৪. আহলে কিতাবের লোকদের যারা ঈমান এনেছেন, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং মুশরিকদের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার আলোচনা এসেছে।

১৫. এই ধ্বংসশীল দুনিয়ার ধোকা থেকে বেঁচে থাকার উপদেশ এবং কিয়ামতের দিনের দৃশ্য চিত্রায়িত করা হয়েছ। আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং ইচ্ছার আলোচনা এসেছে।

১৬. এরপর ফেরাউনের মতো আরেক অহংকারী, দুষ্টের আলোচনা এসেছে। তার নাম হচ্ছে, কারূন। বংশের হিসেবে সে ছিলো মুসা আলাইহিস সালামের নিকটাত্মীয়। অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম তাকে মুসা আলাইহিস সালামের চাচাত ভাই হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেই সময়কার নয়, শুধু সর্বকালের অন্যতম ধনভাণ্ডারের মালিক ছিলো। তার ধনভাণ্ডারের চাবি বহনের জন্যেই কেবল শক্তিশালী একদল পুরুষ থাকত। সম্পদের আধিক্যে তাকে অতিরিক্ত আত্মগরিমা সম্পন্ন ও অহংকারী বানিয়ে রেখেছিল।

১৭. মুসা আলাইহিস সালাম তাকে বোঝালেন, দেখ! সম্পদের উপর ভিত্তি করে অহংকারে লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহ তাআলা অহংকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা যা দিয়েছেন, সেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পিছনে ব্যয় করো। আল্লাহ যেমন তোমার উপর এহসান করেছেন, তুমিও মানুষের সঙ্গে এহসানের ব্যবহার করো। মানুষের উপর যুলুম করো না, অন্যায় খাতে টাকাগুলো খরচ করো না। কিন্তু কোনো নসীহতই কাজে আসে নি।

১৮. দুনিয়ার মুহাব্বতে ডুবন্ত মানুষ যখন কারূনের শান-শওকত দেখে, তখন তাদের মুখে লালা চলে আসে। তার মতো সম্পদশালী হওয়ার আশা পোষণ করে। যখন আল্লাহ তাআলা তাকে তার ঘরসহ নিচের দিকে ধসিয়ে দিলেন, তখন আল্লাহর আযাব দেখে দুনিয়ালোভীদের চোখ খুলে যায়। তখন তারাও স্বীকার করে, আল্লাহ যদি আমাদের হেফাজত না করতেন, তাহলে আমরা ধ্বসে যেতাম।

১৯. কারূনের আলোচনা শেষে কুরআন এমন এক নসিহত করেছে যে, প্রত্যেক মুসলমানের খুব ভালো করে স্মরণ করে নেয়া উচিত। ইরশাদ হচ্ছে- এই পরকাল আমি তাদের জন্যে নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। পরহেযগারদের জন্যে রয়েছে শুভ পরিণাম। (৮৩)

সূরার শেষ আয়াতে বলা হচ্ছে, আল্লাহর সত্তা ব্যতিত সবকিছু ধ্বংস হবে। বিধান তাঁরই এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।

সূরা আনকাবুত
২০. সূরা আনকাবুত মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। এতে ৬৯ টি আয়াত ও ৭ টি রুকু রয়েছে। এই সূরার বিষয়বস্তুও অন্য মক্কী সূরার মতোই। এই সূরার বিশেষ বিষয়বস্তু হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে 'পরীক্ষার সুন্নাত' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সমস্যা ও মুসিবত অবশ্যই আসবে। এতে কিছু মানুষ ঘাবড়ে যায়। তাদেরকে বোঝানোর জন্য বলা হলো, ঈমানদারদের পরীক্ষা নেওয়া আল্লাহ তাআলার পুরাতন সুন্নাত। এটা নিয়মও যাতে সত্যিকার মুমিন এবং মিথ্যাবাদী মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। ঈমানদার বড় বড় মুসিবতের সময়ও দৃঢ়পদ থাকে, কিন্তু নামধারী মুমিনদের পা নড়বড়ে হয়ে যায়। কেউ কেউ তো দুনিয়ার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য- নাউযুবিল্লাহ- মুরতাদ হয়ে যায়। (১০)

২১. ঈমানদারদের মধ্যে সবচে কঠিন পরীক্ষা তো নবীগণ দিয়েছেন। সংক্ষিপ্তাকারে এখানে হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মুসা, হযরত হারুন আলাইহিমুস সালামের কাহিনির কথা ইঙ্গিত দিলেন, যাতে ঈমানদারগণ একথা জেনে নেয় যে, হকপন্থীদের উপর পরীক্ষা তো আসবে, কিন্তু সেটা স্থায়ী হবে না। শেষমেশ হকপন্থীদের বিজয় হবে। বিরুদ্ধবাদীদের পরাজয় হবে।

২২. মুশরিকদের মূর্তিগুলোকে আনকাবুত অর্থাৎ মাকড়শার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ হিসেবে যে, মাকড়শার জাল যেভাবে খুবই দুর্বল হয়ে থাকে, ঠিক তদ্রূপ তাদের মূর্তিগুলোও খুবই দুর্বল এবং অকেজো হয়ে থাকে। এরা উপকার করারও ক্ষমতাও রাখে না, ক্ষতি করারও ক্ষমতা রাখে না।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১৬তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৪তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও