১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

মুফতী জিয়াউর রহমান ১:৩৪ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০১৯

১৫তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

১৫তম তারাবীহ আজ। আজকের তারাবীহতে সূরা মুমিনুন, সূরা নুর এবং সূরা ফুরকান (১-২০) পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে ১৮তম পারা। আজকের তারাবীহতে পঠিতব্য অংশের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো

সুরা মু’মিনুনের মাধ্যমে ১৮ নং পারা শুরু হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সুরা। এতে ১১৮ টি আয়াত ও ৬ টি রুকু রয়েছে। সুরার শুরুতেই নয়টি আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এমন সাতটি গুণাগুণ আলোচনা করেছেন, যে গুণগুলো অর্জন করলে একজন মুমিন জান্নাতুল ফিরদাউসের উপযুক্ত হয়ে যাবে।

সাতটি গুণ হচ্ছে-
এক. নির্ভেজাল ঈমান, যা রিয়া এবং নেফাক থেকে মুক্ত থাকবে।
দুই. নামাযে দাঁড়ায় ভয়, বিনয় ও অবনত হয়ে।
তিন. অনর্থক কথাবার্তায় বিমুখ ও নির্লিপ্ত।
চার. পরিপূর্ণভাবে যাকাত আদায় করে। এখানে আল্লাহর হকের পরেই বান্দার হকের আলোচনা এসেছে।
পাঁচ. অশ্লীল কাজ থেকে নিজের চরিত্রের হেফাজত করে।
ছয়. আমানতের সংরক্ষণ এবং প্রতিশ্রুতি পুরা করে।
সাত. নামাযের হেফাজতের নির্দেশ। সময়ের সাশ্রয়। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর খেয়াল করে। (১-১১)

মুমিনের গুণাগুণের আলোচনা এসেছে। এরপর মানুষের জীবন এবং মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপের আলোচনা। ঈমানের দলিল আলোচনা করা হয়েছে।

দলিল-১, সাত আসমান এবং এরমধ্যে যে বিস্ময়কর সৃষ্টিজগতের সৃষ্টিকর্ম।
দলিল-২, বৃষ্টি বর্ষণ এবং এর মাধ্যমে নানা রকমের শস্য এবং ফলের উৎপাদন।
দলিল-৩, চতুষ্পদ জন্তুর মাধ্যমে দুধ, গোশত, তুলা, বাহন এবং মাল বহনের কাজসহ নানা রকমের উপকার লাভ। (১২-২২)

এরপর নবীগণের আলোচনা এসেছে। নুহ, হুদ, সালেহ, মুসা, হারুন ঈসা আলাইহিমুস সালামের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের সকলের একই দাওয়াত, একই প্রোগ্রাম, একই উদ্দেশ্য ছিলো। মনে হয় যেন তাঁরা সবাই একই সময়ে একই এলাকায় প্রেরিত হয়েছেন। সবার একই মিশন হওয়া সত্ত্বেও তাদের চলে যাবার পর উম্মতরা বিচ্ছিন্ন ও নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সবাই নিজেদের খেয়াল-খুশি মতে চলতে শুরু করে। আজ মুসলমানদের মাঝেও একই অবস্থা। একই কুরআন, একই নবী, একই কিবলা থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা সবাই এক নয়। একদল আরেক দলের বিপক্ষে কুফরীর ফতোয়া, ফাসিকির ফতোয়া এবং পরস্পরে দ্বন্দ্ব ও ঝগড়া লেগেই আছে। অথচ কুরআন এবং সুন্নাহর সামনে নিজেকে বিলীন করে দেয়ার মধ্যেই রয়েছে সম্পূর্ণ সমাধান।

তবে কিছু মানুষ এমন রয়েছেন, যারা আল্লাহকে ভয় করেন। পরস্পর একে অপরের প্রতি ভালোবাসা রাখেন। তাদের অন্তর হেদায়াতের নূর দ্বারা পরিপূর্ণ। তাদের মাঝে চারটি উল্লেখযোগ্য গুণাগুণ রয়েছে।

এক. তারা আল্লাহর আযাবের ভয় করেন।
দুই. আল্লাহ তাআলার কুদরত ও বিধিবিধান সম্বলিত আয়াতের উপর তারা ঈমান রাখেন।
তিন. তারা লোকদেখানো আমল থেকে বেঁচে থাকেন এবং সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেন।
চার. তারা নেক আমল করতে সময় এই ভয়ের উপর থাকেন যে, আমার আমল আল্লাহ তাআলার কাছে কবুল হলো কী না।

এসমস্ত মুখলিস বান্দাদের মোকাবেলায় ওই হতভাগা লোকদের কথারও আলোচনা এসেছে যারা কুরআনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। তাদের এই দুষ্কর্মের তিনটি বড় কারণ কুরআনে আলোচিত হয়েছে।

এক. তারা বুদ্ধিকে কাজে লাগাত না। তারা কুরআনের ভেতর ফিকির না করে হাসি-তামাশা এবং অস্বীকার করে ফেলত।
দুই. কেবল বিদ্বেষ এবং জিদের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করত। নতুবা তাঁকে তো সবাই চিনে। তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বংশ এবং ব্যক্তিত্বের বিষয়গুলি তারা ভালো করেই জানে।
তিন. তৃতীয় কারণটি প্রশ্ন আকারে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে (নাউযুবিল্লাহ) পাগলামির কোনো প্রভাব অনুভব করেছে? অবশ্য তাদের কেউ কেউ পাগলামির প্রতি সম্বোধন করলেও তাদের মিথ্যাচারের কোনো বাস্তবতা ছিলো না। (৬৮-৭১)

মধ্যখানে রাসুলগণকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা বলছেন-

হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত। (৫১)

এই দুটি আদেশকে একসাথে বর্ণনা করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সৎকর্ম সম্পাদনে হালাল খাদ্যের প্রভাব অপরিসীম। খাদ্য হালাল হলে নেক আমলের তাওফিক আপনা-আপনি হতে থাকে। পক্ষান্তরে খাদ্য হারাম হলে নেক আমলের ইচ্ছা করা সত্ত্বেও তাতে নানা বিপত্তি প্রতিবন্ধক হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে-

ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ: يَا رَبِّ يَا رَبِّ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ، وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ، وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ؟(رواه مسلم).

এক ব্যক্তি (হজ্ব, উমরা ইত্যাদি পালনের জন্য আল্লাহর পথে) দীর্ঘ সফরে থেকে, ধূলি-ধূসরিত দেহ ও এলোমেলো চুল, তার হাত দুটি আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে দুআ করতে থাকে, হে প্রভু! হে প্রভু! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পোশাক হারাম, তার পানীয় হারাম এবং হারাম উপার্জনের জীবিকাতেই তার রক্তমাংস গড়ে উঠেছে। তার দুআ কিভাবে কবুল হবে। (মুসলিম)

সুরার শেষের দিকে আলোচনা করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন দু-ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। একভাগ থাকবে নেকবখত ও সৌভাগ্যবান, আরেক ভাগ থাকবে বদ-বখত ও দুর্ভাগা। সৌভাগ্যবানদের আমলনামা ওজনদার হবে। দুর্ভাগাদের আমলনামা হালকা-পাতলা হবে। সেখানে দুনিয়ার কোনো রিলেশান কাজে লাগবে না। কাফিররা আবার দুনিয়াতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে। স্পষ্ট কথা তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে না। তারা যে দুনিয়াতে ঈমানদারদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, সে কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। আজ তাদের জন্য কেবল আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই নেই।

তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা দুনিয়ায় কতদিন ছিলে? তারা বলবে, একদিন অথবা তারচেয়েও কম। আল্লাহ তাআলা বলবেন: হ্যাঁ খুব কম দিনই তোমরা সেখানে ছিলে। তবে সেই কম দিন থাকার কথাও তোমরা জানতে। তাছাড়া তোমাদের বিবেক-বুদ্ধি তো ছিলোই। বুদ্ধি খাটালেও বুঝতে পারতে দুনিয়াটা খুবই তুচ্ছ এবং সীমিত। এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে পরিতাপে নিপতিত করা এবং পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের বিপরীতে দুনিয়ার জীবনের নগণ্য হওয়ার বিবরণ দেয়া।

রাসুল ﷺ একবার মক্কাবাসীদের উপর দুর্ভিক্ষের আযাব সওয়ার হওয়ার দুআ করেছিলেন। ফলে তারা ঘোরতর দুর্ভিক্ষে পতিত হয়। মৃত জন্তু, কুকুর ইত্যাদি ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে আবু সুফিয়ান রাসুল ﷺ এর কাছে মদিনায় উপস্থিত হয় এবং আত্মীয়তার কসম দিয়ে বলে, আপনি কী একথা বলেন নি যে, আপনি বিশ্ববাসীদের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন? তিনি উত্তরে বললেন: নিঃসন্দেহে আমি একথা বলেছি এবং বাস্তবেও তাই। আবু সুফিয়ান বলল: আপনি স্বগোত্রের প্রধানদের তো বদর যুদ্ধে তরবারি দ্বারা হত্যা করেছেন। এখন যারা জীবিত আছে, তাদের ক্ষুধা দিয়ে হত্যা করছেন। আল্লাহর কাছে দুআ করুন যাতে এই আযাব আমাদের উপর থেকে সরে যায়। রাহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ দুআ করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ আযাব খতম হয়ে গেলো। এ পরিপ্রেক্ষিতেই সুরা মু'মিনুনের ৭৫ নং আয়াত নাযিল হয়। (মা’আরিফ)

একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীর মাধ্যমে যেন পুরো মানবজাতিকে একথা শেখালেন যে, আমার কাছে এই দুআ করো- “হে আমার পালনকর্তা! ক্ষমা করুন ও রহম করুন। রহমকারীদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠ রহমকারী।” (১০১-১১৮)

সুরা নূর মদীনায় অবতীর্ণ সুরা। এতে ৬৪ টি আয়াত ও ৯ টি রুকু রয়েছে। এই সুরাকে নূর নামকরণ করা হয়েছে মূলত দুটি কারণে-

এক. যেহেতু এই সুরার মধ্যে নূর শব্দটি এসেছে, তাই।
দুই. এই সুরার মধ্যে এমন সব ফযীলত, বিধিবিধান ও মূলনীতিগুলো আলোচিত হয়েছে যে, মানুষের সামষ্টিক জীবনের পথচলাকে নূরান্বিত ও আলোকিত করে দিয়েছে।

১০. এই সুরায় চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পর্কিত বিষয় আলোচিত হয়েছে। এজন্য এক হাদীসে এসেছে, তোমরা তোমাদের পুরুষদের সুরা মায়েদাহ এবং নারীদের সুরা নূর শিক্ষা দাও।

পারিবারিক এবং দাম্পত্য জীবনের সংশোধন সম্পর্কিত বিধিবিধানের আলোচনা:

ব্যভিচারের শাস্তি এবং ব্যভিচারীদের হুকুম বিবৃত হয়েছে। ব্যভিচারী উভয়ে যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত। আর বিবাহিত হলে পাথর মেরে হত্যা করা, যা কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত রহিত একটি আয়াত ও মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। এরপর একটি মূলনীতি বলা হয়েছে যে, দুশ্চরিত্র লোকের সাথে যৌথজীবন যাপনে তারাই আগ্রহী হবে, যারা নিজেরাও মন্দ ও কলুষিত চরিত্রের অধিকারি।

মিথ্যা অপবাদ প্রদানের বিধান আলোচিত হয়েছে যে, কেউ যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিসম্পন্ন, সচ্চরিত্র পুরুষ কিংবা নারীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে, তার শাস্তি ৮০ টি বেত্রাঘাত।

লে’আনের বিধান। এই বিধানটি স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে খাস। যদি স্বামী স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে, কিন্তু তার কাছে চার সাক্ষী না থাকে, তাহলে উভয়ে একে অপরের উপর লা'নত বর্ষণ করবে। তারপর তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ করে দেয়া হবে।

এরপর ইফকের ঘটনা বিবৃত হয়েছে। এর আলোকে গুরুত্বপূর্ণ বিধান আলোচিত হয়েছে। ইফক অর্থ হচ্ছে, মিথ্যাচার এবং অপবাদ আরোপ। এই বিধান তখন নাযিল হয়েছিল, যখন উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা রা,এর উপর মুনাফিকদের কেউ কেউ অপবাদ আরোপ করেছিল। এটি বিরাট বড় অপবাদ ছিলো যা মহান ব্যক্তিত্ব রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র আহলিয়া মুহতারামা এবং উম্মতের রূহানি মায়ের উপর আরোপ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এই ঘটনাকে ভিত্তি করে দশটি আয়াত নাযিল করলেন। এবং এই মুনাফিকদের নিন্দা করলেন। মুসলমানদেরকেও সতর্ক করা হলো যে, ভবিষ্যতে এমন কোনো অপবাদমূলক বিষয়ে যেন নিজেদের না জড়ায়। এবং রাসূলে আকরামের অন্দরমহলের পবিত্রতার ঘোষণা করা হলো। মানবেতিহাসের এই প্রথম এবং একমাত্র ঘটনা যে, কারো চারিত্রিক পবিত্রতার ঘোষণা ওহীর মাধ্যমে করা হলো। (১১-২০)

ঘরে প্রবেশের অনুমতি ও তার আদাব সম্পর্কিত বিধানের কথা বলা হচ্ছে যে, কারো ঘরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করো না। মুস্তাহাব হলো, অনুমতি নেওয়ার পূর্বে সালাম করা। (২৭)

এরপর ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার নারীদের এই হুকুম দেওয়া হচ্ছে যে, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে। নিজের সম্ভ্রমের হেফাজত করে। নারীদেরকে তাদের স্বামী, পিতা, শশুর, আপন পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, বাঁদি, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, এসব মানুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। তাদের ব্যতিত কারো কাছে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয় নি। (৩১)

দাম্পত্য জীবনের অধিকার আদায়ে সক্ষম এমন স্বাধীন পুরুষ, নারী কিংবা গোলাম, তাদের বিবাহ করিয়ে দাও। মোটকথা শরীয়ত ব্যভিচারের পথ রুদ্ধ করতে বিবাহকে সহজ করা উৎসাহ দেয় সবসময়। শুধু তাই না, আল্লাহর অনুগ্রহে বিবাহের মাধ্যমে অসচ্ছলতা সচ্ছলতায় রূপান্তরিত হওয়ার সুসংবাদও এসেছে এই আয়াতে। (৩২)

ইসলাম পূর্ব যুগ থেকেই যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসী বানানোর নিয়ম ছিলো। এই অসহায়দের উপর যুলুম-নির্যাতনের কোনো সীমা ছিলো না। ইসলাম এই প্রথার আমূল পরিবর্তন আনল। যুলুম-নির্যাতনের পথ চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দিলো। অন্য স্বাধীন মানুষের মতো তাদের অধিকার নিশ্চিত করল। তাদের স্বাধীন করে দেয়া আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ ঘোষণা করা হলো। বিভিন্ন গোনাহের কাফফারায় তাদেরকে আযাদ করে দেয়ার হুকুম করা হলো।

জাহেলিয়তের যুগের একটি অকাট্য হারাম উপার্জনের প্রত্যাখ্যানের তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব যুগে কোনো কোনো লোভী ও যালিম লোক বাঁদিদেরকে অর্থের বিনিময়ে যিনায় লিপ্ত হতে বাধ্য করত। এই পদ্ধতিকে তারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আবদুল ইবনে উবাই মুনাফিক যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত সেখানকার মুকুটহীন সম্রাট ছিলো। সেও এই হারাম পেশায় জড়িত ছিলো। ইসলাম এটাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিলো।

আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যায় নারীদের অপহরণ করে নিয়ে তাদেরকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। নামীদামি হোটেলে কলগার্ল পদ্ধতি জাহিলিয়াতের যুগের সেই পেশারই আধুনিক রূপ। আল্লাহ এই উম্মতের সকল মা-বোনদেরকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

এই দশটি আহকাম ও আদাব বর্ণনার পর ঈমান, আকিদা ও আল্লাহর নূরের আলোচনা এসেছে। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মাখলুকাতকে হেদায়াত দান করেন। এখানে তিনটি দৃষ্টান্ত প্রদান করা হয়েছে। প্রথমটি মুমিনদের জন্য। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়টি বাতিল ফিরকার জন্য।

প্রথম দৃষ্টান্তে মুমিনের অন্তরে যে নূর থাকে, তাকে প্রদীপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রদীপটি এক কাঁচপাত্রে স্থাপিত। কাঁচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ্য। এই প্রদীপে যে তেল ব্যবহৃত হয়, তা যায়তুন বৃক্ষ থেকে উৎসারিত। এই তেল এত পাওয়ারফুল যে, আগুন প্রজ্জ্বলিত না করলেও যেন আলোকিত হয়ে ওঠে। এটাই মুমিনের অন্তরের অবস্থা যে, ইলম অর্জনের পূর্বেই হেদায়াতের উপর আমল করে। পরে যখন ইলম অর্জিত হয়ে যায়, তখন যেন নূরের উপর নূর, ডাবল নূর। (৩৫)

মুমিনের নুর: ইবনে জারীর হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা, থেকে এর তাফসির প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন: এটা সেই মুমিনের দৃষ্টান্ত, যার অন্তরে আল্লাহ তাআলা ঈমান ও কুরআনের নুরে-হেদায়াত রেখেছেন।

যায়তুন তেল সম্পর্কে হাদিসে এসেছে যে, যায়তুন তেল খাও এবং শরীরে মালিশ কর। কেননা এটা কল্যাণময় বৃক্ষ।

কাফির ও বাতিলদের জন্য দুটি দৃষ্টান্তের প্রথমটি হচ্ছে, তাদের আমল সম্পর্কে। তারা তাদের আমলকে উত্তম মনে করে, ইরশাদ হচ্ছে যে, তাদের মরীচিকার মতো। দূর থেকে যেমন পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে মরীচিকার দিকে অগ্রসর হয়। যখন কাছে আসে, তখন দেখে এখানে তো কিছুই নেই। ঠিক তদ্রূপ কাফিররাও তাদের আমলকে উপকারী মনে করে, কিন্তু যখন মৃত্যু আসে, তখন বুঝতে পারে এসব তো কিছুই না। ধুলো হয়ে উড়ে গেছে। ফলাফল: একেবারে শূন্যহাত।

কাফিরদের জন্য দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত- তাদের আকিদাকে সমুদ্রের গভীর অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অন্ধকারের উপর অন্ধকার, যে অন্ধকারে মানুষ নিজের হাতটি পর্যন্ত দেখতে পারে না। এটাই হলো কাফিরদের অবস্থা, তারা গোমরাহীর অন্ধকারে চরমভাবে নিমজ্জিত।

এরপর আসমান-যমীনের সৃষ্টি, রাত-দিনের পরিবর্তন, বৃষ্টি বর্ষণ, পাখিদের উড়াউড়ি, নানা প্রজাতির চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টির মাঝেও আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদের দিকে মনেযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে।

মুনাফিক এবং মুমিন এই দুই দলের বৈপরীত্যের আলোচনা করা হয়েছে। মুনাফিকরা তো ঈমানের দাবি করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে যখন এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মানতে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তখন মুখ ফিরিয়ে নেয়। অথচ মুমিন সর্বাবস্থায় আনুগত্যের দিকেই ধাবিত থাকে। সত্যিকার মুমিনদেরকে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে খিলাফত দান করবেন। আল্লাহ তাআলা সেই ওয়াদা পূরণ করে দেখিয়েছেনও। দেশের পর দেশ, সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য পদানত হয়েছে। রোম এবং পারস্যের মতো পরাশক্তি খানখান হয়ে গেছে। হায় মুসলিম জাতি! কোথায় আজ সেই সৌর্যবীর্য?

পারিবারিক জীবনের তিনটি বিধান আলোচিত হয়েছে

প্রথম হুকুম হচ্ছে, ছোট বাচ্চা এবং ঘরে অবস্থানকারী গোলাম-বাঁদির ব্যাপারে যে, তারা ফজরের পূর্বে, দুপুরের বিশ্রামের সময় এবং এশার পরে যখন তোমরা একান্ত কক্ষে চলে যাও, তখন তারা যেন তোমাদের কক্ষে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে। কারণ এই তিনটি সময় সাধারণত ঘুমানোর পোশাক পরা থাকে।

দ্বিতীয় হুকুম হচ্ছে, যখন সন্তান বালেগ হয়ে যাবে, তখন অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মতো তারাও যেন অনুমতি নিয়ে বা যে কোনোভাবে জানিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। যেমন কাশি দিয়ে বা পা দ্বারা আওয়াজ করে।

তৃতীয় হুকুম হচ্ছে, একেবারে বয়োবৃদ্ধ মহিলা যারা বিবাহের বয়স চলে গিয়েছে, তাদের পর্দার বিষয়টি শিথিল হয়ে গেছে। তারা পুরোপুরি পর্দা না করলেও সমস্যা নেই।

যখন ঘরে প্রবেশ করো, ঘরবাসীদের সালাম দাও।
আর সম্মিলিতভাবে যখন কোনো পরামর্শ বৈঠকে বসো, তখন অনুমতি ছাড়া সেখান থেকে প্রস্থান করো না।
একে অপরকে যেরকম ডাকাডাকি করো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সেভাবে ডেকো না।

জগতজুড়ে আল্লাহ তাআলার কুদরত ও ইলমের আলোচনার মাধ্যমে সুরা নূর শেষ হলো।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১৪তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও