১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

মুফতী জিয়াউর রহমান ৩:১৭ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৯

১৩তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

আজ ১৩তম তারাবীহ। আজকের তারাবীহতে সূরা কাহফের ৭৫ নম্বর আয়াত থেকে ১১০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত এবং সঙ্গে সূরা মারইয়াম ও সূরা ত্বহা তিলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে আজ ১৬তম পারা পড়া হবে। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবিতে পঠিতব্য অংশের মৌলিক আলোচনা পয়েন্ট আকারে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো

১. ১৬ নং পারার শুরুতে মুসা আলাইহিস সালাম ও খিযির আলাইহিস সালামের কাহিনি আলোচনা হয়েছে। এরপর যুল-কারনাইনের কাহিনি আলোচনা করা হয়েছে। যুল-কারনাইন সম্পর্কে তাফসিরবিদগণের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে যে, তিনি আসলে কে? যাক, তিনি একজন বিশাল ক্ষমতাধর বাদশাহ ছিলেন। বড় আল্লাহওয়ালা ছিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তিনি মানুষের খেদমত, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বাদশাহ যুল-কারনাইনকে বাস্তব ও বাহ্যিক শক্তিও দিয়েছিলেন, রূহানি এবং ঈমানি শক্তিও দিয়েছিলেন।

২. যুল-কারনাইন দিগ্বিজয়ী বাদশাহ ছিলেন। পূর্ব থেকে পশ্চিম, একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। চতুর্দিকে বিজয়ের প্রাক্কালে এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা পাহাড়ের মধ্যখানে বসবাস করতো। এবং সবসময় তারা এক হিংস্র জাতির আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। কুরআনে কারীমে সেই হিংস্র জাতির কথা ইয়াজুজ-মা'জুজ নামে আলোচনা করা হয়েছে। এই নির্যাতিত কওমের লোকদের আবেদনের ভিত্তিতে যুল-কারনাইন তাদের জন্য এমন এক শক্তিশালী দেওয়াল নির্মাণ করালেন, যার কারণে ইয়াজুজ-মাজুজের আক্রমণ থেকে তারা স্থায়ীভায় বেঁচে গেলো।

৩. বাদশাহ যুল-কারনাইনের বিশাল শক্তি-সামর্থ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর উপর ছিলো পরিপূর্ণ ঈমান। আর বস্তুবাদি বাদশাহরা কেবল বাহ্যিক শক্তি ও পশ্চিমা সভ্যতার বাহক হওয়ার কারণে তাদের কাছ থেকে পশ্চিমাদের প্রতিনিধিত্বের কাজও আঞ্জাম হয়ে যায়। ঈমান এবং বস্তুবাদের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময় খুব ঘনিয়ে এসেছে। তারাই তো সৌভাগ্যবান, যারা দাজ্জালের আবির্ভাবের পর নিজেদের ঈমান বাঁচিয়ে রাখতে কামিয়াব হবে। সুরা কাহফের শেষের দিকে যেন সেই বার্তাই দেয়া হচ্ছে।

৪. সুরা মারইয়াম মক্কায় অবতীর্ণ সুরা। এতে ৯৮ টি আয়াত এবং ৬ টি রুকু রয়েছে। এই সুরায় আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আম্বিয়ায়ে কেরামের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। প্রথমেই হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কাহিনি বিবৃত হয়েছে। তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গিয়েছিলেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। চুলও সাদা হয়ে গিয়েছিল। বয়স ১২০ বছর হয়ে গিয়েছিল। স্ত্রীও বৃদ্ধ এবং বন্ধ্যা ছিলেন। বয়স ৯৮ বছর হয়ে গিয়েছিল। বাহ্যত সন্তান লাভের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তবুও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে সন্তান লাভের দুআ করে যাচ্ছিলেন। দ্বীনি উদ্দেশেই যে সন্তান চাচ্ছেন, সে কথাও দুআয় ব্যক্ত করছিলেন। আল্লাহ তাআলা দুআ কবুল করলেন। ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা দান করলেন। যিনি অত্যন্ত নেককার, ইবাদতগুজার এবং দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। নবুওয়াত লাভের সৌভাগ্যও অর্জিত হয়েছিল।

৫. হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম বড় বিস্ময়করভাবে হয়েছিল। পিতা ছাড়া হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয়েছিল। জিবরীল আলাইহিস সালামের এক ফুৎকারে সন্তান গর্ভে চলে এলো। কিন্তু ইহুদিরা স্বাভাবিকভাবে বিষয়টি নিতে পারল না। তারা মারইয়াম আলাইহাস সালামের উপর অপবাদ আরোপ করতে লাগল। মারইয়াম কোলের সন্তান ঈসার প্রতি ইশারা করলেন, এমনিতেই নবজাতক শিশুর যবান খুলে গেলো। তিনি যে আল্লাহর বান্দা, তাঁকে কিতাব দেয়া হবে, তিনি নবী হবেন, নামায এবং যাকাতের হুকুম; এই কথাগুলো অনর্গল বলে গেলেন। এভাবে মায়ের সতীত্বের সাক্ষী দিলেন আবার নিজের বিষয়টিও জানিয়ে রাখলেন।

৬. এবার হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাহিনি। মুশরিক বাবার সাথে ঘটেছিল সেই কাহিনি। শিরকি আকিদার মধ্যে মিথ্যা, অহংকার, আত্মগরিমা, মূর্খতা, বিদ্বেষ, গোমরাহী এবং নির্বুদ্ধিতা যথেষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়। এমনিতেই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের চারিত্রিক গুণাগুণ বিশেষত তাঁর ধৈর্যশীলতা, প্রজ্ঞা ও দরদ প্রকাশ করাও উদ্দেশ্য, যাতে একজন হকের দাঈর সামনে সত্যিকার দাঈর দৃষ্টান্ত সামনে চলে আসে। দৃঢ়পদ থেকে দাওয়াত প্রদানের কারণে অনেক বরকত এবং রহমত প্রাপ্তি অনায়াসে হয়ে যায়, যেমনটা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উত্তরসূরিদের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে। বিশেষত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বংশ থেকে আসার বিষয়টি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

৭. যখন ধারাবাহিক দাওয়াত প্রদানের পরও বাবা সঠিক পথে এলেন, না কওমের লোকেরা, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে ইরাক থেকে সিরিয়ায় হিজরত করলেন। আল্লাহ তাআলা ইসমাইল, ইসহাক ও ইয়াকুব আলাইহিমুস সালামের মতো সন্তানগণ দান করলেন।

৮. এরপর হযরত মুসা, হারুন, ইসমাইল এবং ইদরিস আলাইহিমুস সালামের আলোচনা করা হলো। বলা হলো, এই নবীগণ পরবর্তী এমন কিছু মানুষ রয়ে গেলো, যারা নামাযের যত্ন নেয় নি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে বিপথগামী হয়েছে। এরপর মুশরিকদের পরকাল অস্বীকারের আলোচনা এসেছে।

৯. সুরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলা বললেন, মুমিনদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন। আর অপরাধীদেরকে অতীতের অপরাধীদের মতো ধ্বংস করে দেবো। যারা প্রবৃত্তির চাহিদাকে নির্মুল করে দেবে, আল্লাহ তাআলা সেই মুমিনদের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন। যেমনটা আল্লাহ তাআলা জিবরীল আমীনের মাধ্যমে মানুষের ভেতর ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।

১০. সুরা ত্বাহা মক্কায় অবতীর্ণ সুরা। এতে ১৩৫ টি আয়াত এবং ৮ টি রুকু রয়েছে। ত্বাহা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামসমূহের মধ্যে এক নাম। এই নামেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, আপনাকে কষ্ট দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করি নি। মূল কথা হচ্ছে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কুরআন তিলাওয়াত এবং দাওয়াত উভয় কাজেই সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতেন। তাহাজ্জুদে দীর্ঘ কিরআতে নামায আদায় করতে করতে পা ফুলে যেতো। মানুষরা হেদায়াত লাভ করুক, কুরআনের দাওয়াত কবুল, সেই চেষ্টা এবং চিন্তায় সারাক্ষণ কাটাতেন। এজন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে সান্ত্বনা দিলেন। যাতে অন্তরে প্রশান্তি আসে।

১১. কুরআনে কারীমে অন্যান্য নবীগণের তুলনায় মুসা আলাইহিস সালামের আলোচনা সবিস্তার এবং বারবার এসেছে। বারবার মুসা আলাইহিস সালামের আলোচনা আসার মধ্যে সম্ভবত এই হেকমত লুকিয়ে আছে যে, এই উম্মতকে এই বলে সতর্ক করা যে, প্রত্যেক যুগেই কোনো না কোনো ফেরাউনি চরিত্রের লোক আসবে, এর মোকাবেলায় ঈমানদারদের মুসার চরিত্রে প্রস্তুত থাকতে হবে।

১২. সুরা ত্বাহা'র ৯ নং আয়াত থেকে ৯৮ নং আয়াত পর্যন্ত এক এক করে মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনি আলোচনা হয়েছে। তবে ধারাবাহিকভাবে নয়, আগ-পিছ হয়েছে। যেমন প্রথমে নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রেক্ষাপট আলোচনার পর জন্মের পর সন্ধুকে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার আলোচনা হয়েছে।

১৩. কুরআনে কারীমের বর্ণনারীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, একই ঘটনাকে বর্ণনাভঙ্গি পরিবর্তন করে কয়েকবার আলোচনা করা হয়, যাতে পাঠকের মাঝে বিরক্তিভাব না আসে। এবং ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা তালাশ না করে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়।

১৪. সুরা ত্বাহায় মুসা আলাইহিস সালামের যে বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সাথে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন, নদীতে ভাসিয়ে দেয়া, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁকে এবং ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে উত্তম উপদেশ নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার হুকুম। মোকাবেলার জন্য যাদুকরদের একত্রকরণ এবং মুসা আলাইহিস সালামের বিজয় লাভ। যাদুকরদের ঈমান নিয়ে আসা। রাতে বনী ইসরাইলের আল্লাহর নবীর নেতৃত্বে মিসর থেকে বের হওয়া, ফেরাউন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া এবং পানিতে ডুবে সলিল সমাধি হয়ে যাওয়া। হতভাগা বনী ইসরাইলের দয়াময় আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা, সামেরির বাছুর বানানো এবং তার পূজা শুরু করে দেয়া। তাওরাত নিয়ে মুসা আলাইহিস সালামের ফেরা এবং ফেরার পর ভাই হারুন আলাইহিস সালামের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ প্রভৃতি।

১৫. মুসা আলাইহিস সালামের উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত প্রদানের আলোচনা।

এক. যখন ফেরাউন সব নবজাতক শিশুকে হত্যা করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মুসা আলাইহিস সালামকে হেফাজত করলেন।

দুই. মানুষের অন্তরে মুসা আলাইহিস সালামের ভালোবাসা ঢেলে দিলেন। যে-ই দেখত, ভালোবাসতে শুরু করত।

তিন. তাঁর বেড়ে ওঠা এবং লালনপালনে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তত্বাবধান।

চার. সম্পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে দুগ্ধ পানের জন্য সোপর্দ করা।

পাঁচ. মুসা আলাইহিস সালাম এক কিবতিকে হত্যা করে ফেলা সত্ত্বেও কিসাস থেকে আল্লাহ তাআলা বাঁচিয়ে দিলেন।

ছয়. মাদায়ান থেকে ফেরার পথে নবুওয়াত প্রাপ্তি।

১৬. কুরআনে কারীমের অস্বীকার এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে কঠিন শাস্তির আলোচনা এসেছে।

১৭. ভুলের আলোচনা করলেন যে, এটি মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এরপর আদম আলাইহিস সালামের ভুলের আলোচনা এবং ইবলিসের সঙ্গে ব্যবহারের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।

১৮. যারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জীবননির্বাহ কঠিন হওয়ার আলোচনা এসেছে। এবং তাদের কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উঠানোর আলোচনা এসেছে।

১৯. সর্বশেষ আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে- বলুন প্রত্যেকেই পথপানে চেয়ে আছে, সুতরাং তোমরাও পথপানে চেয়ে থাক। অদূর ভবিষ্যতে তোমরা জানতে পারবে কে সরল পথের পথিক এবং কে সৎপথ প্রাপ্ত হয়েছে।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১২তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১১ তম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১০ম তারাবীহ: তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৭ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৫ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

৪র্থ তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
৩য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও