২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

শাইখ জিয়াউর রহমান ১:২৮ অপরাহ্ণ, মে ০৮, ২০১৯

২য় তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

দ্বিতীয় তারাবীহ আজ। আজকের তারাবীহতে দ্বিতীয় পারার শেষার্ধ তথা সূরা বাকারার ২০৪ নং আয়াত থেকে তৃতীয় পারার শেষে সূরা আলে ইমরান-এর ৯১ নং আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জন্য আজকের তারাবীহতে পঠিতব্য অংশের সারসংক্ষেপ ব্যাখ্যা ও আলোচনা তুলে ধরা হলো।

পূর্ব আলোচনার পর... (আগের আলোচনা পড়ুন এখানে)

১১. আল্লাহর রাস্তায় কী খরচ করা হলো, সেটার চাইতে কোথায় খরচ করা হলো, সেটাই আসল বিবেচ্য বিষয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলার দেওয়া জান-মালকে সঠিক খাতে ব্যবহার করা জরুরি। প্রথমেই মা-বাবা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকীন এবং মুসাফিররা হলো পর্যায়ক্রমিক খাত। (২১৫)

১২. যে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়, তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যায়। সে জাহান্নামের অধিকারি হয়ে যায়। (আর দুনিয়াতে তার শাস্তি হলো, বোঝানোর পরও যদি সে পুনরায় ইসলামে ফিরে না আসে, তাহলে তাকে শাস্তিস্বরূপ আইনিভাবে হত্যা করা হবে।) (২১৭)

১৩. মদ এবং জুয়ার মধ্যে যদিও বাহ্যিক এবং বস্তুগত উপকার দেখা যায়, কিন্তু শারীরীক, জ্ঞানগত, অর্থনৈতিক, চারিত্রিক এবং সামাজিকভাবে এর যে ক্ষতিকর দিকগুলো রয়েছে, বাহ্যিক উপকারের চাইতে তা অনেকগুণ বেশি। রাসুল ﷺ মদকে "অশ্লীলতার মূল" আখ্যায়িত করেছেন। (২১৯)

১৪. এখন বংশগত বিষয়ক মাসাইলের আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথম মাসআলা বৈবাহিক সম্পর্কের আলোচনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। প্রথম হুকুম হলো, মুশরিক পুরুষ কিংবা নারীর সঙ্গে কোনোভাবেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয হবে না। (২২১) অবশ্য আহলে কিতাব নারীকে মুসলমান পুরুষ বিবাহ করতে পারবে। কিন্তু আহলে কিতাব নারীর স্থলে মুসলমান নারীকেই বিবাহ করা উত্তম। কারণ দীনদারিতা আর সচ্চরিত্রতাই হলো মূল বিষয়। ধন-দৌলত, সৌন্দর্য, বংশ এগুলো মৌলিক বিষয় নয়। বরং এগুলো হলো, আনুষঙ্গিক বিষয়। দাম্পত্য জীবনের এই সফরে প্রয়োজন নেক, পূণ্যবতী এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে পোষণকারী সঙ্গী। যা সফরের সকল ঘাটগুলো সহজ করে দেবে। সফরের ক্লান্তিগুলো দূর করে দেবে। এ জন্য রাসুলে আকরাম ﷺ পূণ্যবতী স্ত্রীকে মূল্যবান সম্পদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (তিরমিযি)

১৫. ঋতুস্রাব চলাকালীন অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা জায়েয নয়। কেননা ঋতুস্রাবের নাপাকিতে জীবানু লুকায়িত থাকে। যার কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে যাবে। অবশ্য অন্যান্য পারিপার্শ্বিক মেলামেশা, একসঙ্গে থাকা ও খাওয়া-দাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। অথচ ইহুদিরা এসবেরও অনুমতি দিত না। আর খ্রিস্টানরা ঋতুস্রাব অবস্থায় সহবাস করাকেও বৈধ মনে করত। এদিকে ইসলাম অন্যান্য বিষয়ের মতো ঋতুস্রাবকালীন নারীদের বেলায় অতিরিক্ত কঠোরতা কিংবা অতিরিক্ত শিথিলতার স্থলে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। (২২২-২২৩)

১৬. কোনো ব্যক্তি যদি কসম করে বলে, চারমাস পর্যন্ত তার স্ত্রীর কাছে যাবে না। তাহলে চারমাস চলে যাওয়ার পর এমনিতেই স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়ে যাবে। অবশ্য রুজু করে নিলে বিবাহ বহাল থেকে যাবে। তবে কসমের কাফফারা দিতে হবে। (২২৬-২২৭)

১৭. আল্লাহ তাআলার কাছে তালাক ঘৃণিত বিষয় হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ অবস্থায় একান্ত বাধ্য হলে তালাক প্রদানের অনুমতি রয়েছে। কেননা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে কেউ এমন অসচ্চরিত্রতা, দুরাচারিতা, অসংলগ্নতাসহ নানাবিধ কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অমিলের কারণে ঘর জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। যেখানে শান্তির লেশমাত্র থাকেন, সেখানে তালাক ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ থাকে না। জাহিলিয়াতের যামানায় তালাকের কোনো সংখ্যা নির্ধারিত ছিলো না। শত শত তালাক পর্যন্ত তারা তাদের স্ত্রীদের দিত। ইসলাম এসে তিনের অধিক তালাক নিষিদ্ধ করে দিলো। দুই তালাক পর্যন্ত রুজু করার সুযোগ থাকলেও তিন তালাক দিয়ে দিলে বিবাহ টিকিয়ে রাখার আর কোনো সুযোগ থাকে না। (২২৯)

১৮. স্বামী স্ত্রীকে মোহরানা বাবদ যা কিছু দিবে, সেগুলো ফেরত নেওয়ার কোনো অধিকার স্বামীর নেই। অবশ্য অর্থের বিনিময়ে খোলা করার অনুমতি রয়েছে, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে সম্পন্ন হবে। (২৩০)

১৯. যদি তালাকপ্রাপ্তা নারীর অপর কোনো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়, আর ওই স্বামীর সঙ্গে কোনো কারণে বনিবনা না হওয়ার ভিত্তিতে তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে প্রথম স্বামী আবার বিয়ে করতে পারবে। এটাকে হালালা বলা হয়। আজকাল হালালার নামে যে নাটক মঞ্চায়িত, তা সম্পূর্ণ হারাম এবং আল্লাহ তাআলার লানতপ্রাপ্তির কারণ। (২৩০)

২০. তালাকের পর কেবল স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য রুজু করা জায়েয নয়। (২৩১)

২১. যেহেতু ইসলাম ন্যায়-ইনসাফপূর্ণ দীন, কারো উপর যুলুম করা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। চাই শিশু হোক বা বড়, নারী হোক বা পুরুষ। এ জন্যই ইসলাম দুধ পানকারী শিশুর হকের আলোচনাও করেছে। আজ সারা দুনিয়ায় এটা প্রচার করা হচ্ছে যে, মায়ের দুধ সমকক্ষ কিংবা বিকল্প নেই। কিন্তু ইসলাম সেই সময় মায়েদেরকে তাদের সন্তানদের দুধ পান করানোর হুকুম দিয়েছে, যখন সারা দুনিয়া জাহালাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এবং মায়ের দুধের উপকারিতা কারো জানা ছিলো না। যদি কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তবুও দুধ পানকারি বাচ্চার লালনপালন এবং তাকে দুধ পান করানোর সর্বাধিক হকদার তার মা’রই। তালাক এবং বিচ্ছেদের শাস্তি তো অবুঝ শিশু পেতে পারে না। এটা জায়েয না। (২৩৩)

২২. তালাক কিংবা স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে স্ত্রীর উপর ইদ্দত পান ওয়াজিব। তালাকের ইদ্দত তিন হায়েয। স্বামীর মৃত্যু-পরবর্তি ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন। (২২৮-২৩৪)

২৩. যে নারী ইদ্দত পালনরত অবস্থায় থাকবে, ওই সময় বিবাহের প্রস্তাব কিংবা কথাবার্তা বলা নিষেধ। অবশ্য ভেতরে ভেতরে কারো ব্যাপারে আগ্রহ থাকা কিংবা ইশারা-ইঙ্গিতে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করার অনুমতি আছে। (২৩৫)

২৪. পারিবারিক এবং সামাজিক সংশোধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্য হক এবং হকের সাহায্যকারীরা টিকে থাকতে হবে। জিহাদের উদ্দেশ্যই হলো, হক এবং হকের ঝাণ্ডাবাহীদের টিকিয়ে রাখা। এ জন্য কুরআনে কারিমে জিহাদের উপর খুবই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মৃত্যুভয়ে জিহাদ থেকে পালিয়ে যাওয়া লোকদের শক্ত নিন্দা করা হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গে আগেকার উম্মতের কাহিনিও বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় পারার শেষের দিকে এসে দুটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

প্রথম ঘটনা ওই সম্প্রদায়ের, যারা মহামারিতে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পলায়ন করেছিল। কিন্তু এই পলায়ন তাদেরকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে পারে নি। এখান থেকে শিক্ষা হলো, কোনো তদবির বা ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনাই মানুষকে তাদরিরের ফয়সালা থেকে বাঁচাতে পারবে না।

দ্বিতীয় ঘটনা বনি ইসরাইল এবং হযরত তালুতের। যার নেতৃত্বে সৈন্য ও বস্তুগত ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা সত্ত্বেও তাদের থেকে কয়েকগুণ বড় সৈন্যবাহিনীকে তারা পরাস্ত করেছেন। এই ঘটনা সম্পর্কে শুধু বনি ইসরাইলের বিশেষ ব্যক্তিরাই অবগত ছিলো, জনসাধারণ এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলো। নবি কারিম ﷺ এর উম্মি হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসের এই বিস্মৃত এবং বিস্ময়কর ঘটনা বলে দেয়াই প্রমাণ করে যে, তাঁর সম্পর্ক ওই সত্তার সঙ্গে, যাঁর কাছে ইতিহাসের সামান্যতম অংশ অস্পষ্ট নয়। তিনি যে সত্য রাসুল, এটাও তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। তাই তো আল্লাহ তাআলা এই আয়াত দ্বারা ঘটনার ইতি টানলেন-

تِلْكَ آيَاتُ اللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ.

অর্থ: এগুলো হলো আল্লাহর নিদর্শন, যা আমরা তোমাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে থাকি। আর আপনি নিশ্চিতই আমার রাসুলগণের অন্তর্ভুক্ত। (২৫২)

৩নং পারা

সুরা বাকারা শরীয়তের বিধিবিধানের পাশাপাশি নবুওয়াত ও রিসালতের সাক্ষ্যও প্রদান করেছে। তৃতীয় পারার শুরুতে ওই সমস্ত বৈশিষ্টের আলোচনা এসেছে, যা কোনো কোনো আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে প্রদান করা হয়েছে। কাউকে নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে। কাউকে সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলার সৌভাগ্য প্রদান করা হয়েছে। কারো নবুওয়তের প্রমাণ সুস্পষ্ট মুজিযার মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। এ সকল নবীগণ উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ফযীলত এবং স্তর এবং মর্যাদার দিক দিয়ে একজনের সঙ্গে আরেকজনের পার্থক্য রয়েছে। কোনো নবির যেমন আরেক নবির উপর মর্যাদা রয়েছে, এক উম্মতেরও আরেক উম্মতের উপর ফযীলত এবং মর্যাদা রয়েছে। অনেক বৈশিষ্ট্য এবং ফযীলতের কারণে যেমন আমাদের প্রিয় নবি ﷺ এর অন্যান্য নবিগণের উপর মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত, ঠিক তদ্রূপ এই উম্মতেরও অন্যান্য উম্মতের উপর ফযীলত এবং মর্যাদা সুসাব্যস্ত।

সুরা বাকারায় এমন একটি আয়াত রয়েছে, যা কুরআনে কারিমের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। সেটি হচ্ছে, আয়াতুল কুরসি। ৫০ টি শব্দ এবং ১০ টি বাক্যে গঠিত এই আয়াতে ১৭ বার আল্লাহ তাআলার আলোচনা এসেছে। কোথাও সরাসরি আর কোথাও ইশারায়।

اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ.

তৃতীয় পারায় হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ওই ঘটনা যা নমরুদ বিন কেনানের মতো দুষ্টু ও অহংকারী বাদশাহর সাথে বিতর্ক হয়েছিল। এবং এই ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে, যেখানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে আবেদন করেছিলেন, তিনি মৃতকে কীভাবে জীবিত করেন, সেই দৃশ্য দেখানোর জন্য। এদিকে হযরত উযাইর আলাইহিস সালামের ধ্বংসপ্রাপ্ত এক জনপদ দেখে এই ধারণা জন্ম নিলো যে, না জানি কেমনে এই জনপদকে আবার জীবিত করা হবে! তাই তো শতবছর পর্যন্ত তাঁর উপরই মরণ দিয়ে দেয়া হলো। তারপর আবার জীবিত করা হলো।

সুরা বাকারা ঘাঁটলে দেখা যায় ৫ জায়গায় মৃতকে জীবিত করা বিষয়ক আলোচনা এসেছে।

১- ওই নিহত ব্যক্তির ঘটনা, যার শরীরে গাভীর গোশত লাগানোর পরপরই জীবিত হয়ে উঠেছিল।
২- বনি ইসরাইলের ওই অস্বীকারকারী কাফিরদের ঘটনা, যারা আল্লাহ তাআলাকে দেখতে চেয়েছিল।
৩- ওই সম্প্রদায়ের ঘটনা, যারা মহামারি থেকে বাঁচতে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল।
৪-৫- হযরত উযাইর এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘটনা।

এছাড়াও সুরা বাকারায় গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্ত বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, দীনে ইসলাম, মনুষত্ব, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, অনুগ্রহ, দয়া। মোটকথা মানুষের সফলতা অর্জনের এমন কোনো দিক নেই, যার প্রতি কুরআন দাওয়াত দেয় নাই, আহ্বান করে নাই। নেকির এমন কোনো কাজ নেই, যার প্রতি ইসলাম উৎসাহ দেয় নাই।

প্রথমত আল্লাহর রাহে দানকারীদের ইখলাসের উপর ভিত্তি করে যে সওয়াব অর্জিত হয়, তার দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন ওই কৃষকের রোপিত বীজের সঙ্গে, যার একটি চারা উৎপন্ন হয়ে সাতটি ছড়া বেড়ে ওঠে। একেকটি ছড়ায় শতশত শস্য উৎপাদন হয়। ঠিক তদ্রূপ আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে আল্লাহর রাস্তায় খরচকারী ব্যক্তির সওয়াব শতশত, হাজারো, লক্ষ লক্ষ হয়ে যায়। (২৬১)

লোকদেখানো দান এমন, যেন বিরান ভূমি। একটুখানি বৃষ্টি হলেই যেমন ধুয়েমুছে সব নিয়ে যায়, ঠিক তদ্রূপ লোকদেখানো দানে দানকারীর কোনো উপকার হয় না। (২৬৪)

সুরা বাকারায় গুরুত্বপূর্ণ একটি শরয়ী মাসআলা বর্ণিত হয়েছে। সুদ হারাম হওয়া বিষয়ক মাসআলা। সুদখোরকে জিন এবং শয়তানের আসরে পাগলপ্রায় লোকের সঙ্গে দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। দুনিয়াতেও সুদখোর পাগলের মতো থাকবে, কিয়ামতের দিনও কবর থেকে পাগলের মতো হয়ে উঠবে। এরপর সুদের এমন ভয়াবহ একটি শাস্তির ভয় দেখালেন, এমন ভয় অন্য কোনো গোনাহের বেলায় দেখানো হয় নি। বলা হয়েছে, তোমরা যদি সুদ পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। (২৭৮-২৭৯)

এরপর ব্যবসাবাণিজ্য, পরস্পর লেনদেন ও বন্ধকের হুকুম বর্ণিত হয়েছে এমন একটি আয়াতে, যা কুরআনে কারিমের মধ্যে সবচে দীর্ঘ আয়াত। এতে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন অর্থনৈতিক লেনদেনকে কত গুরুত্ব দেয়।

এই আয়াতে বর্ণিত কতিপয় বিধান:
১, বাকিতে যত লেনদেন হবে, সবকিছু কাগজে লিপিবদ্ধ করে নেওয়া উচিত।
২, যখন বাকিতে লেনদেন করা হবে, তখন তার মেয়াদ অবশ্যই ঠিক করে নিতে হবে। আর সেটা সুস্পষ্ট থাকতে হবে।
৩, সফরের অবস্থায় যদি লিপিবদ্ধ করার কিছু পাওয়া না যায়, তাহলে কোনোকিছু বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যায়।
৪, নগদ লেনদেনে লেখা আবশ্যক নয়।

যেহেতু সুরা বাকারায় নামায, যাকাত, হজ্ব, রোযা, জিহাদ, সাদাকা, সুদ, তালাক, ইদ্দতসহ অনেক শরয়ী বিধান বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সুরার শেষের দিকে এটা পরিষ্কার করে দেয়া হলো যে-

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.

অর্থ: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না। (২৮৬)

সুরা আলে ইমরান। মদিনায় অবতীর্ণ সুরা। এতে ২০ রুকু এবং ২০০ আয়াত রয়েছে। যেহেতু এই সুরায় হযরত ইমরান আলাইহিস সালামের পরিবারের ঘটনা আলোচিত হয়েছে, এ জন্য এই সুরার নাম আলে ইমরান নামকরণ করা হয়েছে। এই সুরার ফযীলত সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে আবু উমামা রা, থেকে বর্ণিত রেওয়ায়াত। তিনি বলেন, আমি রাসুল ﷺকে বলতে শুনেছি যে, দুটি আলোকিত সুরা অর্থাৎ সুরা বাকারা এবং সুরা আলে ইমরান তোমরা তিলাওয়াত করো।

এই সুরার প্রায় ৮০ টি আয়াত এই সময় নাযিল হয়েছিল, যখন নাজরানের খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে ৬০ জন খ্রিস্টানের এক প্রতিনিধিদল রাসুল ﷺ এর খেদমতে উপস্থিত হয়েছিল। এই প্রতিনিধিদল ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলার পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) প্রমাণের জন্য রাসুল ﷺ এর সঙ্গে নানান বিতর্ক করেছিল। তাদের সেই ভুল বিশ্বাসের মোকাবেলায় বলা হলো যে, আল্লাহ তাআলার কালামে দুই ধরনের আয়াত রয়েছে। কিছু আয়াত তার মূল মমার্থ প্রকাশে একেবারে সুস্পষ্ট। এমন আয়াতকে ‘মুহকামাত’ বলা হয়। কুরআনে কারিমের অধিকাংশ আয়াত এই ‘মুহকামাতের’ অন্তর্ভুক্ত। আর কিছু আয়াত এমন রয়েছে, যার আসল অর্থ এবং সঠিক মর্ম আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানেন না। বা তার মর্মোদ্ধারে সংশয় সৃষ্টি হয়। এগুলোকে ‘মুতাশাবিহাত’ বলা হয়।

সুরা আলে ইমরানে ৩ টি শিক্ষণীয় এবং অভ্যাসবহির্ভূত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যা সম্পূর্ণই আল্লাহ তাআলার মহান কুদরতের নিদর্শন।

প্রথম ঘটনা:
সায়্যিদাহ মারইয়াম আলাইহাস সালামের জন্মের ঘটনা। যাঁকে খ্রিস্টানরা আল্লাহ তাআলার স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহ) এবং তাঁর সন্তানকে আল্লাহ তাআলার সন্তান (নাউযুবিল্লাহ) আখ্যায়িত করেছে। এ কারণেই তারা নিকৃষ্টতর গোমরাহীর শিকার হয়েছে। হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালামের পিতা হযরত ইমরান আল্লাহ তাআলার নেক বান্দা ছিলেন। তাঁর মা ‘হান্নাহ বিনতে ফাকুয’ সচ্চরিত্রা এবং সতিসাধ্বি নারি ছিলেন। দীর্ঘকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্তান হয় নি। একদিন এক পাখিকে দেখলেন তার বাচ্চাকে খাবার খাওয়াচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তাঁর ভেতর সন্তান পাওয়ার আগ্রহ তীব্র হয়ে উঠল। আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করে দুআ করলেন। এবং মান্নত মানলেন যে, আল্লাহ যদি তাঁকে সন্তান দেন, তাহলে তিনি তাকে বায়তুল মাকদিসের খেদমতের জন্য ওয়াকফ করে দিবেন। আল্লাহ দুআ কবুল করলেন। এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। তখন নিয়ম ছিলো বায়তুল মাকদিসের খেদমতের জন্য ছেলেদের নেয়া হতো, মেয়েদের নেয়া হতো না। এদিকে নবজাতক সন্তানের পিতা ইন্তেকাল করে নিলেন। আল্লাহ তাআলা পূর্বের নিয়মের উল্টো ইমরানের স্ত্রীর মান্নত কবুল করে নিলেন। সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামকে ওই মেয়ের ভরণপোষণ এবং লালনপালনের দায়িত্ব অর্পণ করলেন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মেয়েটির অলৌকিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলেন। আন-সিজনাল ফলমূল দেখে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, হে মারিয়াম! এসব খাবার তোমার কাছে কোথা থেকে আসে? মারিয়াম জবাবে বললেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ তাআলা যাকে চান, তাকে বেহিসাব রিযিক দেন। (৩৭)

দ্বিতীয় আশ্চর্যজনক ঘটনা:
মাসুম মেয়ে বাচ্চার ঈমানি জবাব শুনে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামেরও সন্তানের আগ্রহ তীব্র হয়ে গেলো। অথচ তিনিও শতবর্ষী তাঁর স্ত্রীও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন আবার বন্ধ্যাও। তবুও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করলেন। হে আমার পালনকর্তা! তোমার নিকট থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান কর-নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী। (৩৮)

আল্লাহ তাআলা পরাজিত হৃদয়ের দুআ কবুল করলেন। এমন সন্তানের সুসংবাদ দিলেন, যে চারটি গুণে গুণান্বিত হবে।

১, কালিমাতুল্লাহ অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালামকে সত্যায়ন করবেন এবং তাঁর উপর ঈমান আনবেন।
২, তিনি ইলম, তাকওয়া এবং ইবাদতে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন।
৩, সীমাহীন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী হবেন।
৪, নবি হবেন ও নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

তৃতীয় ঘটনা:

হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ঘটনা আরো আশ্চর্যজনক! কারণ বাবা ছাড়াই সরাসরি অলৌকিকভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্মের ব্যবস্থা করে দিলেন। ফেরেশতারা যখন সায়্যিদা মারিয়ামকে সন্তানের সুসংবাদ দিলেন, তখন তিনি অবাক হয়ে বললেন, পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে, আমাকে তো কোনো মানুষ স্পর্শ করে নি। বললেন, এভাবেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
১ম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা