রামাদানে কুরআন : পিতা-মাতার ছায়ানীড়ে

ঢাকা, ১৭ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

রামাদানে কুরআন : পিতা-মাতার ছায়ানীড়ে

মাজিদা রিফা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, মে ০৫, ২০১৯

রামাদানে কুরআন : পিতা-মাতার ছায়ানীড়ে

রামাদানের প্রস্তুতি সম্পন্ন। তিলাওয়াত হবে দৈনিক চাঁর পাঁচ ঘন্টা। তাহাজ্জুদ একদিনও মিস হবে না। যেন এক অলৌকিক মাস। যেন রহমতের সেই বৃষ্টি; যাতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে সারাবছরের সকল কালিমা। শুধু কি তাই? কতকিছু যে চাওয়ার আছে! রাব্বে কারিমের দরবার ছেড়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। যখন রামাদান এলো, পরিকল্পনা মতো সবই চলছিল। বিপত্তি ঘটালেন মা। যখন তখন এটা সেটা আদেশ। ওদিকে বাবাও; কারণে-অকারণে বকা! কোথায় একটু শান্তিতে ইবাদত করব তা না। মেজাজ কি আর ঠিক রাখা যায়?

মায়ের সাথে রাগারাগি আর বাবাকে পেঁচা মুখ দেখিয়ে আপনি এসে তেলাওয়াত করতে বসেন। আপনি পড়ছেন সূরা বনী ইসরাঈলের আয়াত :

وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلاَ تَقُل لَّهُمَآ أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا-

আপনার রব নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না, আর তাদের সাথে সুন্দরভাবে আদবের সাথে কথা বলো।

আপনি পড়ছেন; ওদিকে আপনার বাবা মন খারাপ করেন। আপনার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। রান্নাঘরের গরম হাওয়ার আড়ালে ক্লান্তিকর দীর্ঘশ্বাসের খবর আল্লাহ তাআলার কাছে কি পৌঁছবে না? আপনার তেলাওয়াতের তবে কি কোনো মূল্য থাকবে আল্লাহর কাছে?

কুরআন তো শুধু পড়ার নাম নয়। কুরআনের আসল উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণী জীবনে প্রয়োগ করার নাম। রমজান মাসে অনেককেই দেখা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলাওয়াত ঠিকই করছেন, অথচ কাজ করছেন কুরআনের উল্টো। আর পিতামাতার ব্যাপারটা তো এত স্পর্শকাতর যে, কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাওহীদের প্রতি দাওয়াতের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা নিসার আয়াতেও বলছেন,

وَاعْبُدُواْ اللّهَ وَلاَ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো।

আমরা বাবা-মার সাথে কেন দুর্ব্যবহার করি? আমরা ভালো, আমাদের সমঝ বেশি, বাবা-মা না বুঝে যা ইচ্ছা আদেশ দেন ইত্যাদি কারণে? কিন্তু আমাদের বাবা-মা কি এতই খারাপ যে আমরা তাদের সাথে তর্কবিতর্ক ও দুর্ব্যবহার করার অধিকার রাখি? দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় পাপ হলো শিরক। আল্লাহ বলছেন, যদি তারা শিরকের আদেশ দেন শিরক করো না, কিন্তু দুর্বব্যবহারও করো না।

فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا

তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। [সূরা আনকাবুত : ৮, সূরা লোকমান : ১৫]

আমাদের পিতামাতা নিশ্চয়ই এত খারাপ নয়। তবু আমরা তুচ্ছ এই দুনিয়ার অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে রাগ করে তাদের কষ্ট দেই। স্পেশালি মায়ের সাথে। কোথায় মাকে কাজে সাহায্য করব, কোথায় কৃতজ্ঞতা; তা নয়, উল্টো রান্নায় একটু বেশিকম হলেই রাগ করে খাবার ফেলে উঠে চলে যাই।

আপনি বড় হয়েছেন। বহু আগেই আপনাকে যত্নের দায়িত্ব শেষ মায়ের। কোনো কাজই মায়ের এখন করার কথা নয়, অথচ এখনো মা করছেন। তবু আপনি খুশি নয়; কত অভিযোগ! আল্লাহ তাআলা বলছেন, আপনাকে জন্ম দিয়েছেন, শুধু এজন্যই আপনাকে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে।

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ-

আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দু বছরে। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। [সূরা লোকমান :১৪]

চিন্তা করে দেখুন, একদিকে আমরা তেলাওয়াত করছি-

وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا-

ভালোবাসায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, হে পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।

আর অন্যদিকে মাকে কষ্ট দিচ্ছি, মায়ের সাথে চড়া আওয়াজে কথা বলছি, এ কি কুরআনের সাথে তামাশা নয়?

আমরা কুরআন দশবার খতম না করে পাঁচবার করব, তিনবার দুইবার একবারই করব, তবু পিতামাতাকে কষ্ট দিব না। প্রতিদিন তাদের ব্যক্তিগত কাজগুলো করে দিতে এক থেকে দুইঘন্টা সময়ও লাগবে না। আর তারা কোনো আদেশ দিলে সাওয়াব অর্জনের মেগা অফার মনে করে লুফে নিব। সাথে সাথে কুরআন তেলাওয়াত, ফেসবুকিং, বইপড়া সব বাদ দিয়ে হাসিমুখে তাদের কাজটা করে দিব।

কারণ কুরআনের আসল মাকসাদ শুধু তেলাওয়াত নয়, কুরআনের আসল উদ্দেশ্য তেলাওয়াতের সাথে সাথে আমাদের জীবনকে কুরআনি আদেশ-নিষেধ পালনে সুন্দর ও সমুজ্জ্বল করা। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দিন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
কুরআনের মৌসুমে জাগ্রত হৃদয়ে হোক তিলাওয়াত
কুরআন অধ্যয়নে কার্যকরী দুই পরামর্শ
কুরআন কেন বুঝতে হবে আমাদের?
কিভাবে আমরা সঠিকভাবে কুরআন বুঝব? (১ম পর্ব)
কিভাবে আমরা সঠিকভাবে কুরআন বুঝব? (শেষ পর্ব)
সন্দেহবাদিতার এই যুগ এবং চির সত্য কুরআন

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও