কুরআনের ৮ আয়াতে ইস্তিগফারের মহা কল্যাণ

ঢাকা, ১৭ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

কুরআনের ৮ আয়াতে ইস্তিগফারের মহা কল্যাণ

পরিবর্তন ডেস্ক ৮:২৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০১৯

কুরআনের ৮ আয়াতে ইস্তিগফারের মহা কল্যাণ

ছোট্ট একটি বাক্য “আস্তাগফিরুল্লাহ” (استغفر الله)। এর অর্থ “আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি”। কথাটি বাক্যে ছোট তবে আমাদের জীবনে এর গুরুত্ব ও প্রভাব অপরিসীম।

মুসলমানদের জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এ অর্জনের পেছনে যদি জীবনের সবটুকুও ব্যয় করতে হয় তাহলে তাই সই। লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি। কিন্তু অর্জনে সবচে বড় অন্তরায় আমাদের গুনাহ। এরজন্য আমাদের প্রয়োজন ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার।

আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ইস্তিগফারের মাধ্যমে আমরা আমাদের গুনাহগুলো থেকে ক্ষমা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং তাঁর প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়ে নিজেদেরকে জান্নাতের জন্য উপযুক্ত করে নিতে পারি। আল্লাহ আমাদেরকে সুযোগ দিয়ে রেখেছেন আমাদের গুনাহকে মোচন করিয়ে নেওয়ার।

কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ ইস্তিগফারের অনন্ত কল্যাণের কথা বলেছেন। তন্মধ্য হতে ৮ টি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হল।

এক.
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا

“তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” –সূরা নূহ, আয়াত: ১০

প্রতিদিন হয়তো আমরা বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ি। পাহাড় সমান গুনাহে আমরা নিজেদেরকে ডুবিয়ে দেই। আল্লাহ আমাদের এই পাহাড়সম গুনাহকেও মাফ করবেন, যদি আমরা আন্তরিকভাবেই ইস্তেগফার করতে পারি।

রাসূল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ দিনে হাত বাড়িয়ে দেন যাতে রাতের পাপীরা ক্ষমা চাইতে পারে এবং তিনি রাতে হাত বাড়িয়ে দেন যাতে দিনের পাপীরা ক্ষমা চাইতে পারে।” (মুসলিম)

আল্লাহর রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, “বামকাঁধের ফেরশতা গুনাহ করা একজন মুসলিম বান্দাকে ছয় ঘন্টা সময় দেয়। সেই বান্দা যদি তওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে ফেরেশতা তা লিপিবদ্ধ করেনা। এবং যদি সেই বান্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা না চায়, তবে ফেরেশতা তা একবার লিপিবদ্ধ করে।” (মুসলিম)

অতএব, গুনাহ করে ফেললে দ্রুত আল্লাহর ক্ষমার দিকে ছুটুন।

দুই.
يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
“তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন।” (সূরা নূহ, আয়াত: ১১)

কুরআন ও হাদীসে বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ যখন কোন দুআ কবুল করেন, তখন তিনি নিদর্শন হিসেবে বৃষ্টি বর্ষণ করেন।

ক্ষমাও উপকারী বৃষ্টি বর্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বৃষ্টির মাধ্যমে যেমন মৃত ভূমি জীবন্ত হয়ে উঠে, ঠিক তেমনি আল্লাহর ক্ষমার মাধ্যমে আমাদের দূষিত অন্তর পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠে।

ইস্তেগফারের মাধ্যমে আমরা আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর বিধান গ্রহণের জন্য আরো উন্মুক্ত করে নিতে পারি।

তিন.
وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন।” –সূরা নূহ, আয়াত: ১২

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করছেন, তিনি আমাদের ইস্তিগফারের মাধ্যমে আমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়ে দেবেন। জীবন পরিচালনার কঠিন নিষ্পেষণে যারা হাঁপিয়ে উঠছে, তাদের উচিত সর্বদা ইস্তেগফার করা। আজ যে দরজা বন্ধ রয়েছে, কাল সে দরজা আল্লাহ খুলে দিতে পারেন।

চার.
وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا

“...তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন।” –সূরা নূহ, আয়াত: ১২

আমরা যা চাই, আল্লাহ আমাদের শুধু তাই দেন না। আমাদের অজানা অনেক প্রয়োজনও তিনি আমাদের জন্য সরবরাহ করেন।

ইস্তিগফার পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে বা শুধু আখেরাতে বাগান ও নদী সহ বিভিন্ন বিলাসের ব্যবস্থাপনার ওয়াদা করেছেন। এই বিলাস ব্যবস্থাপনা অর্জনের জন্য আমাদের উচিত আল্লাহর সন্তোষ অর্জন করা ও বেশি বেশি ইস্তেফার পাঠ করা।

পাঁচ.
وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُواْ رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُواْ إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ
“হে আমার জাতি! তোমাদের পালন কর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি ধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন..।” –সূরা হুদ, আয়াত: ৫২

এই আয়াতেও আল্লাহ ইস্তেগফারের জন্য বৃষ্টি প্রেরণের ওয়াদা করছেন। পাশাপাশি বান্দাকে অধিক থেকেও অধিক শক্তি-সামর্থ্য প্রদানের জন্যও ওয়াদা করছেন। আমাদের যে কোনো কাজের জন্যই আমাদের শারীরিক, মানসিক, জ্ঞানগত, অর্থগত বা অন্য যেকোন প্রকার শক্তিরই প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া জাতিগত সামগ্রিক শক্তি এর মাধ্যমে অর্জিত হবে। আমাদের এই শক্তি অর্জনের জন্য আমরা আল্লাহর কাছেই আশ্রয় নিতে পারি।

গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার জন্যও আমাদের পরিশ্রম করতে হয়। ইস্তেগফারের মাধ্যমে আমরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মত সামর্থ্য অর্জন করতে পারি।

ছয়.
وَأَنِ اسْتَغْفِرُواْ رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُواْ إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ
“আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন।” (সূরা হুদ, আয়াত: ৩)

এই আয়াতে ইস্তেগফারের ফলে উন্নত জীবনোপকরণের ওয়াদা দেওয়া হচ্ছে। এখানে নির্দিষ্ট সময়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে দেখানো হচ্ছে, জীবনের কোন কিছুই স্থায়ী নয় এবং জীবনের মেয়াদও ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং, ক্ষণস্থায়ী এই জীবনকে আমাদের কাজে লাগানোর জন্য আল্লাহর কাছে সহায়তা চাওয়া জরুরী। এর জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার আমাদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।

সাত.
وَمَا كَانَ اللّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
“...তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না।” –সূরা আনফাল, আয়াত: ৩৩

মানবজীবনের একটি ভয়াবহতম বিষয় আল্লাহর আযাব। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, আমাদের উপর যত দুর্যোগ আসে, তা হয় আমাদের পাপের ফলাফল, না হয় পরীক্ষার উপকরণ। মুসলিম হিসেবে কোনটাই আমাদের কাম্য নয়। বেশি বেশি ইস্তেগফারের মাধ্যমে আমাদের জন্য এসকল বিপর্যয় থেকে মুক্ত থাকতে পারার ওয়াদা আল্লাহ এই আয়াতে করেছেন।

আট.
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
“হে আমার পালনকর্তা, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা”–সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৫

এটি নবী সুলাইমান (আ.) এর দুআ। এই দুআর সৌন্দর্য হল তিনি তার দুআর পূর্বে আল্লাহর কাছে নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন বা ইস্তেগফার পাঠ করেছেন। তারপর তিনি তার প্রার্থনা করেছেন।

আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করে এমন এক সাম্রাজ্য তাকে দান করেছেন, যার মালিকানা তার পূর্বে ও পরে কেউ লাভ করেনি, কখনো করবেও না।

এদিকে লক্ষ্য রেখে আলেমগণ নাসীহাহ করেন, আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনার শুরুতেই আমাদের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা ইস্তেগফার পাঠ করা উচিত। এই পন্থায় আশা করা যায় আল্লাহ আমাদের দুআ কবুল করে নেবেন।

এমএফ/

ট্যাগ : ইস্তিগফার, ক্ষমা প্রার্থনা, তওবা, ইস্তিগফারের ফযিলত, ইস্তিগফারের কল্যাণ, ইস্তিগফারের উপকারীতা, আল্লাহর ক্ষমা

আরও পড়ুন...
তাওবাহ মানে কী?
যে কারণে তাওবাহ করবেন
তাওবাহ: কেন করব, কিভাবে করব?
গুনাহ থেকে তওবার পরও লোকেরা বিষোদগার করছে?
তওবা ও ইস্তিগফার বান্দার মুক্তির উপায়
তাওবার সুন্নত পদ্ধতি কি?
প্রাত্যহিক জীবনে তাওবার গুরুত্ব
হতাশায় ভুগছেন? নবীজির মুখে শুনুন ফিরে আসার গল্প
আল্লাহর সাথে অভিমান?

হতাশায় ভুগছেন? নবীজির মুখে শুনুন ফিরে আসার গল্প
মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির কি তওবার সুযোগ নেই?
বারবার তওবার পরে গুনাহ হতে থাকলে করণীয়

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও