কুরআনের মৌসুমে জাগ্রত হৃদয়ে হোক তিলাওয়াত

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

কুরআনের মৌসুমে জাগ্রত হৃদয়ে হোক তিলাওয়াত

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৪:১৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০১৯

কুরআনের মৌসুমে জাগ্রত হৃদয়ে হোক তিলাওয়াত

রমযানের আগমনী বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত সম্মানিত মাস রজব। মাঝখানে আর একটি মাসের পরেই আসছে কুরআন ও ইবাদতের মৌসুম রমযান। এখন থেকেই সারাবিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে অন্যান্য ইবাদতের সঙ্গে বিশেষভাবে কুরআন কেন্দ্রিক নানা পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। যেহেতু এ মাসের মর্যাদাই হয়েছে কুরআন নাযিলের জন্য।

জেনে রাখা উচিত যে, শুধু কুরআন পড়া বা তিলাওয়াত করা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। তবু এ ইবাদতের পরিপূর্ণতা আসে যখন কুরআন বুঝে ও আল্লাহর অনুভব হৃদয়ে জাগরুক রেখে তিলাওয়াত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমি উপদেশ গ্রহণের জন্য কুরআনকে সহজ করেছি – অতএব, আছে কি কোন উপদেশ গ্রহণকারী!” –সূরা আল ক্বমার, আয়াত : ২২

তাই কীভাবে আমরা আল্লাহর অনুভব হৃদয়ে জাগরুক রেখে তিলাওয়াত করতে পারি, আমাদের তিলাওয়াত কীভাবে হয়ে উঠতে পারে প্রাণ বিশিষ্ট ও আল্লাহর সঙ্গে সত্যিকারের কথোপকথন – এর কিছু পদ্ধতি ও পরামর্শ এ নিবন্ধে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।       

কুরআনকে সাহাবাদের মত গ্রহণ করুন
নিজেকে বলুন, আমার কুরআন তিলাওয়াত সত্যিকার অর্থে তিলাওয়াত (পাঠ) হবে না, যদি না আমার অন্তরও এতে শামিল হয়। যেমনটা ঠিক প্রিয় প্রতিপালক আল্লাহ চেয়েছেন। আচ্ছা, কেমন তিলাওয়াত চেয়েছেন আল্লাহ?

কুরআনের অনেক জায়গায় স্পষ্ট করে বলা আছে যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবীগণ কিভাবে এ কিতাব গ্রহণ করেছিলেন। আপনার উচিত এই জাতীয় আয়াতগুলো মুখস্ত করার চেষ্টা করা অথবা অন্তত আয়াতগুলোতে বলা কথাগুলো মনে রাখা ও কুরআন পাঠের সময় এর প্রতিফলন ঘটানো।

এমনই কিছু আয়াত হলোঃ   

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
“যারা ইমানদার তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে কালাম পাঠ করা হয়, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি ভরসা পোষণ করে।” –সুরা আনফাল, আয়াত : ২   

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
“আল্লাহ্‌ উত্তম বাণী, তথা কুরআন নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনরায় পঠিত। এতে তাদের লোম কাটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহ্‌র স্মরণে বিনম্র হয়।” –সুরা ঝুমার, আয়াত : ২৩

قُلْ آمِنُواْ بِهِ أَوْ لاَ تُؤْمِنُواْ إِنَّ الَّذِينَ أُوتُواْ الْعِلْمَ مِن قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلأَذْقَانِ سُجَّدًا. وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولاً. وَيَخِرُّونَ لِلأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
“যখন তাদের কাছে এর তেলাওয়াত করা হয়, তখন তারা নতমস্তকে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে, আমার পালনকর্তা পবিত্র, মহান। নিঃসন্দেহে আমাদের পালনকর্তার ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তারা ক্রন্দন করতে করতে ভুমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।” –সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ১০৭-১০৯

إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَن خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
“তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহ্‌র আয়াতসমুহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়তো এবং ক্রন্দনরত থাকতো।” – সূরা মারইয়াম, আয়াত : ৫৮

وَإِذَا سَمِعُواْ مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُواْ مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
“আর তারা রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ন হয়েছে তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলেঃ হে আমদের প্রতিপালক আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।” –সূরা মায়িদা, আয়াত : ৮৩

ভাবুন যেন আল্লাহ্‌র উপস্থিতিতে পড়ছেন
নিজেকে এ কথা বলেন যে, আমি আল্লাহ্‌র সামনে আছি; তিনি আমাকে দেখছেন।

আপনাকে অবশ্যই এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে যে, যখন আপনি কুরআন পাঠ করছেন, আপনি স্বয়ং তাঁর সামনে রয়েছেন যিনি এই শব্দগুলো আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।  আল্লাহ্‌ সব সময় আপনার সাথে রয়েছেন, আপনি যেখানেই থাকেন না কেন, আর যা-ই করেন না কেন। সব কিছু সম্পর্কেই তিনি অবগত আছেন।

এই উপলব্ধি আপনি কিভাবে অর্জন করবেন 
আল্লাহ এ সম্পর্কে কুরআনে কি বলেছেন তা শুনুন। ঐ আয়াতগুলো মুখস্ত করুন এবং কুরআন পাঠের আগে ও কুরআন পাঠের সময় এগুলো মনে করে বাস্তব জীবনে এই আয়াতগুলোর প্রতিফলন ঘটান।

আরও একটি জিনিস আপনাকে সাহায্য করবে, শুধু কুরআন পাঠ করতেই না বরং কুরআন অনুযায়ী আপনার জীবন পরিচালনা করতে। তা হল এই আয়াতগুলো মনে রাখা এবং বাস্তব জীবনে যত বেশি সম্ভব এর প্রতিফলন ঘটানো।  

একা অথবা কারো সাথে, নিরবে অথবা সরবে, ঘরে অথবা বাইরে, বিশ্রাম কিংবা ব্যস্ততায়, আস্তে অথবা জোরে – বলুন, তিনি আমার সাথেই রয়েছেন, দেখছেন এবং শুনছেন, জানছেন এবং লিপিবদ্ধ করছেন। এবং আল্লাহ্‌র কুরআনের এই আয়াতগুলো স্মরণ করুন,

وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
“তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই রয়েছেন; আল্লাহ দেখছেন তোমরা যা কিছু করো।” –সূরা হাদিদ, আয়াত : ৪

وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
“আমি তাদের ঘাড়ের শিরা হতেও বেশি নিকটে।” –সূরা ক্বাফ, আয়াত : ১৬

مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَىٰ ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“তিন ব্যক্তির এমন কোন পরামর্শ হয় না যাতে তিনি চতুর্থ না থাকেন এবং পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে তিনি ষষ্ঠ না থাকেন তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক তারা যেখানেই থাকুক না কেন তিনি তাদের সাথে আছেন, তারা যা করে, তিনি কেয়ামতের দিন তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” –সূরা মুজাদালাহ, আয়াত : ৭

إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَىٰ
“আমি তোমাদের দুইজনের (মুসা ও হারুন) সাথে আছি, শুনছি এবং দেখছি।” –সূরা ত্বহা, আয়াত : ৪৬

فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ حِينَ تَقُومُ
“নিশ্চিতভাবেই আপনি (নবীজি সা.) আমার চোখের সামনেই রয়েছেন এবং আপনি আপনার পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন যখন আপনি গাত্রোত্থান করেন।” –সূরা তুর, আয়াত : ৪৮

إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ
“আমিই মৃতদেরকে জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তি সমূহ লিপিবদ্ধ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।” –সূরা ইয়াছিন, আয়াত : ১২

নিম্নোক্ত আয়াতটি আরো গুরুত্বপূর্ণ যা জোর দিয়ে কেবল এ কথাই বলে না যে আল্লাহ্‌ উপস্থিত আছেন এবং সব কিছু দেখছেন, বরং এখানে কুরআন পাঠের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُو مِنْهُ مِن قُرْآنٍ وَلاَ تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلاَّ كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ وَمَا يَعْزُبُ عَن رَّبِّكَ مِن مِّثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاء وَلاَ أَصْغَرَ مِن ذَلِكَ وَلا أَكْبَرَ إِلاَّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ
“বস্তুতঃ যে কোন অবস্থাতেই তুমি থাকো এবং কুরআনের যে কোন অংশ থেকেই তুমি পাঠ করো কিংবা যে কোন কাজই তোমরা করো অথচ আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ করো। আর তোমার পরওয়ারদেগার থেকে গোপন থাকে না একটি কনাও, না যমীনের, না আসমানের। না এর চেয়ে ক্ষুদ্র কোন কিছু আছে না বড়, যা এই প্রকৃষ্ট কিতাবে নেই।” –সূরা ইউনুস, আয়াত : ৬১

সুতরাং তিনি স্বয়ং আমাদেরকে বলেছেন যে, তোমরা যখন কুরআন পাঠ করো তখন আমি উপস্থিত থাকি; এটি ভুলবেন না।

রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি আমাদেরকে এ থেকে উপকৃত করুন এবং আমাদের এ ইবাদত তিনি কবুল করে নিন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
কুরআন অধ্যয়নে কার্যকরী দুই পরামর্শ
কুরআন কেন বুঝতে হবে আমাদের?
কিভাবে আমরা সঠিকভাবে কুরআন বুঝব? (১ম পর্ব)
কিভাবে আমরা সঠিকভাবে কুরআন বুঝব? (শেষ পর্ব)
সন্দেহবাদিতার এই যুগ এবং চির সত্য কুরআন