অন্তরের তিন স্তর ও কোনটি সর্বোত্তম?

ঢাকা, ১ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

অন্তরের তিন স্তর ও কোনটি সর্বোত্তম?

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০১৯

অন্তরের তিন স্তর ও কোনটি সর্বোত্তম?

ইসলামে নফস বা আত্মার শুদ্ধিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনীষীদের মধ্যে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এবং ইমাম গাযালী (রহ.) অন্তরের পবিত্রতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। কারণ, ইবাদাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য পরিশুদ্ধ অন্তর থাকা জরুরী। অন্তর কলুষিত হলে আমাদের সমস্ত আমল কলুষিত হয়ে যায় এবং আমাদের সমগ্র জীবনই কালিমাময় হয়ে ওঠে।

উভয় মনীষীই কুরআনের আয়াত অনুযায়ী অন্তরকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। আমাদের অন্তর এই তিনটি স্তরের মধ্যে উঠানামা করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা দ্বিতীয় স্তরে আটকে থাকে। চলুন তবে পবিত্র কুরআন হতে এই তিন স্তর সম্পর্কে জেনে নিই।

প্রথম স্তরঃ মৃত অন্তর

আল্লাহ তাআলা বলেন,

خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

“আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহের উপর এবং তাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের উপর, আর তাদের চক্ষুগুলোর উপর পড়ে আছে আবরণ। সুতরাং, তাদের জন্য রয়েছে বিরাট আযাব।” –সূরা বাকারা: ৭

এটি হচ্ছে সেই ধরণের অন্তর যা তার প্রভুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে অক্ষম। আল্লাহ এমন অন্তরের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছেন। ফলে তারা আল্লাহর নাজিলকৃত নিদর্শনকে দেখে না। তিঁনি কেড়ে নিয়েছেন এর শ্রবণশক্তিকে। ফলে তারা সত্যের আহবান শুনতে পায় না।

এটি সম্পূর্ণরূপে অসতর্ক-অমনোযোগী এক অন্তর। এবং প্রবৃত্তি একে যেখানে নিয়ে যেতে চায় সেখানেই যায়। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এধরণের অন্তরের অধিকারীদের সম্পর্কে বলেছেন-

مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَّا يُبْصِرُونَ

“তাদের উপমা হলো ঐ ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালালো। আগুন যখন তার চারপাশ আলোকিত করে তুললো, তখন আল্লাহ তার চোখের আলো নিয়ে নিলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন অন্ধকার রাশিতে, তাই কিছুই দেখতে পায় না তাদের দৃষ্টি। তারা বধির, বোবা, অন্ধ; তাই তারা ফিরে আসবে না (হিদায়াতের পথে)।” –সূরা বাকারা: ১৭

আল্লাহ কখন তার বান্দার অন্তরে মহর মেরে দেন? যখন বান্দা পাপের মাঝে খুব বেশি নিমগ্ন হয়ে যায়। আল্লাহ পাপের পথকে তখন তার জন্য সহজ করে দেন এবং অন্তরের রোগকে আরও বাড়িয়ে দেন।

فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ

“তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে রোগ। তাই আল্লাহ তাদের রোগকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, কারণ তারা মিথ্যা বলে।” –সূরা বাকারা: ১০

কাজেই, তাদের অন্তরের এই মৃত্যুর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী।

فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ وَكُفْرِهِم بِآيَاتِ اللَّهِ وَقَتْلِهِمُ الْأَنبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَقَوْلِهِمْ قُلُوبُنَا غُلْفٌ ۚ بَلْ طَبَعَ اللَّهُ عَلَيْهَا بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا

“এবং তারা অভিশপ্ত হয়েছে তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে, আল্লাহর আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করার কারণে, অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করার কারণে এবং তাদের এই কথার কারণে যেঃ ‘আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত’। বরং তাদের কুফুরির কারণে আল্লাহ তাদের অন্তর সীলমোহর করে দিয়েছেন। ফলে তারা আর ঈমান আনবে না, স্বল্প সংখ্যক ছাড়া।” –সূরা নিসা: ১৫৫

এই অবস্থাটা খুবই ভয়ানক একটা ব্যাপার। আমাদেরকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন আমরা কখনই এই স্তরে পৌঁছে না যাই।

দ্বিতীয় স্তরঃ রুগ্ন অন্তর

এই স্তরে অন্তর মৃত নয় তবে রোগে আক্রান্ত। হৃদয়ে রোগের মাত্রায় তারতম্য হতে পারে এবং তা সামান্য থেকে তীব্র মাত্রার হতে পারে। আল্লাহ কুরআনে নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত দিয়েছেন-

أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ السَّمَاء فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصْابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ واللّهُ مُحِيطٌ بِالْكافِرِينَ

“আর তাদের উদাহরণ সেসব লোকের মত যারা দুর্যোগপূর্ণ ঝড়ো রাতে পথ চলে, যাতে থাকে আঁধার, গর্জন ও বিদ্যুৎচমক। মৃত্যুর ভয়ে গর্জনের সময় কানে আঙ্গুল দিয়ে রক্ষা পেতে চায়। অথচ সমস্ত কাফেরই আল্লাহ কর্তৃক পরিবেষ্ঠিত।” –সূরা বাকারা: ১৯

রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্টদের আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করেছেন যে, তিনি যদি চান তাহলে তাদের অন্তরে মহর মেরে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি তা এখনও করেন নি। সুতরাং তাদের উচিত যত দ্রুত সম্ভব অন্তরের রোগের চিকিৎসা করানো।

তৃতীয় স্তরঃ সুস্থ অন্তর

এটি এমন এক অন্তর যা পবিত্র। যা সকল ধরণের রোগ থেকে মুক্ত। এই অন্তর স্রষ্টাকে এবং তার আনুগত্যকে ভালোবাসে। ভালো কাজ করা তার জন্য সহজ মনে হয় এবং নাফরমানি ও মন্দ কাজকে সে ভয় এবং ঘৃণা করে।

يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ . إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

“যেদিন মাল সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না, তবে উপকার লাভ করবে সে, যে হাজির হবে শুদ্ধ প্রশান্ত অন্তর নিয়ে।” –সূরা শুআরা: ৮৯

এটাই হৃদয়ের সেই স্তর যেখানে আমরা সবাই পৌঁছাতে চাই। 

এমএফ/

আরও পড়ুন...
শীতকালে ইহ-পরকালের কামাই!
দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক নেক আমলগুলো জেনে নিন
শীত মুমিনের বসন্তকাল
শীতে ৬ টি নেক আমল করুন

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও