কুরআনে বর্ণিত পূর্ববর্তীদের শিক্ষণীয় তিন ঘটনা

ঢাকা, ১৭ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

কুরআনে বর্ণিত পূর্ববর্তীদের শিক্ষণীয় তিন ঘটনা

পরিবর্তন ডেস্ক ৭:৩২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০২, ২০১৮

কুরআনে বর্ণিত পূর্ববর্তীদের শিক্ষণীয় তিন ঘটনা

কওমে ‘সাবা’র ধ্বংসাবশেষ

পূর্ববর্তীদের জীবনেতিহাস পরবর্তীদের জন্য সম্পদ। তাদের ধ্বংস বা অর্জন সবকিছুতেই রয়েছে আমাদের জন্য শিক্ষা ও জীবনের পাথেয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ইতিহাস থেকে প্রয়োজনীয় নির্যাসটুকু আমাদের শিক্ষা হিসেবে কুরআন মাজীদে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। এ নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ, এমনই তিনটি কুরআন-বর্ণিত ঘটনা উল্লেখ করা হবে, যেন আমরা এ থেকে অর্জনটুকু গ্রহণ করি।

প্রথম ঘটনা

أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّىَ يُحْيِـي هَـَذِهِ اللّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا

“তুমি কি সে লোককে দেখোনি যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যার বাড়িঘরগুলো ভেঙ্গে ছাদের উপর পড়ে ছিল? সে বলল, কেমন করে আল্লাহ মরণের পর একে জীবিত করবেন?” (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৯)

আল্লাহ তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দিতে একশত বছরের জন্য তার প্রাণ নিয়ে নিলেন এবং তাকে ঐ স্থানেই পড়ে থাকলো। একশত বছর পর, আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবন দান করলে সে ব্যক্তি ধারণা করলো, সে হয়তো একদিন বা তার থেকে কম সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে জানান, সে এভাবে একশত বছর পরে ছিল। কুরআন মাজীদে আল্লাহ বলেন,

فَأَمَاتَهُ اللّهُ مِئَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَل لَّبِثْتَ مِئَةَ عَامٍ فَانظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهْ وَانظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِّلنَّاسِ وَانظُرْ إِلَى العِظَامِ كَيْفَ نُنشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অতঃপর আল্লাহ তাকে মৃত অবস্থায় রাখলেন একশ বছর। তারপর তাকে উঠালেন। বললেন, কত কাল এভাবে ছিলে? বলল আমি ছিলাম, একদিন কংবা একদিনের কিছু কম সময়। বললেন, তা নয়; বরং তুমি তো একশ বছর ছিলে। এবার চেয়ে দেখ নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে-সেগুলো পচে যায় নি এবং দেখ নিজের গাধাটির দিকে। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখ যে, আমি এগুলোকে কেমন করে জুড়ে দেই এবং সেগুলোর উপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দেই। অতঃপর যখন তার উপর এ অবস্থা প্রকাশিত হল, তখন বলে উঠল-আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। -সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৯

ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা

এই ঘটনাটি আমাদেরকে পুনরুজ্জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করে। গল্পের এই ব্যক্তিটির মতোই আমাদেরকেও আমাদের মৃত্যুর পর একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

দ্বিতীয় ঘটনা

প্রাচীনকালে ‘সাবা’ নামে একটি রাজ্য ছিল যে রাজ্যের অঞ্চলগুলোকে আল্লাহ পানি সরবরাহের ব্যবস্থার মাধ্যমে উর্বর করেছিলেন। এই পানিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য ‘সাবা’র রাজারা একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। এর ফলে তাদের রাজ্যটি বিভিন্ন ফল, ফসল ও গাছ-গাছালিতে সমৃদ্ধ ছিল। 

কিন্তু তাদের সমৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা তারা ভুলে যেতে লাগলো। এমনকি তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যের উপাসনা করা শুরু করলো। আল্লাহ তাদেরকে এই অকৃতজ্ঞতার শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ তুলে নেন। তাদের সমৃদ্ধির উৎস বিশাল বাঁধটিতে ইঁদুর গর্ত করে করে ফেলে এবং এভাবে বাঁধটি ধ্বসে পড়ে। ফলে তাদের ফল-ফসলে সমৃদ্ধ অঞ্চলটি বন্যায় ভেসে যায়।

এ ঘটনা বর্ণনা করে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,

لَقَدْ كَانَ لِسَبَإٍ فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَن يَمِينٍ وَشِمَالٍ كُلُوا مِن رِّزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةٌ طَيِّبَةٌ وَرَبٌّ غَفُورٌ. فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُم بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَى أُكُلٍ خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِّن سِدْرٍ قَلِيلٍ. ذَلِكَ جَزَيْنَاهُم بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلَّا الْكَفُورَ

“সাবার অধিবাসীদের জন্যে তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন-দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, একটি বামদিকে। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার রিযিক খাও এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। স্বাস্থ্যকর শহর এবং ক্ষমাশীল পালনকর্তা। অতঃপর তারা অবাধ্যতা করল ফলে আমি তাদের উপর প্রেরণ করলাম প্রবল বন্যা! আর তাদের উদ্যানদ্বয়কে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুই উদ্যানে, যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং সামান্য কুলবৃক্ষ। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেই না।” -সূরা সাবা, আয়াত: ১৫-১৭

এখান থেকে আমরা যা শিখলাম

এই ঘটনাটি আমাদের জন্য শিক্ষা যে, আমাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির সময়ে আমরা যেন আল্লাহকে ভুলে না যাই এবং তার অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ না হই। আমাদের সবসময় এই বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন এবং আল্লাহর যাবতীয় নেয়ামতের জন্য সর্বদা তার শোকর আদায় করা উচিত। আল্লাহ বলেন,

“যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৭)

তৃতীয় ঘটনা

যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মুক্ত করা দাস ও পালিত পুত্র। তিনি তার সাথে যয়নব বিনতে হারেসা (রা.) এর বিবাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সম্মিলিত বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না এবং তারা একজন অপরজনের কাছ থেকে স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছিলেন না। এর ফলে যায়েদ (রা.) যয়নব (রা.) কে তালাক দিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা.) তাকে তা করতে নিষেধ করেছিলেন।

পরবর্তীতে আল্লাহ রাসূল (সা.) কে এই বিবাহ বিচ্ছেদে বাধা না দেওয়ার জন্য আদেশ দিলেন এবং বিবাহ বিচ্ছেদের পর আল্লাহ রাসূল (সা.) কে যয়নব (রা.) কে বিবাহ করার আদেশ দিলেন।

زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

“...তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।” (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭)

এখানে আমাদের জন্যে যা শেখার আছে

হযরত যায়েদ ও যয়নব (রা.) উভয়েই উচ্চ মানের সাহাবী ছিলেন। যায়েদ (রা.) ছিলেন এমন একজন সাহাবী, যাকে কুরআনে তার নাম ধরে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রথম তিনজন ঈমান গ্রহণকারী সাহাবাদের মধ্যে একজন।

অপরদিকে যয়নব (রা.) ছিলেন উম্মুল মুমিনীনদের মধ্যে অন্যতম এবং তিনি তার উদারতা, কোমলতা ও দানশীলতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।

এত উঁচু পর্যায়ের সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও তারা উভয়ে একত্রে থাকতে সক্ষম হননি। তাদের মধ্যকার ঝগড়া ও তিক্ততা এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত তারা আলাদা হয়ে যান।  

এ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, কোন দম্পতি যদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তাদের মধ্যে একজন অথবা দুইজনই মন্দ চরিত্রের লোক, এমনটি ভাবার কোন যৌক্তিকতাই নেই। একটি দম্পতি যদি পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে সাধারনভাবে এটা ধারণা করা যেতে পারে, তারা একজন অপরজনের যোগ্য নয়।

আমাদের কখনোই উচিত নয় এ প্রসঙ্গে নিকৃষ্ট ধারণা করা এবং এর বিচার-বিবেচনা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়াই আমাদের জন্য যুক্তিযুক্ত। রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে উপরোক্ত তিনটি ঘটনা থেকে অর্জিত শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করেন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
সন্তানের প্রতি লোকমান হাকীমের ১১ উপদেশ (প্রথম পর্ব)

 

কুরআনের আলো: আরও পড়ুন

আরও