মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯ | ১১ চৈত্র ১৪২৫

মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ২:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০১৮

মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা

সৃষ্টি যা কিছু দৃশ্যমান, স্রষ্টা ধ্বংসশীলতাকে করেছেন তার বৈশিষ্ট্য। তেমনি ধ্বংসশীল এ পৃথিবীতে মৃত্যুকে করেছেন প্রতিটি প্রাণের চূড়ান্ত পরিণতি। এর মাধ্যমে রুহকে তিনি বিদায় নিইয়ে দেন দেহ থেকে, পৃথিবীর সকল বস্তুসম্ভার থেকে অনন্ত জগতের পথে...।

বান্দার আমল ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন শেষ পরিণতিরও ভালো/খারাপ দুটি অবস্থা। ভালো পরিণতি বা ভালো মৃত্যু বলতে যা বুঝায় তা হলো, বান্দা মৃত্যুর সময় নিজেও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকে, আর আল্লাহও থাকেন তার উপর সন্তুষ্ট। এভাবে যে- তার মৃত্যু হয় এমন অবস্থায় যখন সে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা থেকে দূরে আছে, সকল পাপাচার থেকে তাওবাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তার আনুগত্যে পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছে ও নেককাজে অগ্রণী হয়েছে। আর এ ভাল অবস্থাতেই তার ইন্তেকাল হয়েছে। এমন হলেই বলা হবে তার শেষ পরিণতি ভাল হয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে-
عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا أراد الله بعبده خيرا استعمله قالوا : كيف يستعمله؟ قال: يوفقه لعمل صالح قبل موته رواه أحمد
‘হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— যখন আল্লাহ কোনো মানুষের কল্যাণ করতে চান তখন তাকে সুযোগ করে দেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কিভাবে সুযোগ করে দেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন— মৃত্যুর পূর্বে তাকে সৎকাজ করার সামর্থ দান করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)

শেষ পরিণতি ভাল হওয়ার কিছু আলামত রয়েছে। কিছু আলামত এমন যা মৃত্যুকালে মুমিন ব্যক্তি নিজে অনুভব করতে পারেন, মানুষের কাছে প্রকাশ পায় না, আর কিছু আছে যা মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়।

যে আলামতগুলো বান্দা নিজে মৃত্যুকালে উপলদ্ধি করেন তা হলো— মুত্যুকালে আল্লাহর সন্তুষ্টির সংবাদ, তাঁর অনুগ্রহ, যার সুসংবাদ ফেরেশতারা নিয়ে আসে। যেমন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ . نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآَخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ . نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ
‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে এবং আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে, যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমরা আদেশ কর। এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।’ (সুরা হা-মীম সিজদাহ: ৩০-৩২)

ফেরেশতারা এ সুসংবাদ যেমন মৃত্যুকালে দেয় তেমনি কবরে অবস্থানকালে দেয় এবং কবর থেকে পুনরুত্থানের সময়ও দেবে। হাদিসে এর বর্ণনা এসেছে-
عن عائشة رضي الله عنها قالت : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : (من أحب لقاء الله أحب الله لقائه، ومن كره لقاء الله كره الله لقائه) فقلت يا نبي الله : أكراهية الموت ؟ فكلنا نكره الموت! فقال : (ليس كذلك، ولكن المؤمن إذا بشر برحمة الله ورضوانه وجنته أحب لقاء الله فأحب الله لقائه، وإن الكافر إذا بشر بعذاب الله وسخطه كره لقاء الله فكره الله لقائه . رواه مسلم
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন— যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে ভালবাসেন। আর যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আল্লাহ তার সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে নবী! সাক্ষাৎকে অপছন্দ করার অর্থ কি মৃত্যুকে অপছন্দ করা? আমরাতো সকলেই মৃত্যুকে অপছন্দ করে থাকি! তিনি বললেন, ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। বিষয়টা হলো, মুমিন ব্যক্তিকে যখন আল্লাহর রহমত, তার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসতে থাকে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসেন। আর যখন আল্লাহর অবাধ্য মানুষকে আল্লাহর শাস্তি ও তার ক্রোধের খবর দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে। ফলে আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।’ (মুসলিম)

এ হাদিসে মৃত্যুকে পছন্দ আর অপছন্দ করার যে কথা বলা হয়েছে তা হলো মৃত্যু যখন উপস্থিত হয়ে যায় ও তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায় তখনকার সময়। মৃত্যু উপস্থিত হলে মুমিন ব্যক্তি সুসংবাদ পেয়ে মৃত্যুকে ভালবাসে আর আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি তখন মৃত্যুকে ঘৃণা করে।

আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে ভালবাসার প্রমাণ হলো পরকালকে সর্বদা পার্থিব জীবনের উপর প্রাধান্য দেবে। দুনিয়াতে চিরদিন অবস্থান করার আশা করবে না বরং পরকালীন জীবনের জন্য সৎকর্মের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকবে।

আর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে অপছন্দ করার বিষয়টি হলো ঠিক এর বিপরীত। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার জীবনকে পরকালের উপর প্রাধান্য দেয় এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না। এদের তিরস্কার করে আল্লাহ বলেন- إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا
‘নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট এবং এতে পরিতৃপ্ত থাকে।’ (সুরা ইউনুস-৭)

ভালো মৃত্যুর কিছু উপায়
এক. আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়া অবলম্বন করা:
আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়ার মূল হলো সর্ব ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ তথা একাত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এটা হলো; সকল প্রকার ফরজ ওয়াজিব আদায়, সব ধরনের পাপাচার থেকে সাবধান থাকা, অবিলম্বে তাওবা করা ও সকল প্রকার ছোট-বড় শিরক থেকে মুক্ত থাকা।

দুই. বাহ্যিক ও আধ্যাতিক অবস্থা উন্নত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা:
প্রথমে নিজেকে সংশোধন করার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। যে নিজেকে সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করবে আল্লাহ তার নীতি অনুযায়ী তাকে সংশোধনের সামর্থ দান করবেন। এজন্য প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করা অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করা। এটাই মুক্তির পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।’ (সুরা নিসা- ১০২)

আল্লাহ আরও বলেন- وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
‘তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের এবাদত কর।’ (সুরা হিজর-৯৯)

ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য হলো সর্বদা পাপ থেকে সাবধান থাকবে। কবিরা গুণাহকে বলা হয় মুবিকাত বা ধ্বংসকারী। আর অব্যাহত ছগিরা গুণাহ কবিরা গুণাহতে পরিণত হয়ে থাকে। বারবার ছগিরা করলে অন্তরে জং ধরে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إياكم ومحقرات الذنوب، فإنما مثل محقرات الذنوب كقوم نزلوا بطن واد، فجاء ذا بعود، وجاء ذا بعود، حتى أنضجوا خبزتهم، وإن محقرات الذنوب متى يؤخذ بها صاحبها تهلكه. رواه أحمد
‘তোমরা ছোট ছোট গুণাহ থেকে সাবধান থাকবে। ছোট গুণাহে লিপ্ত হয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত হলো সেই পর্যটক দলের মতো যারা একটি উপত্যকায় অবস্থান করল। অতঃপর একজন একজন করে তাদের জ্বালানি কাঠগুলো অল্প অল্প করে জালিয়ে তাপ নিতে থাকল, পরিণতিতে তাদের রুটি তৈরি করার জন্য কিছুই অবশিষ্ট রইল না।’ (মুসনাদে আহমাদ)

কখনো কোনো ধরনের গুণাহকে ছোট ভাবা ঠিক নয়। প্রখ্যাত সাহাবী আনাস (রা.) বলেন-
إنكم لتعملون أعمالا هي أدق في أعينكم من الشعر، إن كنا لنعدها على عهد النبي صلى الله عليه وسلم من الموبقات. رواه البخاري
‘তোমরা অনেক কাজকে নিজেদের চোখে চুলের চেয়েও ছোট দেখ অথচ তা আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ধ্বংসাত্মক কাজ মনে করতাম।’(বুখারি)

তিন. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সর্বদা কান্নাকাটি করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সর্বদা কান্নাকাটি করে তার কাছে ঈমান ও তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফিক প্রার্থনা করা। তিনি যেন তার সন্তুষ্টির সাথে মৃত্যুর তাওফিক দেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই এ দু’আ করতেন- يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك. رواه الترمذي ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অটল রাখেন।’ (তিরমিযি)

ইউসূফ (আ.) দু’আ করতেন- تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
‘তুমি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও এবং সৎ কর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত কর।’ (সুরা ইউসুফ)

চার. আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা:
যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকে ও সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণের সাথে সম্পন্ন হবে তার শেষ পরিণতি শুভ হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة. أخرجه الحاكم
‘যার শেষ কথা হবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম)

অনন্ত দয়ার আধার মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের যেন খাতিমাহ বিল খাইর তথা কল্যাণময় মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভের তাওফিক দান করেন, আর আমাদের মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা। আমিন।

এমএফ/