অষ্টম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫

অষ্টম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

শাইখ জিয়াউর রহমান ৫:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৮

অষ্টম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

আজ অষ্টম তারাবীহ। পবিত্র কুরআনের ১১ তম পারা তিলাওয়াত করা হবে আজ। সূরা তওবার ৯৪ নম্বর আয়াত থেকে ১৯৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত এবং সঙ্গে সূরা ইউনুস পুরোটা তিলাওয়াত করা হবে। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবীহতে তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর পয়েন্ট ভিত্তিক সারসংক্ষেপ আলোচনা তুলে ধরা হলো।

১. পূর্বেও মুনাফিকদের তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার অজুহাত পেশের আলোচনা হয়েছিল, ১১ নং পারার শুরুতেও মুনাফিকদের প্রসঙ্গ এনে বলা হচ্ছে, আপনি মদিনা পৌঁছার পরপরই তারা আপনার কাছে বিভিন্ন অজুহাত পেশ করবে৷ এই সংবাদ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাবুক থেকে ফেরার পথে রাস্তায়ই জানিয়ে দেয়া হয়েছে৷ বাস্তবেই তেমনটা ঘটল৷ তারা কসম করে করে নিজেদের ওজর-অক্ষমতার কথা পেশ করল৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবতা জেনেও চূড়ান্ত ভদ্রতাজনিত কারণে নিরবতা পালন করলেন৷

২. মুহাজির, আনসার ও সর্বস্তরের সাহাবায়ে কেরামের উপর আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও তাঁদেরও আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্তুষ্টির আলোচনা এবং তাঁদের পুরস্কার চিরস্থায়ী জান্নাত হওয়ার ঘোষণা এসেছে৷

৩. মুনাফিকদের বিপরীতে ওই কতিপয় মুসলমানদের গুণাগুণ আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করলেন, যারা তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছিল৷ মিথ্যা বলে ভুলকে সঠিক আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেন নি৷
এটাই শিক্ষা, মিথ্যা বলে মন্দের মাঝে ভালোর প্রলেপ লাগানোর চাইতে মন্দকে মন্দ বলে স্বীকার করাই উত্তম এবং প্রশংসনীয় বিষয়৷


৪. মধ্যখানে আবার মুনাফিকদের আলোচনা৷ যারা ইসলামের ক্ষতি করার জন্য, কুফরের সহায়তা এবং মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির জন্য 'মসজিদে যেরার' নির্মাণ করেছিল৷ শুধু তাই না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে সেটির উদ্বোধন করানোর আবেদন করেছিল৷ কিন্তু বাস্তবতা প্রকাশিত হলো৷ আল্লাহ তাআলা সেখানে যেতে বারণ করে দিলেন৷ তারপর তাবুক থেকে ফেরার পথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই নির্দেশে সেটি জ্বালিয়ে দেয়া হলো৷ (সুরা তাওবা: ১০৭-১০৮)

চারটি উদ্দেশ্যে মুনাফিকরা মসজিদে যেরার নির্মাণ করেছিল৷ এক. মসজিদে কুবাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য, কারণ পাশেই মসজিদে কুবা ছিল৷ দুই. আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করার জন্য৷ তিন. মুমিনদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির লক্ষে৷ চার. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে যারা যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের সহযোগিতার জন্য৷

আজও কেউ যদি এই সমস্ত উদ্দেশ্য নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করে, তাহলে সেটি মসজিদে যেরার'র অন্তর্ভুক্ত হবে৷ তার হুকুম হলো, এমন মসজিদে সালাত আদায় করা জায়েয নয়৷

৫. মসজিদে যেরার'র মোকাবেলায় মসজিদে কুবা এবং মুনাফিকদের মোকাবেলায় মুমিনদের আলোচনা হয়েছে, যারা জান্নাতের বিনিময়ে নিজেদের জান-মাল আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে দিয়েছেন৷ মুমিনদের এমন নয়টি গুণাগুণ আলোচনা করেছেন, যেগুলো অর্জনে প্রত্যেক মুমিনের সচেষ্ট হওয়া উচিত৷ তাদের গুণাগুণগুলো হচ্ছে, তারা তাওবাকারী, ইবাদতগুজার, আল্লাহর প্রসংশাকারী, রোযা পালনকারী, রুকু-সিজদা আদায়কারী, নেক কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ প্রদানকারী এবং আল্লাহর সীমার সংরক্ষণকারী৷

৬. বলা হয়েছে, নিকটাত্মীয় হলেও নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় মুশরিকদের পক্ষে মাগফিরাত কামনা করা৷ কেননা তাদের জাহান্নামী হওয়াটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে৷

৭. গাজওয়ায়ে তাবুকে অংশগ্রহণের সৌভাগ্যবিড়ম্বিতদের মাঝে তিনজন সত্যিকার মুমিনও ছিলেন, যাদের ঈমান ও ইখলাসের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিলো না৷ কা'ব বিন মালিক, হিলাল ইবনে উমাইয়া, মুরারা বিন রাবী৷ তারা কোনো মিথ্যা অজুহাত পেশ করেন নি৷ প্রকাশ্য ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন৷ ৫০ দিন পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম তাদের সঙ্গে বয়কট তথা সম্পর্কচ্ছেদ করে থেকেছেন৷ তারাও তাওবার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন৷ অবশেষ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমার ঘোষণা এসেছে৷ আহ! সেদিন মদিনায় কী ঈদের আনন্দ ছিলো! (১১৭-১৮)

৮. এরপর মুমিনদেরকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তাগিদ করা হয়েছে৷ এক. প্রকাশ্য এবং গোপনে তাকওয়া অবলম্বন করা৷ দুই. যাদের ভেতর নেফাকি রয়েছে, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং সত্যবাদিদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা৷ চার. যে পরিমাণ ইবাদত এবং আনুগত্য করা হবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই পরিমাণ সওয়াব এবং পুরস্কার অর্জিত হবে, সেই বিশ্বাস রেখে দ্বীনের জন্য কষ্ট স্বীকার করা৷ (১১৯-১২১)

৯. কিছু মানুষ ইলম অর্জনের জন্যও থেকে যাওয়া উচিত, যাতে দ্বীনের বুঝ হাসিল হয়৷ সবাই জিহাদে চলে গেলে ইলম অর্জনের কাজ হবে না৷ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু দক্ষ জনবল দরকার, সেই প্রয়োজন পূরণে একদল মানুষ দ্বীনের পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্য ব্যস্ত থাকা চাই৷

১০. কোনো সুরা যখন নাযিল হয়, তখন মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি পায়৷ তার মানে হলো, কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত, চিন্তা-ভাবনা এবং সে অনুযায়ী আমল করার ফলে ঈমানের উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি ঘটে৷ অর্থাৎ ঈমানের নূর ও আস্বাদ বৃদ্ধি পায়৷ ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য সহজ হয়ে ওঠে৷ ইবাদতে স্বাদ লাগে, গোনাহের প্রতি স্বাভাবিক ঘৃণা জন্মে ও কষ্টবোধ হয়৷

১১. সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সৃষ্টির উপর, বিশেষত মুসলমানদের উপর বড় দয়াবান ও স্নেহশীল৷ এরপর তাঁকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, আপনার যাবতীয় চেষ্টা-তদবিরের পরও যদি কিছু লোক ঈমান গ্রহণে বিরত থাকে, তবে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন৷

১২. সুরা ইউনুস মক্কায় নাযিলকৃত সুরা৷ এই সুরায় ঈমানের বুনিয়াদি রুকন ও আকাঈদ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে৷ বিশেষ করে কুরআনের আলোচনা৷ এই সুরা শুরু হয়েছে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনার মাধ্যমে৷ বলা হয়েছে, খাতামুন্নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত-রিসালাত নতুন কোনো বিষয় নয়, আশ্চর্যেরও কথা নয়৷ এর পূর্বে প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোনো না কোনো নবী এসেছেন৷
তাই মানুষ দুই ভাগ হয়ে গেলো: একদল নবুওয়তের মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, আরেকদল সত্য বলে স্বীকৃতি প্রদানকারী৷ প্রথম দলের ঠিকানা জাহান্নাম, পরের দলের ঠিকানা জান্নাত নির্ধারিত হয়ে গেলো৷

১৩. আল্লাহ তাআলা সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময় ও চন্দ্রকে স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারীরূপে সৃষ্টি করেছেন৷ তার এগুলোর মনযিলসমূহ নির্ধারিত করার কথা উল্লেখ করেছেন, যাতে বছরের সংখ্যা ও হিসাব চেনা যায়৷

১৪. মুশরিকরা কুরআন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে দ্বিধা করত না৷ তারা বলত, আপনি আরেকটি কুরআন নিয়ে আসেন না কেন? অথবা এই কুরআনে কিছু পরিবর্তন করে নিন৷ তিনি জবাবে বলতেন: আমার ইচ্ছার কিছু নেই এখানে৷ আমি তো ওহী থেকে প্রাপ্ত নির্দেশের অধীন৷ তোমরা কি মনে কর আমি নিজ থেকে বানিয়ে এই কালাম আল্লাহর দিকে সম্বোধন করছি? নাউযুবিল্লাহ! অথচ তোমাদের মাঝে থেকেই ৪০ বছর অতিক্রম করে ফেললাম৷ কখনো কি আমাকে মিথ্যা বলতে দেখেছ? কোনো উস্তাযের কাছ থেকে ইলম শিখতে দেখেছ? তাহলে কিভাবে সম্ভব আমার বেলায় এটি করা?

যদি একথা সত্যি হয়ে থাকে যে, তোমাদের উপর কখনো মিথ্যা বলি নাই, তাহলে আল্লাহর উপর মিথ্যা বলা আমার পক্ষে কিভাবে সম্ভব? অথচ এটি যে আল্লাহর কালাম দুশমন পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে৷ আবু সুফিয়ান কুফরির যুগে রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াসের প্রশ্নের জবাবে বলতে বাধ্য হয়েছিল যে, নবুওয়তের পূর্বে তিনি কখনো মিথ্যা বলেন নি৷ তখন হিরাক্লিয়াস বলেছিল, এটা কিভাবে সম্ভব যে লোকটি মানুষের সাথে মিথ্যা বলে না, কিন্তু আল্লাহর উপর মিথ্যা বলা শুরু করবে?

১৫. এরপর আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুন যে, তোমাদেরকে আসমান এবং যমীন হতে কে রিযিক প্রদান করে? তোমাদের কান-চোখের মালিক কে? প্রাণহীন থেকে প্রাণের এবং প্রাণী থেকে প্রাণহীনের সৃষ্টি কে করেন? আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুন, তোমাদের কি আল্লাহর ভয় নেই?

১৬. আল্লাহর ওলীদের ভয়ভীতি নেই এবং তারা চিন্তান্বিতও হন না৷ তাদের জন্য পার্থিব এবং পরকালীন সুসংবাদের কথা এসেছে৷ আসমান-যমিনে যা কিছু আছে, সব আল্লাহর মালিকানায় আছে৷ সুতরাং আল্লাহ অমুখাপেক্ষী৷ তাঁর পুত্র সন্তানের কোনো প্রয়োজন নেই৷ তাই যারা পুত্র সাব্যস্ত করছে, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যাচার করছে৷

১৭. এরপর আল্লাহ তাআলা তিনটি ঐতিহাসিক কাহিনি বর্ণনা করলেন৷ প্রথমেই নুহ আলাইহিস সালামের কাহিনি, যাঁর তাবলীগে জিন্দেগি আম্বিয়া কেরামের সবার চাইতে দীর্ঘ ছিলো৷ কিন্তু অনুসারী ছিলো একেবারে নগণ্য৷ এরপর মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের কাহিনি, মুসা আ, যিনি ফেরাউনের মতো প্রভুত্ব দাবিদারের মোকাবেলা করেছেন৷ তৃতীয় কাহিনি হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের৷ আর এই নামে সুরারও নামকরণ করা হয়েছে৷

১৮. মুসা আলাইহিস সালামের বিখ্যাত মু'জিযা সাগর পারি দেয়া ও ফেরাউনের সমুদ্রে সলিল হওয়ার ঘটনা উল্লিখিত হয়েছে৷ যখন সমুদ্রে ডুবে মরার উপক্রম, তখন বলে: আমি ঈমান এনেছি ওই আল্লাহর উপর যার উপর বনী ইসরাইলরা ঈমান এনেছে৷ তাঁকে ছাড়া কোনো উপাস্য নেই৷ আল্লাহ বললেন: এতক্ষণে ঈমান এনেছ? ঈমান আর ইসলাম গ্রহণের সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে৷

১৯. হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম স্বীয় কওমের ঈমান আনয়নের ব্যাপারে যখন নিরাশ হয়ে গেলেন এবং নিশ্চিতভাবে আল্লাহর আযাব অত্যাসন্ন ছিলো, তখন এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন৷ অন্যত্র হিজরতের জন্য যখন নৌযানে উঠলেন, তখন উত্তাল সমুদ্রের ভয়াবহতার কারণে মাঝি ইউনুস আলাইহিস সালামকে ফেলে দেয়৷ এরপর এক বৃহদাকারের মাছ ইউনুস আলাইহিস সালামকে পেটের ভেতর নিয়ে নেয়৷ আল্লাহ তাআলা তাঁকে মাছের পেটের ভেতরও জীবিত ও অক্ষত রেখেছেন৷ কিছুদিন পর সেই মাছই সমুদ্রের কিনারে ইউনুস আলাইহিস সালামকে রেখে যায়৷ এদিকে কওমের সবাই আযাবের আলামত পেয়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সবাই ময়দানে বের হয়ে আসে৷ তাওবা, ইস্তেগফারের মাধ্যমে ঈমান গ্রহণ করে নেয়৷ যার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর থেকে আযাব সরিয়ে নেন৷

আরও পড়ুন...
সপ্তম তারাবীহ : তিলাওয়াতের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ আলোচনা

এমএফ/