ধৈর্য্যের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

ধৈর্য্যের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান

ফয়জুল্লাহ সাইফ ১২:৩২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

ধৈর্য্যের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান

পার্থিব জগত হলো মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি মানুষকেই পরীক্ষা করেন। এবং তিনি বলে দিয়েছেন বান্দা যেন পরীক্ষার সময়গুলোতে ধৈর্য্য ও ইস্তিকামাতের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয় এবং আল্লাহ প্রতিশ্রুত পুরস্কার ও সাফল্য লাভে ধন্য হয়।

ইসলামকে জীবনে ধারণ করে চলা বিশ্বাসী বান্দাদের যত প্রশংসনীয় গুণাবলী আছে, ধৈর্য্য তার মধ্যে অন্যতম।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ধৈর্য্যের অনুপম দৃষ্টান্ত। এবং তাঁর একান্ত অনুসারী সাহাবাগনও জীবনে অভাব-অনটনে, দুঃখ-কষ্টে ও যুদ্ধের কঠিন অবস্থাতেও দেখিয়ে গিয়েছিলেন কিভাবে ধৈর্য্যের সাথে অটল ও অবিচল থাকতে হয়।

তাই আসুন, জেনে নিই ধৈর্য্য ও ধৈর্য্যশীলদের সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ কি বলেছেন-
পবিত্র কুরআনে যুগের শপথ করে আল্লাহ বলছেন, “নিশ্চয়ই সমস্ত মানুষ ক্ষতির মাঝে রয়েছে। তবে তারা ব্যতীত যারা ইমান আনে অতঃপর সৎ কর্মশীল হয় এবং একে অপরকে ন্যায় ও সবরের উপদেশ দেয়।” (সূরা আসর)

আরও বলছেন, “হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য্য ধারণ কর এবং ধৈর্য্য ধারণে পরস্পর প্রতিযোগী হও এবং দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো” (সূরা আলে ইমরান-২০০)

আরও ইরশাদ হচ্ছে, “আমি অবশ্যই অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে কারা ত্যাগ স্বীকারকারী আর কারা ধৈর্য্যশীল এবং জেনে নিই তোমাদের অবস্থান।” (সূরা মুহাম্মাদ-৩১)

আল্লাহ তা’আলা আরও বলছেন, তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্য ধারণকারীদের সাথে আছেন। (সূরা বাকারাহঃ ১৫৩)

ধৈর্য্য ধারণকারীদের প্রশংসায় তিনি বলেছেন, “অবশ্যই যে ধৈর্য্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয়ই দৃঢ়-সংকল্প ও সাহসিকতার কাজ।” (সূরা শুরাঃ ৪৩)

তিনি ধৈর্য্যশীলদের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরশাদ করছেন, “নিশ্চয়ই অগণিত প্রতিদান দিয়ে ধৈর্য্য ধারণকারীদের পরিপূর্ণ করে দেওয়া হবে।” (সূরা যুমার-১০)

তিনি সূরা আলে ইমরানে বলছেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। হে নবী, আপনি ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”(সূরা আলে ইমরান:১৫৫)

আসলে এই পার্থিব জগত হলো একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি মানুষকেই পরীক্ষা করেন। তবে সবার পরীক্ষা একই স্তরের হয় না। আল্লাহ যাকে যেমন জ্ঞান, মেধা এবং জীবনোপকরণ দিয়েছেন তাকে ঠিক তার অনুপাতেই পরীক্ষা করেন।

আল্লাহ তা’আলা দেখতে চান মানুষ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে কি না। এছাড়া আর্থিক অভাব-অনটন, দারিদ্রতা, জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি এসবই পরীক্ষা হিসেবে মানুষের জীবনে আসে। মানুষ এসব বালা-মুসিবতের সময় কী ধরনের আচরণ করে তাই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

তবে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে পরীক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, তিনি মানুষকে চেনেন না, মানুষের প্রকৃতি তাঁর জানা নেই। এর অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ তা’আলা মানুষকে পরীক্ষার মাধ্যমে তার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চান এবং মানুষকে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার লাভের উপযোগী করতে চান।

একই সুরায় এর পরের আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন- "তারাই ধৈর্য্যশীল যারা বিপদের সময় বলে আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করব।" (আলে ইমরান:১৫৬)

পূর্বের আয়াতে আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের পুরস্কার দেয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে ধৈর্য্যশীলদের পরিচয় দিয়ে তিনি বলছেন, তারাই প্রকৃত ধৈর্য্যশীল যারা সংকট ও বিপদের সময় অধৈর্য্য ও হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখে। যারা বিশ্বাস করে জীবনের শুরু এবং শেষ আল্লাহরই হাতে তারা সব বিষয়েই আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে পারে। মূলত: পৃথিবী স্থায়ী বাসস্থান নয়। পৃথিবী হল-পরীক্ষার ময়দান।

এখানে দুঃখ ও কষ্ট হল পরীক্ষার উপকরণ। কিন্তু মানুষ সমস্যা ও বিপদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে। অনেকের ধৈর্য্য খুব কম। অল্পতেই তারা অধৈর্য্য হয়ে পড়েন এবং বিপদাপদে কুফরীসুলভ কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেন। আবার অনেকেই আছেন বিপদে ধৈর্য্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে তাঁর সাহায্য কামনা করেন।

আবার এমন অনেকেই আছেন যারা বিপদে ধৈর্য্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারণ তারা বিপদ-সংকটকে নিজেদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মাধ্যম বলে মনে করেন।

এরপর একই সুরার ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলছেন- "তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।" (ইমরান: ১৫৭)

এই আয়াতটিতে আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। এবং বলেছেন- তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করবেন। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহই তাদেরকে সুপথে চলার শক্তি ও সামর্থ্য যোগাবে।

হাদিস শরিফে ইরশাদ হচ্ছে-
আবূ মালিক হারিস ইবনে আসেম আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, “পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান। আর ‘আলহামদু লিল্লাহ’ নেকীর পাল্লাকে ভারি করে দেয় এবং ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আলহামদু লিল্লাহ’ আসমান ও যমীনের মধ্যস্থিত শূন্যতা পূর্ণ করে দেয়। নামায হচ্ছে জ্যোতি। সাদকাহ হচ্ছে প্রমাণ। “ধৈর্য্য হল আলো।” আর কুরআন তোমার স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল। প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল সকাল সবকর্মে বের হয় এবং তার আত্মার ব্যবসা করে। অতঃপর সে তাকে শাস্তি থেকে মুক্ত করে অথবা তাকে (আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ক’রে) বিনাশ করে।”(সহীহ্ মুসলিম)
আনাস রা. থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যখন আল্লাহ বান্দার কল্যাণ চান, তখন তিনি তাকে দুনিয়াতেই তাঁর কৃত অপরাধের শাস্তি দিয়ে দেন। আর যখন আল্লাহ তার অকল্যান চান, তখন তিনি তাকে শাস্তিদানে বিরত থাকেন। পরিশেষে কিয়ামতের দিন তাকে পুরোপুরি শাস্তি দেবেন।”
নবী করীম সা. আরো বলেন, “বড় পরীক্ষার বড় প্রতিদান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা যখন কোনো জাতিকে ভালবাসেন, তখন তার পরীক্ষা নেন। ফলে তাতে যে সন্তুষ্টি (ধৈর্য্য) প্রকাশ করবে, তার জন্য (আল্লাহর) সন্তুষ্টি রয়েছে। আর যে (আল্লাহর পরীক্ষায়) অসন্তুষ্ট হবে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।” (বুখারী)

দয়াময় আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর ধৈর্য্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং তাঁর প্রতিশ্রুত পুরস্কারের অধিকারি হওয়ার তাওফিক দান করুন।

-এফএস