বাঙালি ভবিষ্যতের শাসক?

ঢাকা, শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

বাঙালি ভবিষ্যতের শাসক?

মো. জাহাঙ্গীর আলম ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০১৮

print
বাঙালি ভবিষ্যতের শাসক?

সভ্যতা পর্বতের মত, শীর্ষে পৌঁছে নিচে নামা ছাড়া কোন গতি থাকে না। পার্থক্য কেবল পর্বতের ক্ষেত্রে মানুষ জানে যে সে নিচে নামছে, কিন্তু সভ্যতার ক্ষেত্রে তার এ বোধটুকু থাকে না। সাম্রাজ্যের বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। পুরোপুরি না হলেও আংশিক তো বটেই। ধারনা করা হয় দশ হাজার বছর পূর্বে (নব্য প্রস্তর যুগ) মানুষ সামাজিক ভাবে বসবাস শুরু করে। সেই থেকে আজ অবধি পৃথিবী প্রবল শক্তিধর সাম্রাজ্য/রাষ্ট্র/ব্যাক্তির যেমন গড়ে উঠা দেখেছে। তেমনি আবার ধ্বংসও কম দেখেনি।

কিছুদিন আগে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে ভবিষ্যৎ সুপার পাওয়ার নিয়ে নিবন্ধ ছাপা হয়। না সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। চীন-ভারত স্বাভাবিক ভাবেই তালিকার উপরের দিকের নাম সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার নামটাও প্রবন্ধে উল্লেখ ছিল। বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকা ছাড়াও অর্থনৈতিক দ্রুত বর্ধনকে প্রাধান্য দিয়েছেন গবেষকরা। তাহলে কি চীন-ভারত বা দক্ষিণ আফ্রিকানরাই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ডমিনেট পাওয়ার? আর আমাদের বাঙালিদের সুপার পাওয়ার হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? চলুন ইতিহাসের আলোকে জানার চেষ্ঠা করি।

ভারত উপমহাদেশ তথা সিন্ধু উপত্যকা বরাবরই জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই তিক্ত সত্য। অনেকেই হয়তো প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা তক্ষ্যশিলার কথা বলবেন। কিন্তু সক্রেটিস-এরিস্টটলদের সাথে কি নালন্দা অথবা তক্ষ্যশিলার গ্রেজুয়েটদের তুলনা হয়? মুসলিম আগমনের পূর্বেও বাংলাসহ উপমহাদেশের লোকজন ভাবতো হিমালয়ের ওপারে আর পৃথিবী নেই। তাদের দেবদেবীরা ওই হিমালয়েই বাস করেন। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র দেবদেবীদের অনুগ্রহ। দেবদেবী রুষ্ঠ হলে নেমে আসে নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ।শুধু আমজনতাই না তৎকালীন শিক্ষিত মানুষও এসব বিশ্বাস করত। কিন্তু তারা এটা জানত না দেবদেবী তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকলেও, পৃথিবীর অপরপ্রান্তের মানুষ নিজেদের ভূমি নিয়ে সন্তুষ্ট না। ফলাফল তুলনামূলক সম্পদশালী ভূমি হওয়া সত্বেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি দ্বারা শাষিত-শোষিত হওয়া।

অবশ্য এটাও ঠিক যে কোন জাতির অগ্রগামীতার জন্য জ্ঞানবিজ্ঞান একমাত্র শর্ত না। জ্ঞানবিজ্ঞানে পিছিয়ে থেকেও পৃথিবীতে আধিপত্য ফলানো যায়। পৃথিবী এমন কিছু জাতির কতৃত্ব দেখেছে, যাদের কোন বিশ্লেষণী ছাঁচে ফেলা সম্ভব না।

উপমহাদেশের মত ১৪০০ বছর আগে আরবরাও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। রোম আর পারস্য সম্রাজ্যের মাঝখানে, স্যান্ডুইচের মাঝে থাকা মাংসের টুকরোর মত ছিল তাদের অবস্থা। পারস্যের সম্রাটদের হাতে কাজ না থাকলে আরবে এসে হালকা পাতলা লুটতরাজ চালাত। নানা দলে বিভক্ত আরবদেরর দৃশ্যমান কোন বাঁধার সম্মুখীন তাদের হতে হত না। মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমনের পর দৃশ্যপটের নাটকীয় পরিবর্তন আসে। যে জাতি সামান্য পাথরের টুকরো নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধাত, তারাই একতাবদ্ধ হয়ে জয় করে নেয় একের পর এক রাজ্য। খলিফা উমার (রা) এর সময় পারস্য, মিশর, জেরুজালেমসহ পৃথিবীর বৃহৎ অংশ আবরদের আয়ত্বে আসে।

মঙ্গোলদের উত্থানও অনেকটা আরবদের মত। একাদশ শতাব্দীতে যখন মুসলিম আর খ্রিস্টানরা জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে একেরপর এক যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যস্ত, তখন খেনতি পর্বতের (বর্তমান মঙ্গোলিয়া) পাদদেশে তেমুজিন নামে এক বীরের জন্ম হয়। যাকে আমরা চেঙ্গিস খান নামে চিনি। সাধারণ যাযাবর এক জাতিকে একতাবদ্ধ করে দুর্ধর্ষ যোদ্ধার বাহিনীতে পরিণত করেন চেঙ্গিস খান। যে জাতির থাকার কোন নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না, জীন রাজবংশের দাস হওয়াই ছিল যাদের নিয়তি, বিশ বছরের ব্যবধানে তারাই দখল করে নেয় রাশিয়া, ইরাক, ইউরাল পর্বতমালার আশেপাশের অঞ্চলসহ আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং অতি অবশ্যই জিন রাজবংশের চীন।

লক্ষণীয় বিষয়, মঙ্গোল বা আরব জাতি কোনটাই জ্ঞানবিজ্ঞানে তখনকালীন প্রাধান্য বিস্তারকারি সাম্রাজ্যগুলো থেকে অগ্রসর ছিল না। বলা যায় তারা পিছিয়েই ছিল। ভারত উপমহাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। অধিকন্তু উপমহাদেশের অবস্থা আরব-মঙ্গোল থেকে অনেকাংশেই ভাল ছিল। তাহলে উপমহাদেশ আর আরব-মঙ্গোলদের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ছিল ? সে কোন সঞ্জীবনী শক্তি যার ছোঁয়া আরব-মঙ্গোলরা পায় কিন্তু উপমহাদেশের অধরাই থেকে যায়?

মোটাদাগে এর পেছনে দুই কারণ বিবেচনা করা যায়, প্রথমত ঐক্য, দ্বিতীয়ত যোগ্য নেতৃত্ব। আরবদের ক্ষেত্রে আরেকটা কারণ সংযোজিত হয়। আর তা হল ইসলাম নামক যুক্তিযুক্ত ধর্ম বা আদর্শ। এই ইসলামের কারণেই আরব সভ্যাতা এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সাম্রাজ্যে উপস্থিত। পক্ষান্তরে ভ্যালিড আদর্শ বা ধর্মের অভাবে পৃথিবীতে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অস্থিত্বের ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়া বিজিতের সাথে ব্যাবহারও আরব প্রসারের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিজিতের সাথে মঙ্গলদের ব্যবহার ছিল নিষ্ঠুর অন্যদিকে আরবদের ব্যবহার ছিল উদার। যাইহোক মূলকথায় ফিরে যাই, উপমহাদেশের মানুষ অজানা কারণে আত্মকেন্দ্রিক এবং কিছুটা স্বার্থপর। যার কারণে খুব কম সময়ই তারা ঐক্যমতে আসতে পেরেছিল। আর ক্যারিশমাটিক নেতা বলতে যা বুঝায় তা উপমহাদেশ কখনই পায়নি। অধিকাংশ সময় নেতা বা নেতৃস্থানীয়রা সাধারণের কথা না ভেবে, নিজেদের ব্যাক্তিস্বার্থের কথা ভাবতো। একটা উদাহরন দিয়ে বিষয়টা খোলাসা করছি। ১১৯১ সালে প্রথম তারাইনের যুদ্ধে কনৌজের রাজা জয়চন্দ্র ভারতীয় পৃথ্বীরাজ চৌহানকে সহায়তা না দিয়ে বহিরাগত মুইজউদ্দিন ঘুরিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। যার কারণ ছিল জয়চন্দ্রের অমতে পৃথ্বীরাজ ও জয়চন্দ্রের মেয়ে সংযুক্তার বিয়ে। এবার সাড়ে পাঁচশ বছর পিছিয়ে যান ৫৫৭ সাল ৩য় খলিফা উসমান (রাঃ) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সিফফিনের প্রান্তরে আমির মুয়াবিয়া ও ৪র্থ খলিফা আলি (রাঃ) মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। যুদ্ধে আমির মুয়াবিয়া কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় রোম সম্রাট কন্সটান্ট-২ মুয়াবিয়াকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মুয়াবিয়া এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। লক্ষ্য করুন যুদ্ধে পরাজিত হলে মুয়াবিয়ার জীবন সংশয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল,তবুও তিনি বিজাতির সহায়তা নিতে অস্বীকার করেন। আর এদিকে জয়চন্দ্র ব্যাক্তিগত বিদ্বেষের বসে নিজ জাতির ক্ষতি করতে দুবার ভাবেননি। এরকম ঘটনা যে একবারই ঘটেছে তা কিন্তু না। উপমহাদেশের ইতিহাসই স্বজাতির সাথে বেইমানির ইতিহাস। আর বাংলার ইতিহাসে তার সাথে যোগ করুন শোষন আর বঞ্চনা।

আমরা বাঙালিরা আসলে জয়চন্দ্রের উত্তরপুরুষ। ব্যাক্তিস্বার্থ উদ্ধার করতে প্রয়োজনে নিজের দেশকেও বিকিয়ে দিতে দ্বিধা করিনা। মীরজাফর, জগতশেঠরা হঠাৎ করে উদয় হয়নি। পূর্বপুরুষদের ধারা অনুসরণ করেছে মাত্র।

শোনা যায়, আজ যেখানে হিমালয় পর্বত একসময় নাকি সেখানে ছিল থিতিস সাগর। একটু ভাবুন থিতিস সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে কেউ তখন ভাবতে পেরেছিল একদিন এখানেই হবে এই গ্রহের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ? তৎকালীন সবথেকে বড় ভূগোলবিদেরও সম্ভবত এটা ভাবনার বাইরে ছিল। তাহলে বাঙালি জাতি একদিন পৃথিবী শাষন করবে ভাবতে অসুবিধা কোথায়? জানি বর্তমানে দাঁড়িয়ে কথাটা হজম করা বেশ কঠিন। কিন্তু হতেও তো পারে একদিন হিমালয়ের মত বাঙালির শাসন সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তবে তার জন্য সবার আগে দরকার ঐক্য এবং যোগ্য নেতৃত্ব। পৃথিবী রহস্যময়, এই রহস্যময়তাই আমাদের আশাবাদি করে।

লেখক: মো. জাহাঙ্গীর আলম,
সহকারী প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন 

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.


আলোচিত সংবাদ