বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৫ম পর্ব)

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৫ম পর্ব)

লে. কর্ণেল শহীদ আহমেদ (অব.) ১:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৫ম পর্ব)

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর থেকে বাসে উঠলাম নাটোরের পথে। মলিন মুখে রুমমেটরা বিদায় জানাল। ওদের যেমন বিস্ময়ের ধাক্কা কাটেনি, তেমনি আমারও কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। পেছনে পড়ে রইল আমার গত সাড়ে তিন বছরের হাসি-কান্নার খেলাঘর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। কত স্মৃতি, কত ভালোবাসা ও আনন্দ বেদনার সাক্ষী মতিহারের চত্বর!

মন বলছিল, ফিরে যাই। তবুও বারবার অশ্রু সামলে নিয়ে সিদ্ধান্তে অটল রইলাম। নাটোর থেকে ট্রেনে সান্তাহার, সান্তাহার থেকে বগুড়ায় পৌঁছে গেলাম আচ্ছন্নের মতো।

বগুড়া রেলস্টেশনের কাছেই সেউজগাড়িতে আমার এক বান্ধবীর বাড়ি। ওর কথা মনে হলো। বাংলাদেশ বিমানের এয়ার হোস্টেজ হওয়ার দারুণ ইচ্ছা ছিল তার। নির্বাচিতও হয়েছিল। কিন্তু বাধ সাধলেন ওর বাবা-মা। ‘না, যাওয়া যাবে না!’ বেচারী পরদিন খুব দুঃখ করে আমাকে বলেছিল, ‘ইস! জীবনের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়ে গেল আমার।’ হাসি পেল কথাটা ভেবে। আমার জীবনের এই অধ্যায়েরও যে করুণ সমাপ্তি হলো বন্ধু!

সময়টা ছিল ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাস।

বাড়িতে বাবা-মা’র প্রতিক্রিয়া যেমন ভেবেছিলাম, তেমন ভয়ঙ্কর কিছু হলো না। তারা একেবারে ‘বজ্রাহত’ বা ‘অধিক শোকে পাথর!’ হতাশায়, দুঃখে আর দুশ্চিন্তায় তারা অনেকটা নির্বাক হয়ে রইলেন। আমার উপরে তাদের প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল মনে হয়! তাতে আমার লজ্জ্বা আরও বাড়ল। আমার কৃতকর্মের জন্য বাবা-মা অন্যের প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন প্রতিদিন, এটা ভেবে হতাশা আমাকে একেবারে উদভ্রান্ত করে ফেলল।

দিন কয়েক ঘরবন্দি থেকে শহরে গেলাম। কোথায় যাই? কার কাছে? প্রথমে দেখা হল আমার এক দুলাভাই (মামাতো বোনের স্বামী, বগুড়ার বর্তমান মেয়র) অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের সাথে। সব কথা শুনে উনিই প্রথম আমাকে সাহস দিলেন।

বললেন, ‘আরে ব্যাটা, বাঘের বাচ্চা কখনো শিয়াল হয় নাকি? আবার শুরু কর। তুই পারবি। দরকার হলে নতুন সাবজেক্ট নিয়ে পড়।’

এরপর গেলাম টিপু ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। তিনি তো আমাকে দেখে অবাক,

- ক্যারে! তুই না সিদিনই রাজশাহীত গেলু! আবার ছুটি হছে?

- না টিপু ভাই। খুব বিপদে আছি।

সবকিছু শুনে টিপুভাইও একটু থমকে গেলেন।

- হামি মনে করিছুনু তুই বুদ্ধিমান। একন দেকি তুই একটা গাধা! গান-বাজনা করবু, তাতে তো কুনু মানা নাই। তাই বল্যা লিজের লেকা-পড়ার সব্বনাশ করা লাগবি? খালি গান লয়, তুই আরও অন্য কিবা কর্যা সময় নষ্ট করছু!

- ভাই, আগে বুজলে কি আর অঙ্কা করনো হিনি? আর সাবজেক্টটাও কঠিন আছল। একন কি করম তাই কন।

- সাবজেক্ট কঠিন আছল? আগে খিয়াল আছল না?

আমি কী করে তাকে বলি যে, সময়সীমা পার হবার পর ভর্তি হতে গিয়ে এই সাবজেক্ট নিয়েছিলাম। না নিলে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তিই হতে পারতাম না। প্রথম দুবছর তো হেসে খেলেই কেটে গেল। তৃতীয় বর্ষে এসেই না বুঝলাম, কত বড় ভুল করেছি!

যা হোক, অনেক বকাঝকা দিয়ে একটু পর বললেন,

- ঠিক আছে, ভাব্যা চিন্ত্যা দ্যাক কী করবু। হামিও এনা চিন্তা করি। আজ বাড়িত যা। মন খারাপ করিস ন্যা। মানুষের জীবনে খারাপ সময় আসেই। সব ঠিক হয়া যাবি। কাল আসিস।

রাতে অনেক ভেবে ঠিক করলাম, আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। অর্থাৎ ‘আমার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে।’ আবার পরীক্ষা দেব। কখনো তো খারাপ ছাত্র ছিলাম না! অন্তত গ্র্যাজুয়েশন করতেই হবে— যেভাবেই হোক! তারপর দেখা যাবে। কিন্তু রাজশাহীতে আর ফিরব না।

পরদিন বেলা ১১টার দিকে আবার জলেশ্বরীতলায় গেলাম। টিপু ভাইদের পৈতৃক বাড়ির সামনে বাঁধানো সিমেন্টের হেলনা চেয়ারে বসে লেবু (টিপু ভাইয়ের ছোটভাই, আমার ছোটবেলার বন্ধু ও ক্লাসমেট) বসে বাদাম খাচ্ছি। এমন সময় টিপু ভাইয়ের আগমন। বসলেন।

- শোন, এভাবে তোর জীবনডা লস্ট করা ঠিক হবি না। আবার ভর্তি হ! লেকা পড়া শ্যাস করাই লাগবি।

- হুম। হামিও তাই ভাবতেছি।

- আর শোন, আর একটা কতা। ফাঁকে ফাঁকে গানও গাওয়া লাগবি। এতদিন শিখ্যা পিছটান দেওয়ার দরকার কী?

- তা তো বুঝলাম। কিন্তু একন তো মার্শাল ল’। উদীচী তো বন্ধ। ক্যামনে কী হবি?

- আরে মার্শাল ল’ হছে তে কী হছে? দ্যাশের গান বাজনা কি তারা বন্দ কর্যা দিছে? এর মদ্দে অনুষ্ঠান করিচ্চি না? হামরা গান জানি। বিপ্লবী গান ছাড়াও অন্য গান তো জানি। অন্যরকম কায়দায় গান গামু। দেশের অন্যায়, কুসংস্কার, সামাজিক সমস্যা গুলাক তুল্যা ধরমু।

- সেই অন্যরকম কায়দা কী?

- হামরা একটা আঞ্চলিক শিল্পীগোষ্ঠী করমু। খালি বগুড়ার ভাষার গান, নাটক সব হবি। চিটাগাং এর শেফালী ঘোষ আর শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের নাম শুনিসনি? খালি চিটাগাইঙ্গা ভাষাত গান গায়।

লেবু ও আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। সম্পূর্ণ নতুন আইডিয়া।

- শেফালী ঘোষের কথা আলাদা। হামরা কি আর ঐ রকম প্রজেকশন পামু? আর গোষ্ঠী চালাতে টাকা-পয়সাও তো অনেক লাগে।

- অবশ্যই পামু। দেকিস সারাদেশ হামাকেরে সুনাম করবি। আর অনুষ্ঠান কর্যাই হামরা টাকা কামাই করমু।

- লাল ভাই, রূপ মামা, মুকুল, সিদ্দিক, তামান্না, বাটুল ভাই রাজী হবি?

- রাজী হবি ন্যা ক্যা? অরকেরে সাঁতে কতা কমু! দেকিস হিনি সগলি আসপি।

লেবু ও আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। টিপু ভাই থাকলে আমাদের আর ভয় কী? আর লালভাইরা সঙ্গে থাকলে তো কোন কথাই নাই! দেখি না করে? কী হয়! তো দলের নাম কি হবে?

টিপুভাই নাম প্রস্তাব করলেন ‘বগুড়া ইয়ূথ কর্নার’। কিন্তু আমি বললাম, নামটাই নেগেটিভ। ‘কর্নার’ নামটা কেন যেন দুর্বল দুর্বল লাগে। তার বদলে ‘বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার’ রাখলে কেমন হয়?

টিপু ভাই বললেন, না রে, তাহলে লোকে বলবে যে, আমরা রুমা গুহ ঠাকুরতার ‘ক্যালকাটা ইয়ূথ কয়্যার’-এর নাম নকল করেছি।

আমরা দুজন বললাম, ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কী? আর ‘কয়্যার’ শব্দটি কি ওদের পেটেন্ট করা? আমরা বাংলাদেশে থাকি। ওদের ফলো করতে যাব কেন?

টিপু ভাই রাজি হলেন।

আমি উত্তেজনায় সেদিনই থানা রোডের রাবার স্ট্যাম্পের দোকানে গিয়ে একটা গোল সিল তৈরির অর্ডার দিলাম। পরদিন ১৫ টাকা দিয়ে সেই সিল ডেলিভারি নিয়ে টিপু ভাইকে দেখালাম।

আমরা বারবার সাদা কাগজে সেই সিল মেরে দেখতে থাকলাম— কেমন লাগছে দেখতে আমাদের ‘বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার’!

(চলবে)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (১ম পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (২য় পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৪র্থ পর্ব)

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.


আলোচিত সংবাদ