রিক্রিয়েশনাল ক্যানাবিজম ও বারেক সাহেবের সহসা উপলব্ধি

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

রিক্রিয়েশনাল ক্যানাবিজম ও বারেক সাহেবের সহসা উপলব্ধি

ড. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ৫:৫৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

print
রিক্রিয়েশনাল ক্যানাবিজম ও বারেক সাহেবের সহসা উপলব্ধি

বিমানের চাকা হযরত শাহজালালের রানওয়ে ছোয়া মাত্র টার্কিশ এয়ারলাইন্সের পাইলট কষে ব্রেকে চাপ দিলেন। বিকট শব্দে রানওয়ে ঘেষতে ঘেষতে একসময় থমকে দাঁড়ায় বিশাল এয়ারবাস। বিমানের গতি যত কমে আসে, মেজাজের পারদটা ততই বাড়তে থাকে বারেক সাহেবের। ভেবেছিলেন পুরো শীতটাই সুইজারল্যান্ডে কাটিয়ে আসবেন। এবার ইউরোপে শীতের বাড়াবাড়ি। শীতের তাড়া খেয়েই প্রোগ্রাম অনেকটা কাট-ছাট করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরতে হলো। দেশে ফেরা মানেই বিমানবন্দর এলাকায় আর দলের কিছু লোক ফুল নিয়ে হাজির হবে। সেলফি উঠবে পটাপট। মুহুর্তেই ফেসবুকেও চলে যাবে সেগুলো। প্রথমে ফুল দেয়া নিয়ে কর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হবে আর পরে সেলফি তোলা নিয়ে তা মারামারি পর্যন্তও গড়াতে পারে। আর মারামারি হোক বা নাই হোক, সেলফি তোলার সময় ‘তার পাশে কে, আর কার পাশে কে’ এসব নিয়ে এলাকায় যে গ্রুপিং মাথাচাড়া দিবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। অথচ এসব নিয়ে তার কিছুই করার নেই। এসব শুধু তাকে সহ্যই করতে হবে না, নিজের সম্বর্ধনার জন্য নিজেকে খরচাপাতিও করতে হবে বেশ কিছু। সব সহ্য হতো অন্তত যদি এই লোকগুলো নিজেরা নিজেরা ভেজালটা না করত। অথচ এর ঠিক উল্টোটাই যেন এখন রাজনীতির কালচার। বড় নেতা-নেত্রীর সামনেই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া আর চেয়ার-টেবিল ভাঙচুরের প্রতিযোগিতায় প্রায়ই মাতছেন দলের আর অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও বাদ যায়নি। ভাঙচুরের ভয়ে একটি পেশাজীবী সংগঠনতো তাদের অডিটোরিয়ামটি আর ভাড়াই দিতে চাচ্ছেন না। ঝড়-ঝাপটাতো শেষ-মেষ অডিটোরিয়ামের উপর দিয়েই যায়। অথচ যে ছাত্রলীগের ছেলেগুলোকে সারাদিন গুণ্ডা বলে গালি দেন, সভা-সেমিনারে যাদের বিরুদ্ধে কথার তুবড়ি ছোটান, তারা কি সুন্দর ভাবেই না তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীটা উদযাপন করলো। ভাবা যায়?

দেশের মিডিয়া এখন সরগরম মুখরোচক কিছু মন্তব্য নিয়ে। বারেক সাহেবের অস্বস্তির এটাও একটা কারণ। আগে বিমানবন্দর থেকে বের হতেন ভিআইপি দিয়ে। এখন ‘সেই রামও নেই, নেই সেই অযোধ্যাও’। দল ক্ষমতায় নেই দীর্ঘদিন, নেই তার এমপিগিরিও। আর কোনদিন ক্ষমতায় আসা হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। বোঝার চেষ্টাও করেন না বারেক সাহেব ইদানিং। যেখান থেকে শুরু তার সেখানেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বারেক সাহেব। ব্যবসা বাণিজ্যই ভাল, রাজনীতি বোধকরি তার জন্য না!

টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে বের হতেই চিন্তায় চিড় ধরলো বারেক সাহেবের। এলাকার আর দলের বেশ কিছু লোক যথারিতী জড়ো হয়েছে। শ্লোগানে এলাকাটা মাতাচ্ছে তারা। নানাভাবে চলছে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা আর সেই সাথে সেলফি, ধাক্কাধাক্কি ইত্যাদি।

নতুন মডেলের প্রাডোটার কালো গ্লাসের আড়ালে আরাম করে স্বস্তির সিগারেটটা ধরালেন বারেক সাহেব। ঢাকার জ্যাম ঠেলে কচ্ছপের গতিতে আগাচ্ছে গাড়িটা। র‌্যাডিসন হোটের কাছে আসতেই বেজে উঠলো মোবাইলটা। অন্যপ্রান্তে ঢাকার প্রতিথযশা একটি দৈনিকের ততোধিক প্রতিথযশা একজন সম্পাদক। একথা-সেকথার পর ‘জোড়াতালির পদ্মা ব্রিজ’ আর ‘ডুবোজাহাজের ডুবে যাওয়া’ প্রসঙ্গে তার মতামত চাইলেন।

ডুবোজাহাজতো ডুব দেয়ার জন্যই, আর পদ্মা ব্রিজ যে স্প্যানের পর স্প্যান জোড়া দিয়ে বানানো হচ্ছে তাতো প্রথম স্প্যানটা বসানোর পর সরকার দলের লোকজনই ঢাক-ডোল পিটিয়ে প্রচার করেছে। অতএব এসব নিয়ে কেনই বা এত আলোচনা? কোনমতে ব্যাখ্যাটা দিয়ে লাইনটা কাটলেন বারেক সাহেব। সুইচ অফই করে দিলেন মোবাইলটার। নিজের ব্যাখ্যাগুলো নিজের কাছেই কেমন যেন গাজাখুরি মনে হচ্ছে!

হঠাৎ মনে পড়লো আসার আগে সিএনএন-এ দেখা খবরটার কথা। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ‘রিক্রিয়েশনাল ক্যানাবিজম’ অর্থাৎ আমোদের জন্য গাঁজা খাওয়া সিদ্ধ করা হয়েছে। ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে খবরটা দেখে বিষম খেতে বসেছিলেন বারেক সাহেব। তবে এখন কেন যেন খবরটার কথা মনে পড়ায় স্বস্তি বোধ করছেন। অমন উন্নত দেশে যদি গাঁজা খাওয়া সিদ্ধ হয় আর গাঁজাখুরি গল্প বলে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশেই বা নয় কেন? চলুক না গাঁজাখুরি বাগাড়ম্বর!

লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.


আলোচিত সংবাদ