বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৪র্থ পর্ব)

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৪র্থ পর্ব)

লে. কর্ণেল শহীদ আহমেদ (অব.) ২:৪৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৪র্থ পর্ব)

২৫ মার্চ ১৯৭১ আমাদেরকেও লণ্ডভণ্ড করে দিল। হঠাৎ করেই আন্দোলন হয়ে গেল সশস্ত্র। আমাদের গান গেল থেমে। কে কোথায় ছিটকে চলে গেল কোন খবর পেলাম না। শুরু হলো জনযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধ।

হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বগুড়া মুক্ত করল আপামর জনগণ। পালিয়ে গেল হানাদাররা। একমাস পর দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে বগুড়া দখল করল তারা। তারপর থেকে মৃত্যু, বিভীষিকা, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ আর অনিশ্চয়তার নয়টি মাস কাটিয়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। আবার নিজ নিজ বাড়ি ফিরলাম।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর আবার সরব হতে কিছু সময় লাগল। উদীচীর সবার হাল-হদিস জানা গেল মাসখানেকের মধ্যেই। এর মধ্যে কেউ শরণার্থী হয়ে ভারতে, আর বাকি সবাই দেশের ভেতরেই বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিল। মাসখানেকের মধ্যেই প্রায় সবাই আবার একত্রিত হলাম। ভাগ্য ভালো ছিল, আমাদের দলের সবাই বেঁচে ফিরেছিল। শুধু আমার মাথায় বুলেটের ক্ষতচিহ্ন।

এখন আবার নতুন যুদ্ধ শুরু। ক’দিন পরই একুশে ফেব্রুয়ারি। শুরু হলো নিয়মিত রিহার্সাল। হাতে সময় কম থাকায় বেশি বেশি রিহার্সাল করে সবার গলা হাঁসের মতো ফ্যাস ফ্যাস করছিল। অনুষ্ঠানের মঞ্চ ছিল আগের মতোই সাতমাথার জিরো পয়েন্টে। এখন যেটি সপ্তপদী মার্কেট, তখন ছিল নির্মীয়মাণ। এর পূর্ব পাশের বড় কার্নিশেই মঞ্চ করা হতো। ভয়ও লাগত, ১৫-২০ জন মানুষের ভারে যদি হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে! তবে আল্লাহর মেহেরবানিতে তেমন বিপদ কখনো হয়নি। আমি বলতাম, ‘এই বিল্ডিংয়ের কন্ট্রাক্টর ভদ্রলোক বিরল প্রকৃতির ভালো মানুষ, কাজে ফাঁকি দেননি।’ যতদূর মনে পড়ে, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরি ও সেদিনের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানটিই ছিল স্বাধীনতার পর উদীচীর প্রথম অনুষ্ঠান।

ইতোমধ্যে আমার ১৯৭১ এর স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল। ফলাফল পেতে আর দুই মাস। এভাবে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় বগুড়ায় ছিলাম। এর ফাঁকে ফাঁকে অনেক অনুষ্ঠান করলাম আমরা। আগস্টের শেষদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে উদীচীর সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত হলো। ছুটিতে বাড়ি এলে অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার লাভ হলো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখন কেমন অবস্থায় আছে জানি না। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল জমজমাট ও সমৃদ্ধ। নাটক, গান, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য, দেশ-বিদেশের অতিথি শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান নিয়মিত লেগেই থাকত। প্রতি ডিপার্টমেন্ট, হল ও কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বা রাকসু’র তত্বাবধানে অনেক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। তাই যখন ঢাকায় আজম খানের পপ সংগীত, নুরা পাগলা, হাইকোর্টের মাজার কেন্দ্রিক উন্মাতাল ব্যান্ড, মাইজভাণ্ডারি ও দেহতত্বের সংগীত চর্চা, যুবকদের গঞ্জিকা সেবন এবং হিপ্পি সংস্কৃতির প্রসার হচ্ছিল— তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতার সাথে আমরা শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করছিলাম।

অনেক গুণী শিল্পী তখন ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখতেন। তার সঙ্গে ছিলেন রাজশাহী শহরের বেশ ক’জন সংগীত ব্যক্তিত্ব ও সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সবার নাম উল্লেখ করতে গেলে লেখাটা দীর্ঘ হবার ভয়, তাই করছি না। শুধু এটুকুই উল্লেখ করতে চাই যে, সংগীত শিক্ষায় প্রকৃত প্রশিক্ষণ ও আত্মবিশ্বাস আমি সেখানেই পেয়েছি। অসংখ্য গুণী মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। তাদের সবার কাছে থেকেই যথাসম্ভব দীক্ষা নিতে চেষ্টা করেছি। আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তা চর্চা করে নিজেকে যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত করতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশ বেতারেও তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়েছিলাম।

কিন্তু গান নিয়ে উন্মাদনায় নিজের পড়াশোনার সর্বনাশ যে ডেকে এনেছি, তা বুঝতে দেরি হলো না। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। অনার্স পরীক্ষা তখন দোর গোড়ায়। সম্বিত ফিরে পেয়ে বুঝতে পারলাম, পরীক্ষা শুরু হতে মাত্র চার মাস বাকি, অথচ আমার প্রস্তুতি হালে পানি পাচ্ছে না। পরিসংখ্যানের মতো কঠিন বিষয়ে মুখস্থ বিদ্যার কোনো স্থান নেই। জটিল সব ফর্মুলা আর অঙ্কের মারপ্যাচ, সেই সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে বিশাল সাইজের ক্যালকুলেটরে ডাটা এন্ট্রি ও বিশ্লেষণ না জানলে অন্তত পরিসংখ্যানে ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ে না। তবু মাস দুয়েক বন্ধু পবিত্র রঞ্জন ভুঁইয়া ও সুশান্ত ভট্টাচার্যের সহযোগিতা নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করলাম। ওরা খুব সহযোগিতা করল। কিন্তু আমার নিরেট মস্তিষ্কে ঐ মহা কঠিন বিষয় কিছুতেই পেরেক ঠুকতে পারল না। আমি দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়লাম। ইতোমধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের মার্শাল ল’ চলছে, পরীক্ষা পেছানোর সম্ভাবনাও কম। আবার অন্যদিকে দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি বাবা-মা’র কঠিন মুখ ও সম্ভাব্য শাস্তি! কী করব? আত্মহত্যা? কোথায় যাবো?

অতপর অনেক বিনিদ্র রাত কাটিয়ে একদিন সকালে উঠে জীবনের প্রথম কঠিন সিদ্ধান্তটি নিলাম। আমার রুমমেটরা হতবিহ্বল হয়ে দেখল, আমি যথাসর্বস্ব জিনিসপত্র গুটিয়ে ফেলেছি।

আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাচ্ছি...।

(চলবে)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (১ম পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (২য় পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।