জঙ্গিবাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বৈধতা

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

জঙ্গিবাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বৈধতা

লুৎফর রহমান সোহাগ ৯:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০১৬

জঙ্গিবাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বৈধতা

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ধার্মিক ও রাজনীতিপ্রবণ। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সচেতন ধার্মিক, কতজন রাজনীতি সচেতন তাই বড় প্রশ্ন। মোটা দাগে, বাঙালির ধর্ম বিশ্বাস আর রাজনৈতিক আদর্শ অন্ধত্বের আবরণে ঢাকা। এই অন্ধ আনুগত্যের ফলেই উগ্র জঙ্গিবাদী শক্তি এখানে শক্তি প্রদর্শনের দুঃসাহস দেখিয়েছে। আর ভ্রান্ত রাজনৈতিক দর্শনের কারণেই সেই অপশক্তি সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করে নিয়েছে। আমরা কেউই হয়তো জঙ্গিবাদের উত্থান চাই না, কিন্তু আমাদের অনেকের কর্মকাণ্ডেই জঙ্গিরা উপকৃত হয়েছে। ফলে এখন রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই তারা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছে, ভবিষ্যৎ ফলাফল আরও ভয়াবহ যে হবে না তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

গুলশানের জিম্মি ঘটনাসহ সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে এটি সহজেই বলা যায়, এর সূত্রপাত হয়েছিল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান পরবর্তী সময়ে। জাতির দীর্ঘদিনের লজ্জা ঢেকে দিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছিল। একটি জাতির জন্মযুদ্ধের বিরোধীতাকারী নৃশংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার এতদিন পর রাস্তায় নামতে হয়, সেটি ছিল বিস্ময়ের। এই অপরাধীরা কেবল বাংলাদেশে টিকে ছিল তাই নয়, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিল। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। রাজনৈতিক স্বার্থে এ রাষ্ট্র ঘোরতর অপরাধীর সাথে আপোস করে, রাষ্ট্রে বিচারহীনতার এমন উদাহরণ আর হতে পারে না। চিহ্নিত অপরাধীদের প্রতি রাষ্ট্রের এই যে সামাজিক-রাজনৈতিক স্বীকৃতি, তা পরবর্তীতে আরও অনেক অপরাধীর জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে যারা মেনে নিতে পারেনি তাদেরকে তা আরও শক্তিশালী করেছে।

এসব কারণেই শাহবাগের আন্দোলনে মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষদের নৈতিক সমর্থন ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এতদিন যে অপশক্তি শক্ত আসন গেড়ে বসেছে, তারা কি তাতে সহজেই মাথানত করবে? সেই অপশক্তি সহজেই ‘নাস্তিকতা’ আর ‘অশ্লীলতার’ তত্ত্বে এ আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে চাইল। একটি গণমাধ্যমের বিকৃত ও নৈতিকতাবিবর্জিত প্রচারণায় ধর্মীয় সুযোগসন্ধানীরা সব ধরনের রসদ পেয়ে গিয়েছিল। অথচ রাস্তা-ঘাট ও ফেসবুকে যে প্রচারণা চলছিল, তার অধিকাংশই ছিল মিথ্যাচারে পূর্ণ। এমন অনেকেই ছিলেন, যারা কখনোই শাহবাগে যাননি; কিন্তু অন্ধ আনুগত্যের ফলে তারা সেই মিথ্যাকেই বিশ্বাস করে প্রচারণায় শামিল হয়েছিলেন। আর কয়েকজন ব্লগারকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে আটক করে রাষ্ট্রও সেই উন্মাদনায় ঢেউ দিযেছিল। ফলে গুটিকয়েক বিকৃত মানসিকতার সেই লোকদের কারণেই হেফাজতে ইসলামের উত্থান। হেফাজতের উত্থান ধর্মীয়ভাবে মানুষের অন্ধ হয়ে যাওয়ারও আরেক উদাহরণ। একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে কীভাবে তারা একাট্টা হয়ে উঠলেন! অথচ একাত্তরের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ধর্মীয় রাজনীতিকদের কখনোই অবস্থান নিতে দেখা যায়নি, যদিও ধর্মের সব মানদণ্ডেই পাকিস্তানিরা এ অঞ্চলে বর্বরতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

শাহবাগ নিয়ে এই প্রসঙ্গ তুলে আনার কারণ হল, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সূত্র এখানেই লুকিয়ে ছিল। জাতিগতভাবে আমরা সচেতন হলে পরবর্তীতে এত রক্তমাখা লাশ হয়তো আমাদের দেখতে হতো না। কিন্তু জাতিগতভাবে যে আমরা অন্ধ সে সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে উগ্রপন্থিরা। সে কারণেই ধীরে ধীরে বদলে গেছে খুনের লক্ষ্যবস্তু। একশ্রেণীর রাজনৈতিক সমর্থন ও প্রচারণা পেতেই তারা শাহবাগকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। আর একেকজন খুন হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে উদগ্রীব যে রাজনৈতিক শক্তি, তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যত অপপ্রচার করা যায় তাই করেছে। ফলে ধর্মের প্রতি যাদের অন্ধ আনুগত্য, তাদের মনোজগত এতটাই প্রভাবিত হয়েছে যে; ব্লগার মানেই তাদের কাছে নাস্তিক। ফেসবুক, মসজিদের খুতবা, এমনকি সাধারণের আলোচনায়ও চলছিল ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের মুণ্ডপাত। অথচ এই সমালোচকদের শতকরা ১ ভাগও সেই ব্লগারদের লেখা পড়েছিলেন কিনা কিংবা তাদের সম্পর্কে জানতেন কিনা সেটি নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। আর এখানেই সফল হয়েছে উগ্র খুনিরা, পরোক্ষভাবে তারা অনেকের সমর্থন আদায় করে নিতে পেরেছেন। এরপর একের পর এক ব্লগার খুন হল, আর আমাদের অনেকে সেই ব্লগারদের ধর্মীয় চেতনা নিয়ে জলঘোলা করলেন। ‘ধর্মীয় দ্বন্দ্বের’ মোড়কে তারা এর সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করলেন। ফলে একজন মানুষকে খুন করা অন্যায়, খুনিদের বিচার হওয়া উচিত; সেই চেতনা জাগ্রত হয়নি বৃহৎ পরিসরে। এভাবেই খুনিরা তাদের হত্যাকাণ্ডের সামাজিক বৈধতা অর্জন করে নিয়েছেন। তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে ব্লগাররা মানুষ নন, নাস্তিক; তাদের মেরে ফেলাই শ্রেয়। রাষ্ট্র আর তার নাগরিকদের এই নীরবতার ফলে একের পর এক রক্তমাখা লাশ দেখেছি আমরা।

একটি ব্যক্তিগত বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে, গত বছর ফয়সল আরেফীন দীপন যখন আক্রান্ত হলেন তখন আমি মতিঝিলের পুরনো গণমাধ্যমে ছিলাম। ঘটনাস্থল থেকে আমাদের একজন সহকর্মী জানালেন দীপন মারা গেছে, অফিস থেকে যিনি ফোনে নিউজটি নিলেন তিনি ছিলেন দীপনের পরিচিত। হঠাৎ এমন সংবাদে তিনি চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি, কিন্তু কান্না লুকিয়েই তিনি নিউজটি আপডেট করে যাচ্ছিলেন। এমন করুণ ঘটনা দেখার পর অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এরপর যা দেখলাম তা হয়তো অনেক বাঙালিই মনে পুষে রাখে। অফিসের নীচের চায়ের দোকানদার উচ্চস্বরে বলছেন, ‘নাস্তিক মরে গেছে ভালই হয়েছে’। একজন মানুষ মারা গেছেন, যাকে এই দোকানদার চিনেনই না তাকে তিনি কীভাবে নাস্তিক বলতে পারেন? এজন্য অবশ্য এই দোকানদারকে দোষ দিলে লাভ হবে না। সমাজের কোনো পক্ষ এ ধরনের ধারণা না ছড়ালে একজন মানুষ মারা যাওয়ার ২ মিনিটের মধ্যে এমন সাধারণীকরণ মন্তব্য তিনি করতে পারতেন না। সে কারণেই বলা যায়, এই সমাজের কেউ কেউ প্রতিনিয়ত এমন উগ্র বিশ্বাসকে ছড়িয়ে যাচ্ছেন দেশব্যাপী, যা হত্যাকাণ্ডকে ‘পুণ্য’ কর্ম করে তুলেছে। আর তার শক্তি এমন প্রবল যে, যারা হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তাদেরও কেউ কেউ বক্র চোখে দেখছে। এমন অনেককে বলতে শুনেছি যে, ‘আপনাকে তো কেউ মারে না? তাদের মারে কেন? নিশ্চয়ই এমন কিছু করেছে’। খুনিদের প্রতি এই যে অন্ধ বিশ্বাস, এটিই জাতিকে এক মহা অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

অথচ নিজেরা নিরাপদ আছি ভেবে আমরা খুন হওয়া ব্যক্তিদের দোষারোপ করে গেলাম। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিও যখন বারবার বলে উঠেন, ‘ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না’, তখন খুন হওয়া ব্যক্তিরাই অপরাধী হয়ে উঠেন। কিন্তু ধর্মের যে অপব্যবহার হচ্ছে, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যে উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে; এর লাগাম টানবে কে? তাদের বিরুদ্ধে কি ৫৭ ধারার ব্যবহার করবে না আইনশৃঙ্খলাবাহিনী?

ধারাবাহিকভাবে ব্লগারদের খুন করার মাধ্যমে আরেকটি খুনের বৈধতা পেয়ে যায় উগ্রপন্থিরা। সেটি হল ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের খুন করার বৈধতা। কারণ ব্লগারদের কেন্দ্র করে সামাজিক যে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মাধ্যমে ধর্ম বিশ্বাসীদের মস্তিষ্ককে আরও বেশি উগ্র করে তোলা হয়েছে। তাদেরকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি উস্কে দেওয়া হয়েছে। ফলে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হতে লাগলেন ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের লোকজন।

কিন্তু এত যে রক্তপাত, এত যে প্রাণহানি; তারপরও রাষ্ট্রের বোধোদয় হয়নি। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তিগুলো এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করল। জঙ্গিবাদের মুলোৎপাটন না করে তারা একে অন্যের দোষ দিয়ে পক্ষান্তরে খুনিদেরই মদদ দিচ্ছে। ফলে রাজপথে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে কাচকলা দেখিয়ে প্রকাশ্যে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারে খুনিরা। রাজনৈতিক বিতর্কের ফাঁকে তারা চলে যায় পর্দার আড়ালে। আর ক্ষমতার ভারসাম্যে আমাদের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর যে বিদেশমুখিতা, তাকে কাজে লাগাতেই এখন বিদেশিদের হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছে খুনিরা। উদ্দেশ্য একটাই, আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসে বৈশ্বিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সাথে হাত মেলানো। আর এ সুযোগে বিদেশি চাপে রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসলে, সেটি খুনিদের জন্য শক্তিকে আরও জোরদার করবে। তাই এই ঝুঁকিপূর্ণ ইস্যুতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক ব্লেম গেম বন্ধ হওয়া উচিত। এভাবে খুনিদের রাজনৈতিক বৈধতা দিতে থাকলে তা জঙ্গিদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালীই করবে। যা তাদেরকে আগামী দিনের রাজনৈতিক নির্ধারক হওয়ার সব পথ প্রশস্ত করে দিবে।

অনেক হয়েছে, এখন বোধহয় প্রতিরোধের সময় এসেছে। সেই প্রতিরোধ হতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে, রাজনৈতিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে- সর্বোপরি সামাজিকভাবে। এ কঠিন মুহূর্তে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে যেমন কঠিন হতে হবে, তেমনি জনগণকেও সচেতন হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সেই সচেতনতা তৈরির কাজটি করতে পারে সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে। অন্যদিকে ধর্মকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে কেউ যেন উগ্রপন্থাকে ছড়িয়ে দিতে না পারে সেজন্য দেশের আলেমদেরও এগিয়ে আসতে হবে। রাজনীতি আর ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠলেই কেবল সম্ভব জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো। অন্যথায় এক ভয়াবহ ভবিষৎ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

লেখক : সাংবাদিক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।