হাসপাতালগুলোতে নার্স-সহকারীদের দৌরাত্ম্য

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

হাসপাতালগুলোতে নার্স-সহকারীদের দৌরাত্ম্য

বিভাস ৩:০১ অপরাহ্ণ, জুলাই ০১, ২০১৬

হাসপাতালগুলোতে নার্স-সহকারীদের দৌরাত্ম্য

সেবক বা সেবিকার আক্ষরিক অর্থ ‘সেবাকারী’ অথবা ‘শুশ্রূষাকারী’ হলেও, আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে যেন এর ভিন্ন চিত্রই বেশি। একজন মানুষ শারিরীকভাবে অসুস্থ বোধ করার কারণেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার মৌলিক অধিকারের একটি। কিন্তু চিকিৎসক পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসকের সহকারী বা যিনি রোগীর অ্যাপয়নমেন্ট নেন তারা রোগীকে নানা ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। কম-বেশি সবাইকেই এই হয়রানির মুখোমুখি হতে হলেও, আর্থিকভাবে অসচ্ছ্বল রোগী বা তার পরিবারের সদস্যরাই এ ধরনের ভোগান্তির শিকার বেশি হয়।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল  বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, জাতীয় হৃদরোগ ইনিস্টিটিউটসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ঢুকলেই দেখা যাবে এই একই চিত্র। সর্বত্র নার্স-আয়া-ওয়ার্ডবয় ও সহকারীদের দাপট। এদের ব্যবহারে অপদস্থ হয়ে অনেকেই সরকারি হাসপাতালের আশা ছেড়ে দিয়ে অধিক অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর সেই সুযোগও থাকে না, ফলে গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো নানা হয়রানি সহ্য করেও সরকারি হাসপাতালেই পড়ে থাকছেন।

শুধু সরকারি হাসপাতালগুলোতেই নয়, চিকিৎসকের সহকারীর হাতে লাঞ্ছনার ঘটনা অনেক প্রাইভেট হাসপাতালেও হর-হামেশাই ঘটছে। সাধারণত চিকিৎসকের সিরিয়াল নেওয়ার জন্য একটি নাম্বার উল্লেখ থাকে, যেখানে ফোন করে রোগী দেখানোর জন্য সিরিয়াল দেওয়া হয়। এই কাজটি করার সময় অধিকাংশ চিকিৎসকের সহকারীরাই হেরফের করে থাকেন। সিরিয়াল ঠিকঠাকমতো দেওয়ার পরও শুধুমাত্র টাকা খাওয়ার জন্য সিরিয়ালবিহীন রোগীকে চিকিৎসকের চেম্বারে আগে ঢুকিয়ে দেন এবং সিরিয়ালটাও তার ইচ্ছামতোই পরিচালনা করেন।

গত ১৬ জুন ‍রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল হাসপাতাল-এ একজন মৃত্যু শয্যাশায়ী রোগীর ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনীরা তাকে শেষবারের মতো দেখতে এলে হাসপাতালের ‘ই-ব্লক’ এর পাঁচ তলার মহিলা ওয়ার্ডে যাওয়ার পথটির মূল ফটক বন্ধ ছিল। এদিকে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক, বারবার চেষ্টা করেও নার্স, ওয়ার্ডবয় বা কর্তব্যরত চিকিৎসকের দেখা মিলছিল না। রোগীর স্বজনদের বারবার আকুতি-মিনতির ফলে দায়িত্বরত একজন নার্স ঘুম থেকে ওঠে এসে প্রথমে গেট খুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। চিৎকার চেঁচামেচির এক পর্যায়ে গেট খুলে দিলেও ততক্ষণে সেই রোগী তার শেষ নিঃশ্বাস ফেলে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেষবার দেখা না হওয়ার যন্ত্রণা, ওই নার্স আদৌ বুঝতে পারবেন কী?

এ রকম ঘটনা কেবল এই একটাই না। প্রতিদিন প্রতিটা সরকারি হাসপাতালে এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটেই চলছে, যার কোনো সঠিক প্রতিকার পাওয়া যায়নি। যে সময়, যে নার্স বা ওয়ার্ডবয়ই দায়িত্বে থাকুক না কেন তাদের কাজ প্রতিটা সময় রোগীর অবস্থা নিরীক্ষণ করা, দায়িত্ব রেখে ঘুমাতে যাওয়া নয়। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে রোগীরা ক্রমাগত এ ধরনের হয়রানির শিকার হতে থাকলে, অচিরেই চিকিৎসা খাত এক ভয়াবহ প্রশ্নের সম্মুখীণ হতে বাধ্য।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও