বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চায় ভাষিক রাজনীতি

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চায় ভাষিক রাজনীতি

লুৎফর রহমান সোহাগ ৯:১১ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০১৬

বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চায় ভাষিক রাজনীতি

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলমান। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ধর্মচর্চা করেন আরবি ভাষায়, যাদের অধিকাংশই ভাষাটি ভাল করে বোঝেন না। ফলে ধর্মের প্রকৃত অর্থের তুলনায় এদেশের মুসলিমদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে অনেক গল্পগাথা। আবার সে সুযোগে অনেকেই সুবিধা অনুযায়ী ধর্মের বিভিন্ন নিয়ম বর্ণনা করেছেন। যার ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে নানা ধরণের মতবাদ দেখা যায়, কেউ কেউ আবার জড়িয়ে পড়ছেন উগ্রপন্থায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মের নামে বিশ্বব্যাপী চলছে নানা ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, কিন্তু কোনো ধর্মই এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশে অব্যাহত গুপ্তহত্যা ও জঙ্গি তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে এক লক্ষাধিক আলেম এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ফলে এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায়, ধর্মকে ভালভাবে না বোঝার কারণেই এক ধরণের অপশক্তি ধর্মের অপব্যখ্যা দিয়ে অনেক নিরীহ মানুষকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। নিজ ভাষায় সঠিকভাবে বুঝে ধর্মচর্চা করলে এ ধরণের সুযোগ পেত না উগ্রপন্থীরা। কিন্তু ধর্মের প্রতি অধিকাংশের অজ্ঞতা থাকার কারণেই সহজেই তাদের বিপথগামী করার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী।

না জেনেই ভক্তি করার যে প্রবণতা আমাদের মানসপটে ঠাঁই নিয়েছে, তার একটি উদাহরণ হতে পারে ২০১৫ সালের মে মাসে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রচারিত ভিডিও বার্তাটি। দুই মিনিটের ওই বার্তায় মন্ত্রীর বক্তব্যসহ ঢাকা শহরের কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে আরবিকে পবিত্র ও দেশের দ্বিতীয় স্ট্যান্ডার্ড ভাষা উল্লেখ করে দেখানো হয়, রাস্তার পাশে ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ’, ‘এখানে প্রস্রাব করলে ৫০ টাকা জরিমানা’ ইত্যাদি লেখা থাকলেও সবাই সেখানেই মূত্র ত্যাগ করছেন। কিন্তু একই স্থানে আরবি লিখে দেওয়ার পর দেখা গেল কেউ মূত্রত্যাগ করছে না, অথবা কেউ না দেখে করে ফেললেও অনুশোচনা করে সালামের ভঙ্গিতে কপালে হাত তুলে চলে যাচ্ছেন।

ভাষাগতভাবে আমরা অন্ধ হওয়ার কারণে ধর্ম মন্ত্রণালয় রাজধানীতে দেয়ালে মূত্রত্যাগ ঠেকাতে আরবি লিখনও করেছিল। সমালোচনা হলেও এটা বলতে হবে, বাঙালি মুসলমান বাংলা নির্দেশনা না মানলেও, যততত্র লেখা আরবিকে সম্মান জানাতে জানে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল- কি লেখা হয়েছে তা তারা বোঝেন না। কারণ বিষয়টি বোঝাতে ওই ভিডিওতে আরবির পাশাপাশি বাংলায় লেখা ছিল, ‘১০০ হাত দূরে মসজিদ’।

ছোটবেলায় গ্রামাঞ্চলে আরবি পত্রিকার দেখা মিলত মাঝেমধ্যেই। এসব পত্রিকার কোনো ছিন্ন অংশও রাস্তায় বা কোথাও পড়ে থাকলে, বাবা-মা সন্তানকে দিয়ে তা সেলাম করিয়ে সযত্নে রাখার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু তারা এটা বোঝেননি, এ ভক্তি করা ভাষাটি কোনো বিনোদন সংবাদের ভাষাও হয়ে থাকতে পারে। এই যে অন্ধ অনুকরণ, তা এক ধরণের অজ্ঞতাও। আর সেই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েই অনেকে আমাদের দুয়ারে বিপথগামী হওয়ার বার্তা নিয়ে আসে ধর্মের মোড়কে। আর আমাদেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ সে ডাকে সাড়া দিয়ে ধর্মকে বিতর্কিত করে যাচ্ছে।

জুমার নামাজ, ঈদের নামাজের পূর্বে ও পরে দেশে ইসলামী নানা বিষয়ে বক্তব্য (খুতবা) তুলে ধরেন ইমামরা। শহরে অঞ্চলে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও দেশের সিংহভাগ অঞ্চলে আরবিতে এ খুতবা দেওয়া হয়। এসব খুতবা কতজন মানুষ গ্রহণ করতে পেরেছে তা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা কখনোই দেখা যায়নি ইমামদের মধ্যে। ফলে ইসলামের যে বার্তা তারা প্রচার করতে চান তা অনুধাবনের বাইরেই থেকে যায় সাধারণ মানুষের।

ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ চর্চা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অনেকটা কৌশলগতভাবে অব্যাহত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ইমাম নিজেকে প্রশ্নের উর্ধ্বে রাখতে চান; তার ভুলত্রুটি, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, বক্তব্যের সাথে ব্যক্তিজীবনের অমিল আড়াল করতে চান। ফলে গুটিকয়েক আরবি জানা আলেমদের হাতেই ইসলামী নেতৃত্ব সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অন্তত ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একজন সাধারণ মানুষ ইসলামী বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে ঐসব আলেমদের ভুলত্রুটি যৌক্তিকভাবে তুলে ধরলেও তারা তা মানতে নারাজ। যৌক্তিকভাবে এবং ধর্মীয় বিধি-বিধানের মাধ্যমে ইসলামের সঠিকতা নির্ণয়ের পরিবর্তে এরা সবকিছুতেই শেষ পরিণামের ‘শাস্তি’ তুলে ধরতে আগ্রহী হন। তারা যুক্তিতে ইসলামের প্রকৃত তথ্য অনুধাবন করার চেয়ে অনেক বেশি ‘ইমান নষ্টের’ আশঙ্কায় ভোগেন।

গ্রাম-শহর ভেদে সবখানেই শীতকালে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের (ওয়াজ) প্রচলন রয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে উর্দু-ফার্সি পংক্তি ব্যবহার করা হয়। আর সে ভাষা শ্রোতাদের না বোঝার মাধ্যমেই বক্তা নিজেকে নেতা হিসেবে অনুধাবণ করেন।

এ ভাষা আনুগত্যকে সাদা চোখে দেখলে এর সামগ্রিক প্রভাবকে অস্বীকার করা হবে। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও, সৌদি আরবে হজ দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখার কারণে ‘ধর্মীয়’ প্রতিরোধের মুখে পড়েছি। তারা বিষয়টিকে গুটিকয়েক ব্যক্তির অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখতে চায়নি, উল্টো স্থানটি সৌদি আরবের হওয়ায় একে ধর্ম অবমাননা হিসেবেই বিচার করেছেন। ইসলামে যে অন্যায়, অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের কথা বলা হয়েছে, তা আরবির পরিবর্তে বাংলায় জানতে পারলে তাদের এ মানসিকতার পরিবর্তন হতে পারতো।

অবস্থা এমন হয়েছে, এখনো অনেকে বাংলাকে নিজের ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক ভাবেন। তাদের অনেকের ধারণা বাংলা হিন্দুদের ভাষা । কিন্তু তারা এটি বুঝতে চান না ইসলাম আসার পূর্বেই আরব উপদ্বীপে আরবি ভাষা উন্নত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল, আর এর চর্চা করতো কাফেররা। এদেশে হিন্দী সংস্কৃতির বিকাশের আমি প্রচন্ড বিরোধী হলেও একথা বলতে হবে, হিন্দী আগ্রাসনের প্রতিবাদের আড়ালে আমরা ধর্মের মোড়কে আরবি-ফার্সি ভাষাকে ‘পুণ্য’ হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছি। ৪৭’র দেশভাগের পর  আরবি হরফে বাংলা লেখার দাবি তুলেছিলেন অনেক জাতিগতভাবে বাঙালি কর্তাব্যক্তিরাই।

নিজ ভাষায় ধর্মচর্চার প্রচলন তেমন না থাকায় অনেকেই তাদের ধর্মগ্রন্থ ঠিকমতো বোঝেন না। ধর্মগ্রন্থ সঠিকভাবে অধ্যয়ন না করায় সহজেই তাদের প্ররোচিত করা যায় গল্পের ফাঁদে।  ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতার মূলে রয়েছে নিজ ধর্মকে ভালভাবে না জানা। আর এ না জানার পিছনে ব্যবহার করা হয়েছে ভাষার রাজনীতিকে।

সেজন্যই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যতটা না বাংলার ব্যবহার হয় তারচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আরবি-উর্দু-ফার্সি ভাষা। এসব ভাষার ব্যবহারে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু প্রশ্নটি ভিন্ন জায়গায়। ধর্ম যদি গণমানুষের জন্য হয়, আর তা যদি নিজ ভাষায় চর্চার সুযোগ তেমন না থাকে তাহলে এ মানুষগুলো কি বুঝবে? আর না বুঝলে মানুষ ধর্মীয় জ্ঞান কীভাবে অর্জন করবে?  আমরা কি শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানী, ওয়াহাবী, হানাফী, শাফেয়ী, আহলে সুন্নতের ভেদাভেদ ভুলে সাম্যের স্বপ্ন দেখতে পারবো? এ সমস্যা সমাধানে আলেমদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তারাই পারেন গণমানুষের কাছে মাতৃভাষার মাধ্যমে ধর্মের সঠিক ব্যাখা তুলে ধরতে, যাতে করে সাধারণ মানুষদের কেউ ভুল পথে প্ররোচিত করতে না পারে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও