কল্পিত সংবাদ ও কাটতি বাড়ানোর সাংবাদিকতা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

কল্পিত সংবাদ ও কাটতি বাড়ানোর সাংবাদিকতা

লুৎফর রহমান সোহাগ ৫:২৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০১৬

কল্পিত সংবাদ ও কাটতি বাড়ানোর সাংবাদিকতা

তথ্য-প্রযুক্তির জোয়ারে আমাদের প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বহু আগেই। নগরমুখী বাস্তবতায় খেলাধুলা, প্রাণবন্ত আড্ডা এখন বড় সেকেলে হয়ে পড়েছে। ফলে আমাদের ব্যস্ততা আর ব্যক্তিগত জীবনের প্রদর্শনীর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। আর এই উন্মুক্ত মিথস্ক্রিয়ায় বেড়ে উঠছে যে অস্থির প্রজন্ম, তাদের অনেকের কাছেই তাৎক্ষণিক তথ্য জানাটা এক মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। সে কারণেই প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর টিকে থাকার অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ দেয়াল, ও দেয়াল বেয়ে আমাদের দোরগোড়ায় প্রতিনিয়ত অজস্র সংবাদ এসে জড়ো হয়।

পরিবর্তিত এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় গণমাধ্যম কি আমুল বদলে যায়নি? গণমাধ্যম নিয়ে প্রথম দিককার গবেষণায় ভাবা হত গণমাধ্যম যা দেয়, দর্শক-শ্রোতা, পাঠক তাই গ্রহণ করে। কিন্তু দ্রুতই সে ধারণা বদলে যায়। আর বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় তা পুরোই উল্টো হয়ে গেছে। কারণ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখন ‘পাঠক খাবে’ ধরনের সংবাদ তৈরিই গণমাধ্যমের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। সে সংবাদ পাঠক নিজে গিলে, অন্যকে গিলাতে চায়; আর লাইক-শেয়ারের বন্যায় সানি লিওনরাও গণমাধ্যমের ত্রাতা হয়ে উঠে। এই আগাছা সংস্কৃতির সর্বশেষ বলি হলেন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের প্রয়াত স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু।

স্ত্রী হত্যার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুক্রবার রাতে বাবুল আক্তারকে তার শ্বশুরের বাসা থেকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। সাম্প্রতিক গুম-খুন আর ক্রসফায়ারের মতোই এ ঘটনা এক ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা সে উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলে বহুগুণ। একদিকে স্ত্রী হারানো, অন্যদিকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান- বাবুল যেন অনেকের মানসপটে নায়কসুলভ ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, সেখানে বাবুল আক্তারের ভাবমূর্তি অবশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গভীর রাতে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেকেই মানতে পারছিলেন না। তারা সরকার ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেন। ফেসবুকের নিউজ ফিড ভরে যায় বাবুল আক্তারকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায়। অনেকেই তার ভবিষৎ নিয়ে ‘ফাঁসানো’ ধরনের আশঙ্কার কথা প্রকাশ্যেই বলে দিয়েছেন। অনেকে আবার টেনে এনেছেন বহুল আলোচিত তনু হত্যার প্রসঙ্গও। যেখানে তনুর মা দুইজন সেনা সদস্যের বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করার পরও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, সেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে গভীর রাতে ডেকে পাঠানোকে অনেকেই ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখেছেন। বাদ যায়নি পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ যে বাবুলের প্রতি রুষ্ট ছিলেন, সে তথ্যও বেরিয়ে আসে।

এ ধরনের আশঙ্কা আর বাবুল আক্তারের স্তূতিপাঠে যারা ব্যস্ত ছিলেন, শনিবার দুপুরেই তারা পাল্টা ধাক্কার মুখোমুখি হন। একটি অনলাইন গণমাধ্যম আর একটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে মিতুকে জড়িয়ে পরকীয়ার গল্প বের হয়। সেখানে খুনি হয়ে উঠেন স্বয়ং বাবুল আক্তার! এতদিন বাবুল আক্তার নামে যে সৎ সাহসী পুলিশের চিত্র ভেসে উঠতো, তা যেন এক লহমায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠল! ফলে কেউ কেউ চুপসে গেলেন, কেউ কেউ আবার পাল্টা ক্ষোভ উগরে দিলেন। অন্যদিকে যে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমরা বাবুলকে বীর আখ্যা দিয়েছিলাম, তারা যেন এমন খবরের অপেক্ষাতেই ছিল। ফলে মুহূর্তেই একটি খবরের দখলে চলে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক যাই হোক, সেই গণমাধ্যম গোষ্ঠীর পাঠক সংখ্যা এমন হু হু করে বাড়তে থাকে যে অনলাইন নিউজ পোর্টালটিতে ঢুকতেই বেশ সমস্যা হচ্ছিল। আর অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও কয়েকটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে সেই সূত্রহীন নিউজটিই হুবহু কপি-পেস্ট হতে লাগল। সাংবাদিকতায় দায়িত্বহীনতা কত ভয়ঙ্কর পর্যায়ে নেমে এসেছে এটি তার এক দৃষ্টান্ত।

বিষয়টি মিতু পরকীয়ায় জড়িত ছিলেন না কিংবা বাবুল আক্তার খুন করেননি; এমন আপেক্ষিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ না। বরং গণমাধ্যমের পেশাদারিত্বের সংকটকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কারণ প্রথমত কোনো সূত্র ছাড়াই একজন মৃত মানুষের চরিত্র হনন করা হয়েছে, দ্বিতীয়ত এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে বাবুল আক্তার বা দায়িত্বশীল কারোর বক্তব্য নেওয়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করেনি ওই গণমাধ্যম। খুনের আরেক পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাবুলের চাচাতো ভাই সাইফুলকে খুঁজে পেলেও এ মিডিয়া চট্টগ্রামের দামপাড়ার ওই কথিত ব্যবসায়ীর পরিচয় প্রকাশ করতে পারেনি। আর সংবাদটি প্রকাশ করার পর তা সরিয়ে নিয়ে গণমাধ্যমটি প্রমাণ করেছে তাদের সংবাদটি কল্পিত ছিল। এমনকি সংবাদটি সরিয়ে নিলেও পাঠকের কাছে দু:খপ্রকাশ করার মত কিংবা কোনো ব্যাখ্যা প্রদানের সৌজন্যটুকু প্রদর্শন করেননি তারা। ফলে এ ভুলকে ‘তাড়াহুড়োর ভুল’ না বলে পরিকল্পিত বলাই শ্রেয়। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও উঠে আসে, বাবুল আক্তারের চরিত্র হনন করে মূল ঘটনা আড়াল করতে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে না তো? তার সাথে খোদ পুলিশের কেউ জড়িত নয় তো?

অবশ্য মিতুর পরকীয়া তত্ত্বের উৎস মাধ্যমটি তাদের সংবাদ সরিয়ে নিলেও অনেক নামসর্বস্ব অনলাইন এখনো সেই কপি নিউজটি বহাল তবিয়তে রেখে দিয়েছে। তাদের সে সংবাদ সরানোর প্রয়োজনও নেই, কারণ এরচেয়ে ভয়ঙ্কর অনেক কল্পিত সংবাদ তারা নিজেরাই তৈরি করেন। সম্প্রতি ব্লগার, পুরোহিত হত্যার মন খারাপ করা সংবাদগুলো যখন একগুয়ে হয়ে পড়ছে, তখন তারা নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। কিছু মৃত্যুর সংবাদ থাকে, যা দেখে আমরা আতকে উঠি; আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই। কিছু কিছু মানুষ আমাদের ভাবনার জগতে এতটাই জায়গা করে নেন যে, তাদের সবকিছুই আমাদের অনুভূতিকে নাড়িয়ে দেয়। ব্যক্তির প্রতি গণমানুষের এই যে আগ্রহ, তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের ‘মৃত্যুমুখী সাংবাদিকতা’, বলা ভালো অপসাংবাদিকতা। ফলে হুটহাটই দেখা যায়, ববিতা মারা গেছেন, অমিতাভ বচ্চন মারা গেছেন। কাটতি বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কল্পিত সংবাদ তৈরি হচ্ছে, এর বিনিময়ে অনেক সেলিব্রেটিই মরার আগে বহুবার মরে যাচ্ছেন। এই অসৎ সাংবাদিকদের টিকে থাকার পিছনে কি রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা নেই? গত বছরের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সাথে ‘বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন’ নামের একটি সংগঠনের নামে অনেক নামসর্বস্ব অনলাইনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেছিলেন। ওই সংগঠনের সভাপতি আবার জাতীয় অনলাইন নীতিমালা কমিটির সদস্য ছিলেন, যার নিজের অনলাইনেই কয়েক সপ্তাহ পরপর সংবাদ আপডেট হয়। আর গত কয়েকবছরে গুটিকয়েক অনলাইন তাদের অবস্থান জানান দিলেও, এবার আঠারো শতাধিক অনলাইন নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। সেখানে নামসর্বস্ব কত অনলাইন নিবন্ধনের সুযোগ পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।  

সংবাদপত্রে এলিট শ্রেণীর আধিপত্য আর সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণে বিকল্প মাধ্যমের স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেকেই। কিন্তু তথ্য-প্রযুক্তির এত বিকাশের পরও গণমাধ্যমের বাস্তবতা কীভাবে এতটা বদলে গেল? এর পেছনে রয়েছে মূলত জনপরিসরের ধারণা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সক্রিয় সদস্যরা পরদিনের পত্রিকার চেয়ে তাৎক্ষণিক সংবাদ জানার প্রতিই আগ্রহী থাকেন বেশি। সে তথ্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে নিজের অবস্থান জানান দেওয়াই তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। আর সে আলোচনার সূত্র হতেই যেন গণমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রকরা এখন তাদের সব মেধা খরচ করতে চায়। এই যে ভয়ঙ্কর যাত্রা, তার থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে গণমাধ্যম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে পাঠক। তখন আর মূল ঘটনা থেকে সরে এসে ‘মার মার কাট কাট’ শিরোনাম দিয়ে, তারকাদের নিয়ে ‘গুজব’ রটিয়েও পাঠক ধরে রাখা যাবে না।

লেখক : সাংবাদিক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও