যেন অচেনা এক বাংলাদেশ!

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

যেন অচেনা এক বাংলাদেশ!

মোহাম্মদ আলী ৩:২৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৩, ২০১৯

যেন অচেনা এক বাংলাদেশ!

টেলিভিশনে নিয়মিত টক শো দেখার অভ্যেস, তাই সম্প্রতি একটি টক শো দেখছিলাম ; সেই শো'এর সঞ্চালক এক পর্যায় বলেই ফেললেন যে, বঙ্গবন্ধু তার ক্ষমতার মেয়াদ কালে নাকি প্রায় পঁয়ত্রিশ জনের মতো এমপিকে  দুর্নীতির দায়ে মামলা- মোকদ্দমা ও বিচারের মুখোমুখি করেছিলেন। তথ্যটি আমার জানা ছিলনা কিন্তু সঞ্চালক বলে কথা, তাই সেটা ষোলআনা মেনে নিতে হলো এবং বুকটাও গর্বে ভরে উঠল। বলাবাহুল্য, সে সময় বোধকরি বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লব (বাকশালের প্রস্তুতি পর্ব) চলছিল যেটি নিজের মধ্যে নিজেই একটি মহা জাতীয় শুদ্ধি অভিযানেরই বিপ্লবী পদক্ষেপ ছিল বললে ভুল বলা হবেনা। এ প্রসঙ্গ তোলার অর্থ হলো এই যে, আমাদের এ ছোট্ট দেশটিতে তিনশত নির্বাচিত এবং প্রায় অর্ধশত অনির্বাচিত সংসদ সদস্য যারা তার নির্বাচনী আসনই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিটি গ্রামেরও নাড়ি-নক্ষত্র থেকে ইস্তক হাড়িরও খবর রাখেন বলে সকলের ধারনা; তা নাহলে সে আবার কিসের জনপ্রতিনিধি--মাটি ও মানুষের নেতা, গরীবের বন্ধু ইত্যাদি.... ইত্যাদি । 

আর এ জাতীয় বিশেষণ তো নিত্যদিন -হর হামেশা- সকাল-সন্ধ্যা রাজপথে, মাঠে-ঘাটে, মাইক্রোফোনে শুনে শুনে নাগরিক মাত্রেরই কর্নকুহর প্রায় ঝালাপালা।  কিন্তু তার পরেও সে সব বিশেষণ, ও অলংকরণ শুধুমাত্র যে শুনে যেতে হবে তা নয়, বরং নীরবে ক্রীতদাসের মতো মুখে হাসি ফুটিয়ে শ্রবণ ও গলধরণ করা ছাড়া জনগণের আর কোনো গত্যন্তরই বা কোথায়?    

বস্তুত, আজকের মতো বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে সংসদ সদস্যদের এত ক্ষমতা, এত আর্থিক বরাদ্দ, এত প্রশাসনিক- খবরদারি, এত আমলা ও পুলিশ প্রটোকল ছিল বলে মনে পড়ে না। তাছাড়া এতসব প্রতিপত্তি থাকলে সাধারণ জনগণের প্রতি জনপ্রতিনিধিসুলভ নৈকট্যবোধটুকু এমনিতেই কমে যায় এবং তদস্হলে দূরত্বটাই বরং বাড়তে থাকে। আজকাল আবার সিনিয়র রাজনীতিকদেরকে সম্বোধন করে তৃণমূল কর্মীরা কেউ বলেন নেতা বা লিডার আবার কেউ বলেন ভাই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের এই ভাই ও লিডারগণ বেশিরভাগই ঢাকাবাসী কিংবা হোটেলবাসী হওয়ায় নির্বাচকমন্ডলী ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই মূলত: তাদের বিচরণ ও ব্যস্ততা। কি বিএনপি, কি আওয়ামী লীগ, কি জোট সরকার বা ওয়ান ইলেভেন সব ধরনের সরকার গুলোর সময়কালে ওই একই দৃশ্য দেখতে হয়।  এলাকা ও তৃণমূলের কর্মীদের কাছে যখনই খবর এল যে নেতা বা ভাই ঢাকা থেকে আসছেন- ব্যস, শুরু হয়ে গেল হৈ হৈ, রৈ রৈ। আওয়ামী লীগ আমল হলে সেখানে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ,শ্রমিক লীগ, মৎস লীগ, তাতী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ,ম হিলা যুবলীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী সহ বিস্মৃত অসংখ্য আবার বিএনপি আমল হলে গুনে গুনে সম সংখ্যক অঙ্গ-সহযোগী, এবং সেই সঙ্গে সহ, উপ, কিংবা যুগ্ম মর্যাদারও সম্পাদক মন্ডলীদের গাড়ি-ঘোড়া নিয়ে সে-কিযে ছোটাছুটি, মনে হয় "রাজা এল শহরে -- সেজে গুজে চল রে" এমন একটি সাজ-সাজ রব,  তখন  কার কথা কে শোনে ধুলায় অন্ধকার। এরপর বিমানবন্দর, নৌ বন্দর, কিংবা ফেরিঘাট যাই হোকনা কেন সেখান থেকে বাসভবন অবধি ভাই বা নেতাকে পৌঁছে দিয়ে আবার মধ্যরাত অবধি তার সাথে চলে নিজেদের রোজনাম চা ও কর্ম বিবরনী নিয়ে আলোচনা --পর্যালোচনা, ---চলে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ---পাল্টা অভিযোগের ফিরিস্তির শুনানি; রাত ক্রমশ: বাড়তে থাকে আর এরই ফাঁকে-ফাঁকে ক্লান্তি বিজড়িত ভাইয়ের থেকে থেকে ঝিমুনি দেয়া চলতে থাকে। এটা দেখে তখন সহকর্মীরা নিজেরাই আবার হতোদ্যম ও অতৃপ্ত মন নিয়ে সে রাতের মতো ভাইকে নিষ্কৃতি দিয়ে যার যার বাড়ি ফিরে যায়। এদিকে সত্যিকার অর্থে মাটি নেড়েচেড়ে খাওয়া এবং সমস্যাপীড়িত কর্মজীবনের দু'একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য আসা মানুষগুলো ভক্ত পরিবেষ্টিত অদৃশ্য দেবতার চরণ ছুতে না পেরে দূর থেকেই প্রণাম জানিয়ে বিদেয় হয়ে যায়। আমি জানি, বাংলাদেশের রাজনীতির এই চালচিত্র আঁকতে গিয়ে অনেকের রোষানলে পড়তে হতে পারে, অনেকের গাত্রদাহ হতে পারে কিন্ত তারপরেও রাজনীতি যে আজ জন কল্যাণের স্হলে সুবিধাবাদ ও সুবিধাবাদীদের একটা আদর্শ মৌচাকে পরিণত হয়েছে, এমনকি বঙ্গবন্ধুর মতো এক কালজয়ী জনপ্রিয় নেতা-- তাকেও তার অতি প্রিয় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জনগণ ও সরকারের মাঝে যে দুর্লঙ্ঘ এক দেয়াল তৈরী করা হয়েছিল আজও সেই একই ধরনের একটা চিত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের রাজনীতি যে আজ দুর্বৃত্তায়িত হয়ে দেশটাকে দুর্নীতিবাজদের একটা স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে সেটা আমরা আম জনতা যেমন দেখে দেখে শংকিত তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও যে সে উত্তাপ স্পর্শ করেছে সেটা তার সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা থেকেই বোঝা যায়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিত্যদিন গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য বিবৃতি থেকেও আমরা সেই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। দুর্নীতিবাজ যেই হোক কাউকে ছাড় নয়; চুনো পুটি ধরেছি-রাঘব বোয়ালরাও রেহাই পাবেনা; চিহ্নিত চাদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, এক কথায় যাদের ইমেজ খারাপ সে সব অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরী এবং তৃণমূল পর্যন্ত সে তালিকা চলে এসেছে-- অতএব অচিরেই তাদের দল থেকে বহিষ্কার সহ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেওয়া হবে। 

দেশবাসী এতে মোটেই আশ্বস্ত হয়েছে বলে মনে হয়না। তাছাড়া অনুপ্রবেশকারী বলতে যদি জামাত-বিএনপি ও শিবির কে বোঝায় তাহলে তো এ সব দলের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে তাছাড়া অনুপ্রবেশ করার বিষয়টি যদি এত সহজ হয় তবে হয় এটি সংগঠনের  গঠনতান্ত্রিক শিথিলতা অথবা দলীয় দায়িত্ব ও পদে থাকা নেতা কর্মীরাই এর জন্য দায়ী অন্য কেউ নয়। সারা দেশে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা দেখানো হয়েছে মাত্র দেড় হাজার যাদের বেশীরভাগই তৃণমূল পর্যায়ের, অথচ ক্যাসিনো, মানিলন্ডারিং, অবৈধ ভূমিদখল,  অনাদায়ী ব্যাংক লোন থেকে শুরু করে আমলা-কর্মচারীদের ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে হাজারো লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও সেকেন্ড হোম বানানোর সাতকাহন শুনে শুনে দেশবাসী কেবলই ত্যক্ত ও হতাশাগ্রস্ত।

লেখক: সংস্কৃতি কর্মী

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও