‘রিকশা চালান কোনো বালা পেশা না আপা, সরকার বালাই করছে’

ঢাকা, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯ | ২৪ কার্তিক ১৪২৬

‘রিকশা চালান কোনো বালা পেশা না আপা, সরকার বালাই করছে’

ইশরাত জাহান আঁখি ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৯

‘রিকশা চালান কোনো বালা পেশা না আপা, সরকার বালাই করছে’

ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালান লিটন। বয়স তার ত্রিশ। এর মধ্যে বিশ বছরই কেটেছে ঢাকায়। এখন ভাবছেন চলে যাবেন নিজ এলাকায়। যদিও বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। নেই কোনো সহোদর ভাই-বোনও।

রামপুরা থেকে মাদারটেক ফেরার পথে লিটনের সাথে অনেক গল্প হলো। জানলাম একজন রিকশাচালকের অনেক না জানা কথা।

‘ত্রিশ হাজার টাকা জোগাইতে পারলে আর ডাহা (ঢাকা) থাকুম না আপা। ময়মনসিংহ চইলা যামু। একটা অটো কিনা চালামু,’ বলছিলেন লিটন।

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শাহবাগ, খিলক্ষেত থেকে রামপুরা হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে এবং মিরপুর রোডে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। গত রোববার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হয়েছে।

যানজট নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রধান করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করেছে।

তিনি সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘অলিগলি বাদ দিয়ে মূল সড়কগুলো থেকে ধীরে ধীরে রিকশা তুলে দেয়া হবে। ঢাকার শহরের বর্তমান যা অবস্থা আমরা যদি ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন না করি, একটা শহর তো থমকে থাকতে পারে না। আমরা জানি যে এই ধরনের উদ্যোগে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসবে কিন্তু আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে আমরা আমাদের কাজগুলো আমরা করবো।’

সাঈদ খোকনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে লিটন জানান, ‘রিকশা চালান কোনো বালা পেশা না আপা, সরকার বালাই করছে। অনেক কষ্টের কাম এইডা, কোনো সম্মান নাই এই কামে।’

সরকার রিকশা চালকদের জন্য বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে এমন আশা করেন কি না জানতে চাইলে জানান, ‘না এমন আশা করি না। হেরা (সরকার) তো আমাগো কথা ঠিকমতো ভাবেও না। হেরা কোনদিনও আমাগো লাইগা কিছু করে নাই।’

অন্যকোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে মেয়রের এমন সিদ্ধান্তে মোটেও সন্তুষ্ট নন তিনি। লিটন বলেন, ‘দেশে যাইয়া অটো কিননের আগ পর্যন্ত তো এহানেই (ঢাকায়) থাকুম। রিকশা যদি না চালাইতে পারি তাইলে কী কইরা অটো কিনুম? অন্য কোনো ব্যবস্থা তো সরকারের করা উচিত।’

ম্যারাদিয়ার এক গলির ভেতর অনেক্ষণ জ্যামে আটকে ছিলাম। পাশেই একটি দোকানে পুড়ি-সিঙ্গারা বিক্রি করছে। লিটনকে বললাম, ‘ভাই, পুড়ি-সিঙ্গারা খাবেন?’

‘না, আপা, খামু না,’ এ কথা বলে কয়েক সেকেন্ড পরেই কী ভেবে যেন নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে পুড়ি-সিঙ্গারা কিনে এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘আপা, আপনি খান।’

আমি খেলাম, তাকেও দিলাম। খাওয়া শেষে এক দোকানের সামনে রিকশা থামিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিলেন নিঃশব্দে। আমিও নিঃশব্দে পান করলাম আর ভাবলাম, ছেলেটি বুঝতে পেরেছিল আমার ক্ষুধা লেগেছে।

বিয়ে করেছেন কিনা জানতে চাইলে একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘না, বিয়া করুম না।’ কে জানে কেন বিয়ে করবে না। এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ালাম না।

‘আপনার তো বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ নেই। মন খারাপ হলে কোথায় যান?,’ জানতে চাইলাম।

‘কোনো খানে গেলেই আর মনে শান্তি পাই না। চাইর বছর আগে মা মরার খবর পাইয়্যা গেছিলাম দেখতে। এরপরে আর যাই নাই দেশে,’ দুঃখভরা কন্ঠে বলছিলেন লিটন।

রিকশায় উঠে লিটনের সাথে গল্প শুরু করেছিলাম অজানা ভয় থেকে। গলির ভেতর দিয়ে আমি কোনো রাস্তাঘাট মনে রাখতে পারি না। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। তাই মনে অজানা ভয় কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল যদি রিকশাচালক কোনো অচেনা গলিতে নিয়ে যায়। মোবাইলটাতেও চার্জ না থাকায় বন্ধ ছিল। হাত-পা ভয়ে শিউরে উঠছিল। মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম কী করা যায়। হঠাৎ মনে হলো রিকশাচালকের সাথে গল্প করি। ওর মনযোগ যেন ভুলেও অন্য কোথাও না যায়। যেই ভাবনা, সেই কাজ। গল্প করতে করতে চলে আসলাম।

নামার সময় মনে হচ্ছিল- ‘শুধু শুধুই ছেলেটিকে ভয় পাচ্ছিলাম।’

লেখক: সংবাদকর্মী

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও