বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো: প্রেক্ষাপট স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো: প্রেক্ষাপট স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন

ডা. শারমিন আক্তার সুমি ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, জুন ০৩, ২০১৯

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো: প্রেক্ষাপট স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন

বাংলাদেশের অনেক মানুষ ইন্ডিয়া যান চিকিৎসা নিতে। আমি অনেক পরে টের পেয়েছি তারা কিন্তু সরকারি হাসপাতালে যান না। যান বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের খবর কেউ নিয়ে দেখতে পারেন। ওখানে আলাদাভাবে পে না করলে কনসালটেন্টও দেখানো যায় না।

দেশে ও বিদেশে যত ইন্ডিয়ান ফ্যাকাল্টির সাথে পরিচয় হয়েছে, বেশিরভাগই প্রাইভেট সেক্টরে কর্মরত, নিজেই সেন্টার ডেভেলপ করেছে। এমনকি অনেকে পরিচয় এর প্রথমেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন কেন আমি এখনো নিজে একটা সেন্টার দিচ্ছি না।

তাদের যুক্তি হচ্ছে সরকারি হাসপাতালে প্রচুর সিস্টেম লস, কাজ করার সুযোগ কম। সে কারণেই ওরা পাস করার পরপরই স্নাতকোত্তর ট্রেইনিং করে নিজ দেশে অথবা বিদেশে। এরপর ফোকাসড কাজ শুরু করে।

সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভিন্ন। এখানে এখনো আমরা সরকারি চাকরি করি কারণ অনেক রোগীকে সেবা দেয়া যায়, যাতে ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট হয়, জুনিয়রদের শেখানোর মাধ্যমে ও রোগীদের সেবা প্রদান করা যায় আর ভবিষ্যৎ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হয়। সেখানে এমবিবিএস করার পর আমাদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে ঢুকতেই চলে যাচ্ছে তিন/চার বছর। পাস করে বের হতে আরো কমপক্ষে ছয়/সাত বছর।

মনে রাখতে হবে যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট কিন্তু রোগীর স্বার্থেই প্রয়োজন। এবং একজন ৩০/৩৫ বয়সী ডাক্তার তার এই বয়সে যত সার্ভিস দিতে পারেন, ৫৫/৬০ বছর বয়সে ততখানি পারেন না। এখন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরি করতেই যদি এত সময় বাংলাদেশ নেয় তাহলে তার থেকে সরকার ফল বা উপকার নেবেন কখন?

দ্বিতীয়ত: চিকিৎসা কোনোভাবেই কেরানীর কাজ না যে নয়টা-পাচটা অফিস করলে হয়ে যাবে। এখানে Knowledge নিয়ত updated করতে হয়, গবেষণা করতে হয় এবং নিত্যনতুন দক্ষতা অর্জন করতে হয়। একজন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ হওয়ার পর প্রতি দিন/মাস/বছর ধরে যে ব্যাপারগুলো আয়ত্ত করতে থাকেন, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে গড়ে তুলতে থাকেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি তাকে বিকাশের সুযোগ ও পরিবেশ না দিয়ে ঢাল তলোয়ারহীনভাবে যেন-তেন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে ব্যাপারটা অনেকটাই কেমিস্ট্রির বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষককে দিয়ে প্রাইমারি স্কুলে পিটি ক্লাস করানোর মতো। না হবে জনগণের লাভ, না থাকবে শিক্ষকের মনোযোগ। সামগ্রিকভাবে, এটা আসলে জনগণের লস, সবদিক থেকেই।

আজ থেকে পনেরো-বিশ বছর আগেও স্বাস্থ্য খাত যা ছিল, এখন তার থেকে কয়েকশ গুণ বিকশিত। আমরা যা পড়িনি, শুনিনি, ভাবিনি আমাদের ছাত্রজীবনে, আমরা এখন তাই করছি। এবং স্বপ্ন দেখছি তার থেকেও অনেক গুণ বড়।

আমরা দেখছি আমাদের আর উন্নত বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থার পার্থক্য হচ্ছে সুযোগ-সুবিধা, অর্থ সংকুলান আর কঠোর সিস্টেমের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের এতগুলো খাতকে এত উন্নত করেছেন, আমি বিশ্বাস করি অচিরেই এই খাতে বাজেট বাড়বে। বাজেট বাড়লেই সুযোগ-সুবিধা অনেকখানি বাড়বে। সমস্যা হচ্ছে সিস্টেমটা দাঁড় করানো। এর জন্য প্রকৃত গবেষণা প্রয়োজন। ভুল পলিসির ফাঁদে আর যেন না পড়ে থাকে আমাদের স্বাস্থ্য খাত।

সেরকম হলে সেই দিন দূরে নয় যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা ডাক্তাররা এখন দেশেই প্রাইভেট সেন্টার করবে নয় বিদেশে চলে যাবে। আর দেশি মানুষ বিদেশে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসবে, না হয় প্রাইভেট সেন্টার থেকে উচ্চ মূল্যে চিকিৎসা নিতে থাকবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও