রমনার সবুজ নন্দনকাননে ইডেনকন্যাদের মিলনমেলা

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

রমনার সবুজ নন্দনকাননে ইডেনকন্যাদের মিলনমেলা

জিনাত জান কবীর ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ০২, ২০১৯

রমনার সবুজ নন্দনকাননে ইডেনকন্যাদের মিলনমেলা

বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলির কিংবদন্তি ঢাকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে গড়ে ওঠে একটি নারী শিক্ষাকেন্দ্র। নাম তার ইডেন স্কুল। এ স্কুলের ছাত্রী সুশীলা সেনের একটি কবিতা থেকে স্কুল প্রতিষ্ঠার বৃত্তান্ত জানা যায়। কবিতাটি এরূপ:

ছিল না বালিকা স্কুল ঢাকার শহরে

পাঠশালা বসাইলে মম শিক্ষা তরে।

ছয়টি বালিকা মাত্র প্রথম সময়

তথাপি উৎসাহে বসে কন্যা বিদ্যালয়।

থাকিতেন রাম বাবু ঢাকা সূত্রাপুর,

তথায় যেতাম স্কুলে আনন্দ প্রচুর।

তারি গৃহবাসী ছিল মেয়ে তিনজন

আমি আর অন্য দুটি, একুমে ছজন।

এই কটি ছাত্রী নিয়ে স্কুলের পত্তন,

শিক্ষক বিহারী সেন অতীব সজ্জন।

কালে এই পাঠশালা হইল উন্নত,

ই্ডেন স্কুল নামে এ বেশি বিখ্যাত।

ঢাকার বিখ্যাত ব্যক্তি দীননাথ সেনের কন্যা সুশীলা সেনের কবিতা থেকে জানা যায় যে, ঢাকায় মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য কোনো বালিকা বিদ্যালয় ছিল না। ১৮৭৩ সালে দীননাথ সেন তার মেয়ে এবং অন্য মেয়েদের শিক্ষার জন্য সূত্রাপুরে রামচন্দ্র বসুর বাড়িতে ছয়জন মেয়ে নিয়ে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই ছয়জন ছাত্রীর মধ্যে ছিলেন দীননাথ সেনের মেয়ে সুশীলা, রামচন্দ্র বসুর তিন মেয়ে এবং আরো অন্য দুই মেয়ে নিয়ে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়। এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন বিহারী লাল সেন।

১৮৭৮ সালে স্কুলটি অপর একটি মেয়েদের স্কুলের সাথে একীভূত হয়ে রূপান্তরিত হয় ঢাকা ফিমেল স্কুল নামে। একই বছর স্কুলটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং গভর্নর স্যার অ্যাসলি ইডেনের নামানুসারে এর নতুন নামকরণ হয় ইডেন গার্লস স্কুল। যদিও গভর্নর অ্যাসলি ইডেনের নামে স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে, তবুও ইডেন শব্দের রয়েছে একটি চমৎকার অর্থ। ইডেন এর আভিধানিক অর্থ নন্দন বা স্বর্গ। অর্থাৎ মনোরম স্থান।

এরপর স্কুলটি লক্ষ্মীবাজার এলাকায় কার্যক্রম শুরু করে। ইডেন গার্লস স্কুল ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম স্কুল এবং ১৮৯৬ সালে এর ছাত্রী ছিল ১৩০ জন। সরকার এটিকে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের উচ্চমান বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্কুলটি সাময়িকভাবে একটি বাড়িতে এবং কিছুদিন পর সদরঘাট এলাকায় পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের একটি বাণিজ্যিক ভবনে স্থানান্তরিত হয়।

স্কুলটিতে ১৯২৬ সালে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়। সে থেকে স্কুলটি ইডেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ নাম ধারণ করে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের উদ্যোগে কলেজটি আবদুল গণি রোডে একটি ভবনে স্থানান্তরিত হয়। ভবনটি পরবর্তীকালে ইডেন বিল্ডিং নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৪৭ সালে সরকার ইডেন বিল্ডিংয়ে নতুন প্রাদেশিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলে কলেজটি কার্জন হলের একটি অংশে স্থানান্তরিত হয়। কলেজের সাথে কামরুন্নেসা স্কুলকে একীভূত করার পরিকল্পনা অনুযায়ী কলেজটি আবার স্কুল চত্বরে স্থানান্তরিত হয়।

অবশেষে ১৯৫৮ সালে ইডেন কলেজ ও কামরুন্নেসা স্কুলের কলেজ শাখা একীভূত হয়ে বকশীবাজারে ইডেন গার্লস কলেজে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠান দুটির স্কুল শাখা একীভূত করে কামরুন্নেসা স্কুল নামে টিকাটুলিতে চালু করা হয়।

১৯৬২ সালে আজিমপুরে ১৮ একর জমির উপর গড়ে ওঠে ইডেন কলেজ। কলেজটি নতুন প্রাঙ্গণে স্নাতক কার্যক্রম চালু করে, কিন্তু এর উচ্চ মাধ্যমিক শাখা বকশীবাজারেই অব্যাহত থাকে। পর্যায়ক্রমে কলেজটির আজিমপুর শাখায় উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাস এবং বকশীবাজার শাখায় ডিগ্রি ক্লাস চালু হয়।

পরবর্তী সময়ে বকশিবাজার শাখার নামকরণ হয় সরকারি বালিকা মহাবিদ্যালয়। এরই পরিবর্তিত নাম বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ। ১৯৬৩ সাল থেকে আজিমপুরের ইডেন কলেজ একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ইডেন মহিলা কলেজ নামে পরিচালিত হয়।

দু’শো বছরের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইডেন কলেজ আজ বাংলার নারীদের শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সুপরিচিত। এই কলেজ থেকে শত শত শিক্ষার্থী দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। শিক্ষা-দীক্ষায়-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতায়-প্রশাসনে-নারীদের অগ্রণী ভূমিকার ক্ষেত্রে ইডেন কলেজের অবদান অনস্বীকার্য।

মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস। এই মার্চের প্রথম দিনে সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইডেন কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হলো। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সবুজ চত্বরে রমনা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে মিলিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ইডেন নামের সার্থক হয়েছে এই মিলনমেলায়। কেননা, আমরা ইডেনকন্যারা অর্থাৎ ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে সবুজ অরণ্যেঘেরা রমনার নন্দনকাননে।

সবুজ অরণ্যের সমাহার জুঁই-চামেলি-হাসনাহেনার সমাহারে সবুজ অরণ্য যেমন শোভিত হয়ে উঠেছে তেমনি ইডেনকন্যাদের সমাবেশে সবুজ চত্বর রমনার হয়ে উঠেছে সমুজ্জ্বল মুখরিত এক সমাবেশ। এই মিলনমেলায় প্রীতির বন্ধনে আবিষ্ট সুষমা ইডেনকন্যারা।

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই মুখরিত হয়ে উঠে রমনার সবুজ চত্বর। ৫০০ ইডেনকন্যারা ও তাদের সন্তানরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

ইডেনকন্যারা অতীতের কথা নিয়ে স্মৃতির ভেলায় ভেসে বেড়িয়েছে। প্রত্যেকেই আড্ডার ছলে আবেগ-অনুভূতি ভাগাভাগি করেছে, নিজেদের ফ্রেমে বন্দী রাখা গল্প-খুঁনসুটিতে মেতে উঠেছে। এরপর শুরু হয় প্রার্থনা। জাতীয় সংগীত পরিবেশন, স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষ হয়।

তারপর দুপুরের খাবার শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষে র‌্যাফেল ড্রয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ইডেনকন্যাদের মিলনমেলা।

দল-মত-বিভাগ-ইয়ার-হোস্টেল নির্বিশেষে সব ইডেনকন্যারা অনুষ্ঠানকে উপভোগ করেছেন। যে ইডেনকন্যারা প্রবাসে রয়েছেন তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলেছেন, দূর প্রবাস থেকে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছেন। স্মৃতি শুধু স্মৃতি। এই স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কেউবা করেছেন ভিডিও। কেউবা তোলেছেন আলোকচিত্র।

এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন ‘ইডেন লাভ’ নামের একটি সোশ্যাল গ্রুপ। ইডেন লাভ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা গণিত বিভাগের প্রাক্তণ শিক্ষার্থী বদরুন নাহার (সহকারী অধ্যাপক, সরকারি তোলারাম কলেজ)। এই সুন্দর আয়োজনের জন্য সবার পক্ষ থেকে বদরুন নাহার আপাকে অশেষ ধন্যবাদ।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, ইডেন কলেজ।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।