আবার একুশ; আমার একুশ

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

আবার একুশ; আমার একুশ

মনদীপ ঘরাই ১২:৩৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

আবার একুশ; আমার একুশ

ব্যস্ত এই জীবনে ভাষা নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? আর ভাষা নিয়ে ভাবারই বা কি আছে? এমন প্রশ্ন ভিনগ্রহের নয়। আপনার আমার চারপাশেরই। এই যে আমি লিখতে বসলাম, আমিও বা কতটুকু ভাবি ভাষা নিয়ে, মাতৃভাষা নিয়ে? উত্তর দিতে গেলে বিব্রতই হয়তো হতে হবে।

তবে, একটা জায়গাতে আমাদের সবার দারুন মিল। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা অবিচল। তা যতই সুপ্ত থাকুক না কেন। আজকে কলম হাতে নিলাম আমার চোখে মাতৃভাষাকে দেখাতে।আমার বাংলাকে দেখাতে।

গত বছরের জুলাই। ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলাম দাপ্তরিক সফরে। বিমানবন্দরে নেমেই ইন্দোনেশিয়ার ওদের জন্য দুঃখ হলো খুব। ভাষা ওদের আছে ঠিকই, বর্ণমালার হদিস নেই। ইংরেজি হরফে ওদের সব বিজ্ঞাপন, দোকানের সামনের ফলক....সবকিছু। মুহূর্তেই কোথায় যেন একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করলো, আর যাই হোক, একটা অনন্য বর্ণমালা তো আছে আমাদের। তাও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। আহা বাংলা!

ইন্দোনেশিয়ার গল্পে যখন ঢুকেই পড়েছি, তখন আরও একটু গভীরে যাই। শুরুর দিন রাতে বের হয়ে একটা ছোটখাটো খাবার দোকানে ঢুকলাম। নাম ‘বুবু দেসা’। খাস ইন্দোনেশিয়ান খাবার পাওয়া যায়। দোকানের লোকটা ইংরেজি জানে না। আমি ইন্দো ভাষা জানি না। মুঠোফোনের সিম কেনা হয়নি, তাই গুগলের সাহায্যও চাইতে পারছি না। দুজনেই ইশারা পর্বে অতি কষ্টে বুঝিয়ে খাবার দিতে বললাম। কি এমন বুঝিয়েছিলাম কে জানে! থালাতে ঝোল মাখানো এমন কিছু চলে আসলো যার ব্যাপারে আর কিছু  না বলি। ওই সময়টাতে খুব খুব মনে পড়েছে প্রাণের ভাষা বাংলার কথা। দেশে কত সহজেই হাজার হাজার অভিব্যক্তি বোঝাতে পারি মুহূর্তেই; বাংলাতে। অথচ ভাষার গড়মিলে কতটা অসহায় আমরা।আহা বাংলা! প্রাণের বাংলা।

ইন্দোনেশিয়া থেকে চলে আসার আগের দিন। সকালের খাবারের টেবিলের ওপাশে ইন্দো এক বয়স্ক লোক এসে যোগ দিলেন। কোথা থেকে এসেছি এ প্রশ্নের সাথে সম্ভাব্য উত্তরও জুড়ে দিলেন। ভারত নাকি পাকিস্তান? না সূচক মাথা নেড়ে বললাম, বাংলাদেশ।

আমার কথাটা কেড়ে নিয়ে উনি বললেন, ‘আমি যদি ভুল না করে থাকি, তোমরা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছ।’

আমি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম খানিকটা। তারপর ইতিহাস যতটুকু জানি বললাম সব। উনি স্যালুট দেবার ভঙ্গি করে বলেছিলেন, ‘শ্রদ্ধা রইলো তোমার ভাষার প্রতি’

আহা বাংলা! প্রাণের বাংলা! মায়ের বাংলা!

জাকার্তার আরেকটা পর্ব দিয়ে শেষ করি। শহীদ মিনার দেখেছি ইন্দোনেশিয়ার রাজধানীতে। কিভাবে? গল্পটা বলেই ফেলি। শহরের প্রাণকেন্দ্রের জাদুঘরে নানান দেশের মুদ্রা একটা বড় কক্ষে রক্ষিত আছে। ঢুকেই পাগলের মতো খুঁজছিলাম বাংলাদেশের মুদ্রা। হঠাৎ চোখে পড়লো শহীদ মিনার। দু'টাকার কাগুজে নোটের ওপর চিরচেনা শহীদ মিনার। অনেকের কাছে হয়ত কিছুই না। কিন্তু, হাজার হাজার মাইল দূরে এ ছিল আমার জন্য বড় পাওয়া। দু'টাকার নোট এত দামী তো আর কখনও মনে হয় নি!

রাত পেরোলেই একুশ। দেশের মাটিতে বসে বাংলাকে আদর করে অন্তরে রাখা হয় না অতটা। মাটির স্পর্শ থেকে দু দন্ড দূরে গেলেই কাঁদায় বাংলা। এখন দেশের মাটিতে বসেও ঢের বুঝতে পারি বাংলা আমার কী....

আহা বাংলা! প্রাণের বাংলা!

মায়ের বাংলা! আমার বাংলা!

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।