অতিরঞ্জিত রোমান্টিসিজম বনাম সম্পর্কজনিত বিষণ্নতা

ঢাকা, ১২ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

অতিরঞ্জিত রোমান্টিসিজম বনাম সম্পর্কজনিত বিষণ্নতা

তামান্না তাবাসসুম ৫:১৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

অতিরঞ্জিত রোমান্টিসিজম বনাম সম্পর্কজনিত বিষণ্নতা

বড় হতে হতে ভালোবাসার মানুষের যে চিত্র আমরা আঁকি তার ম্যাপ আমাদের মাথায় তৈরি হয় রোমান্টিক সিনেমাগুলো দেখে।

রোমান্টিক নাটক সিনেমা দেখতে দেখতে, প্রেমের কবিতা উপন্যাস পড়তে পড়তে ছোটবেলা থেকেই মানুষের মনে লাভ লাইফ নিয়ে এক ধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি হয়।

সেইসঙ্গে মনে গেঁথে যায় কিছু অবাস্তব ধ্যান-ধারণা। এই যেমন প্রেম অমর, প্রেম স্বর্গ থেকে আসে আবার স্বর্গেই চলে যায়, এভরি থিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার, ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব, কোনো রাজপুত্র/রাজকন্যা এসে আমার জীবন বদলে দিবে, ভালোবাসলে চোখ দেখেই সব বুঝে নেয়া যায়; ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা মুখ ফুটে বলতে হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি।

টিনেজে প্রেম বিষয়ক যে ভুলগুলো মানুষ করে সেক্ষেত্রে এধরনের চিন্তা ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

এদিকে, জীবন-তো আর সিনেমা না। এখন কেউ যদি ভাবে যে ভালোবাসা দিয়ে তার পকেটমার ড্রাগ এডিক্টেড প্রেমিককে বদলে ফেলবে, তাহলে তার কপালে ভালোই দুর্গতি আছে।

‘এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার’ বলে অসামাজিক কর্মকাণ্ড করলে-তো ধরা খাবেই। বাস্তবের আবেগের সাথে বিবেকবোধ‌ও দরকার।

বাস্তবে নিজের ভাগ্য পরিশ্রম করে নিজেকেই বদলাতে হয়, কেউ এসে জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় জীবন বদলে দেবে এমন আশা নিয়ে বসে থাকলে সারা জীবন অপেক্ষাতেই কাটাতে হবে।

চোখ দেখেই কেউ তার মনের কথা বুঝে যাবে এমন প্রত্যাশাও অমূলক। দুটো মানুষ অনেক দিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে দুজন দুজনকে অনেক ভালো বুঝে যায়, ধীরে ধীরে দুজন দুজনের মনের মত হয়, চিন্তা ভাবনার মিল হয়। দুটো অচেনা মানুষের হুট করে সে রকম হওয়া কখনোই সম্ভব না।

আরো কিছু ভোগাস কনসেপ্ট আছে, এই যেমন লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। প্রথম পলকে আসলেই কি ভালোবাসা হওয়া সম্ভব? আর হলেও তার স্থায়িত্ব কতক্ষণ? এক পলকে হওয়া ভালোবাসা ভাঙতেও ওই এক পলকই যথেষ্ট। ‘সোলমেট’ এর ধারণাটাও তেমন।

সমস্যাটা হয় তখন যখন মানুষ তার লাভ লাইফকে কল্পনার রোমান্টিকতার সাথে মেলাতে পারে না তখন তার মধ্যে একটা ফ্রাস্ট্রেশন আসে। প্রায়ই দেখবেন অনেকে ফেসবুকে এমন ফিল্মি ভিডিও শেয়ার দিয়ে আফসোসের ক্যাপশন দেয় যে লাইফে একবারও যদি কেউ আমার জন্য এমন করতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাস্তবে যদিও কেউ এমন ফিল্মি হতে পারে না কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠিকই চেষ্টা করে একটু রঙ চং মাখিয়ে নিজেদের প্রেজেন্ট করতে। আসলে নিজের ফ্যান্টাসিকে কিছুটা প্রকাশ করা যায় বলেই হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া এত জনপ্রিয়। এইযে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি সিনেমাটোগ্রাফিগুলো হয় এটা তো মানুষের এই ফলস নিডের কারণেই।

এই যে কিছু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা নিজের সম্পর্ককে রং চং মেখে প্রকাশ করল। তা দেখে আবার আরেক দল মানুষের ফ্রাস্টেশন হয়, তারা ভাবে ওর লাইফ এত রোমান্টিক আমার কেন এমন না।

প্রেমের সময় মানুষ যাও মাঝে মাঝে ফ্যান্টাসি-কে প্রশ্রয় দিতে পারে, দুজন দুজনকে বিভিন্ন সিনেমাটিক স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু বিয়ের পর এত এত দায়িত্ব কাঁধে নিতে গিয়ে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। তখন প্রায়ই অনেকে অভিযোগ করে- সে আমাকে ভালোবাসে কিন্তু রোমান্টিক না। তৈরি হয় সম্পর্কজনিত অবসাদ আর হতাশা। তখনই শুরু হয় তুমি বদলে গেছো টাইপ কথা। আর আমার জামাই তাহসানের মত হল না কেন, আমার বউ শাবানার মত হল না কেন এই টাইপ আফসোস।

আসলে সিনেমায় উপন্যাসে নাটকে আমরা যা দেখি, সেগুলো আমাদের কাছে বিক্রি করার জন্য প্রোডাক্টটাকে অতি আরোপিত করে রং চং মাখিয়ে লেখা হয়। সেই লেখা ১০০ বার কাটাকুটি করা হয়, দুই মিনিটের একটা দৃশ্যের জন্য দুই মাস ধরে রাতের ঘুম হারাম হয় পরিচালকের। একি দৃশ্য ১০০ বার কাট করে নেয়া হয়, আবার সেই স্বপ্নের মতো ভালবাসা ২ ঘণ্টাতেই শেষ হয়ে যায়।

সিনেমার নায়ক-নায়িকার প্রেম-তো এক-দেড় ঘণ্টার অথচ দেখেন আপনি আপনার ভালোবাসার সাথে কাটাতে পারবেন পুরো একটা জীবন। প্রিয় মানুষের সাথে থাকলে মনের ভেতরে যে প্রশান্তি সেটা তো আর সিনেমায় দেখাতে পারে না। তাই তারা অতি আরোপিত কিছু জিনিস দিয়ে সেটাকে মেকআপ করার চেষ্টা করে। আর তাই দেখে আমরা আফসোস করি। নায়ক-নায়িকারা রিয়েলি দেখতেও এত সুন্দর না যেমনটা আমরা তদের পর্দায় দেখি। তাদের জিম করা ফিগার, রূপের পিছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা, এডিট করা ছবি দেখে নয়টা পাঁচটা বাসে ঝুলে অফিস করা আমাদের অফসোসের শেষ নাই।

তেমনি তাদের লাভ লাইফও তারা যেমনটা দেখায় তেমনটা না। এদের মধ্যেই তো আত্মহত্যার, ডিভোর্সের হার অনেক বেশি।

বিনোদনকে বিনোদনের জায়গায় রাখাই ভালো। সোশ্যাল মিড়িয়ায় অন্যের রোমান্টিক ক্যাপশনের ছবি নিজের রোজকার জীবনের সাথে গুলিয়ে ফেললেই নিজেকে অকারণে অসুখী মনে হবে। বাস্তবতা বুঝে সম্পর্কজনিত বিষণ্নতা থেকে বেরিয়ে আসুন। তাই বলে আবার রসকষহীন হয়ে যাবেন না যেন। বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে নিজের ভালোবাসার গল্প নিজে সাজান। সবাইকে ভালবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখাক: ব্লগার ও বিতার্কিক শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও