ঢাকা শহরের সূর্যাস্ত

ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

ঢাকা শহরের সূর্যাস্ত

জাহিদুল ইসলাম ১২:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৬, ২০১৯

ঢাকা শহরের সূর্যাস্ত

ঢাকা শহর! নাম নিতেই মনে হয় এক আজব শহর। এই শহরটি কারো কাছে স্বপ্নের, আবার কারো কাছে সময়খেকো। আসলেই বড় আজব শহর এই ঢাকা।

ছোটবেলায় আমরা কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় পড়তাম ‘শহর শহর ঢাকা শহর আজব শহর ঢাকা, এই শহরেই আছে অনেক গলি আঁকাবাঁকা।’ শামসুর রাহমানরা যে সময় পুরোনো ঢাকায় থাকতেন, সে সময় হয়তো পুরোনো ঢাকা এত বেশি চিপা গলি ঘিঞ্জি ছিল না। তার পরেও যেহেতু কবিরা শতবছরের কল্পনা করতে পারেন তাই তিনি লিখে গেছেন।

জানি না তিনি বেঁচে থাকলে এই শহর নিয়ে আর কী কী লিখতেন। এই শহরে এখন যেভাবে দালানকোঠা উঠছে, ভাবী ভবিষ্যতে হয়তে সূয্যি মামারে দেখাই যাবে না দালানকোঠার আড়ালে।

কিছুদিন আগে একটি বিষয় মাথায় আসে, আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে কিংবা সমুদ্রসৈকতে পর্যটকরা সূর্যাস্ত দেখে। কিন্তু ঢাকা শহরে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে চাওয়া আর অমাবস্যায় চাঁদের দেখা পাওয়া সমান। অমাবস্যায় অন্ধকার ঢেকে রাখে চাঁদকে তেমনি এই শহরে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণও সূর্যাস্তকে ঢেকে রেখেছে।

‘আমার দেখা ঢাকা’ গ্রন্থে হাফিজউদ্দিন লিখেছেন, ‘আশির দশকেও নীল আকাশ আর লালচে রোদের যে বিকেল এই শহরে দেখতাম, সেই নীল আর লাল রং ঢাকায় এখন যেন আর দেখতে পাই না। দেখি না তারা জ্বলতে থাকা নীলচে-কালো আকাশের নিচে সুন্দর নিরিবিলি সন্ধ্যা যখন পাওয়া যায় তাজা বাতাস।’ যা এখন ঢাকার বাসিন্দারা কল্পনাও করতে পারেন না।

এখন বাড়ি আর অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ঠাসা এই শহরে সন্ধ্যাবেলা সূয্যিমামা অস্ত যায় না, তাকে অস্ত পাঠানো হয়। বহুতল নতুন বাড়িঘর আর অফিস ভবন যেভাবে দমবন্ধ-করা এক অনুভূতি তৈরি করেছে তাতে শহরের কোনো এলাকাতেই আর আরাম করে হাঁটার মতো নিরিবিলি, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ নেই। সব জায়গায় মস্তিষ্কপীড়িত করে গাড়ির হর্নের তীব্র শব্দ। চালকরা উচ্চমাত্রার গাড়ির হর্ন অনুভূতিহীনভাবে বাজিয়ে যায় মধ্যরাতেও। এখানে সূর্য অস্ত গেলেও আসে না নিশুতি রাত।

ঢাকার বর্তমান সন্ধ্যাগুলোতে বিভিন্ন রাস্তায় বিজ্ঞাপনের যে নীল আলো দেখা যায়, সেই নীলে চিন্তাশীলতা বা ভাবনার গভীরতা কোথায়? যে গভীরতা মনের বিষণ্ন আর সেই সঙ্গে উষ্ণ দিকগুলো অনুভব করতে সাহায্য করে, সেই কাব্যময় অনুভব তো চটক আর চাকচিক্য বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা নীল আলোতে নেই। রাতে দোকানে, রাস্তার বিজ্ঞাপনে জ্বলে লাল-নীল আলো। বাজারের প্রচার তুলে ধরা লাল আলোতে লাল রঙের প্রতিবাদী, রাগী, রোমান্টিক, শক্তিশালী রূপটি কি আমরা দেখতে পাই? তবে কি ঢাকা শহরে চিন্তার সূর্য অস্ত যাচ্ছে?

ঢাকা শহরে দিন দিন ভবনের উচ্চতা কেবল বাড়ছেই। আর বাধা পাচ্ছে সূয্যি মামার আলো। নীল আকাশের দিকে কোনো দুপুর বা বিকেলে তাকিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যাওয়ার অভ্যাসই গড়ে উঠছে না আকাশ দেখতে-না-পাওয়া এই শহরের কমবয়সীদের।

সেই যে ফরাসি প্রতিবাদী তরুণরা বলেছিল, ‘জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর সাজসজ্জার মধ্যে চোখ কেবল দেখতে পায় সাজিয়ে রাখা পণ্য আর তাদের দাম।’ কেবল সব রকমের ক্ষুধা মিটলেই কি একজন প্রকৃত মানুষ জীবনে সার্থকতা আর আনন্দ খুঁজে পায়? নিয়মিত পেট ভরে খেতে পারলে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে না, কিন্তু মানুষ যদি ভোগ করার চিন্তা ছাড়া অন্য কিছু কখনো না ভাবে—তাহলে সেই চিন্তাহীন মানুষের সঙ্গে গৃহপালিত মুরগি বা পশুর পার্থক্য কোথায়? আর ফরাসি তরুণরা যথার্থই বলেছিলন, ‘কংক্রিট লালন করে অনীহা আর উদাসীনতা।’

এই শহরে একদিকে বড় বড় বাবুদের সগৌরব উপস্থিতি, হাঁকঢাক। অন্যদিকে প্লাটফর্মে অসহায় মানুষের করুণ নিদ্রা। এরা ছিন্নমূল মানুষ। আমাদের দেশে রাতের স্টেশনে শত শত ছিন্নমূল মানুষ আশ্রয় নিতে দেখা যায়। এমন পরিবেশে সময় কাটানো আর বেড়ে ওঠা মানুষরা তাহলে কী করে লিখবে কবিতা, আগ্রহ খুঁজে পাবে ইতিহাসে, তৈরি করবে চিন্তাশীল চলচ্চিত্র আর শিখবে—সেই রাজনীতি যা তৈরি করবে নতুন মানুষ।

এ শহরের এমন রূপই এখন চোখে পড়ে যেখানে অগভীর চর্চার প্রতাপ দূরে ঠেলে দিচ্ছে গভীর ভাবনার গুরুত্ব। আর গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা না থাকলে মানুষ বুঝতেও পারে না কোন গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তার জীবনে নেই এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সময়ে ঢাকা শহরটি ঢেকে রাখা ধূসরতা, বাদামি বিবর্ণতা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে মরুভূমির কথা। প্রতিবাদী ফরাসি তরুণরা বলেছিল, ‘মানুষের আগে এসেছিল অরণ্য, পরে আসবে মরুভূমি।’ কিন্তু ঢাকা শহর আমার কাছে ততক্ষণই ঢাকা শহর যতক্ষণ তা চিন্তা আর রূপের দিক থেকে মরুভূমি নয়।

ঢাকার শহরের এই নগরীকে স্বপ্নের মতো সুন্দর, বাসযোগ্য এবং আরামদায়ক করতে প্রত্যেক নগরবাসীর নিজস্ব কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যে যার অবস্থান থেকে সেই দায়িত্বগুলো পালন করে গেলে আমাদের এই প্রিয় শহর কোনোভাবে পিছিয়ে থাকতে পারে না, বিশ্বের বাসের অযোগ্য শহরের কিংবা দুর্ভোগের শহরের তালিকায় ঠাঁই পেতে পারে না।

দুঃস্বপ্নের বোঝা আর অনাগত বিপদের শঙ্কা বুকে বয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি দিন পার করতে চাই না আর। অনেক সম্ভাবনা এবং সুন্দরের হাতছানি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এই প্রিয় রাজধানী ঢাকা শহর দুঃস্বপ্ন কিংবা দুর্ভোগের শহর হিসেবে বিবেচিত হোক আমরা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করি না। একটি চমৎকার বাসযোগ্য স্বস্তিকর জীবনের শহর হিসেবে গণ্য হোক বিশ্বজুড়ে, অস্ত না যাক সম্ভাবনার সোনালি সূর্য, মনেপ্রাণে চাই।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ছবি: দীপ্ত কুরী

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।