প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছরে কেমন আছে জাহাঙ্গীরনগর!

ঢাকা, ২৯ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছরে কেমন আছে জাহাঙ্গীরনগর!

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯

প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছরে কেমন আছে জাহাঙ্গীরনগর!

বাংলাদেশ জন্মের প্রায় সমসাময়িক সময়ে প্রতিষ্ঠা হয় সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ৪টি বিভাগ, ২৩ জন শিক্ষক ও ১৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও ৩টি ইনস্টিটিউট মিলিয়ে ১৬ হাজার শিক্ষার্থী ও ৭০০ জন শিক্ষক রয়েছে এখানে। প্রায় ৭০০ একরবেষ্টিত এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, ব্যবসাসহ নানা ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে বেশ সুনামের সাথে ভূমিকা রাখছে। দেশকে উপহার দিয়েছে দেশসেরা গবেষক, শিক্ষক, নির্মাতা , নাট্যকর্মী, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব।

প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশত বছরে বহুদূর এগিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর। স্বাধীনতার পরে স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রায় সবকটি ছাত্র আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল ও নীতিমালা প্রণয়েনের নির্দেশনা দেয়।

তবে প্রতিষ্ঠার এতবছর পর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যতটুকু অর্জন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল তার কিঞ্চিৎই আমরা পেয়েছি। কয়েকটি দালান-ইমারত দিয়ে সবুজের মাঝে লালচিহ্ন আঁকলে বিশ্ববিদ্যালয় হয় না। আমাদের হাতে গোনা কয়েকটা বিভাগ ছাড়া বেশিরভাগ বিভাগে কোনো গবেষণা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দও অপ্রতুল।

নামে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও হলগুলোতে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের গণরুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। র‌্যাগিং নামে এক অভিশাপ কিছু ‘সহমত ভাই’ প্রজন্ম তৈরি করছে। তাদের শেখানো হচ্ছে ‘যায় যদি যাক প্রাণ, বড় ভাই ভগবান’। হলগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য এক ভীতির রাজ্য তৈরি করেছে। র‌্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা করার প্রয়াসকে প্রথম বর্ষেই দমিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশ্বাস দিয়ে মাঠ গরম করেন কিন্তু হলগুলোতে র‌্যাগিং বন্ধ করার দায়িত্ব নেয় না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি ভয়াবহ সংকট হচ্ছে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। মাদকের করাল গ্রাসে নিভে যাচ্ছে হাজারো ছেলে-মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। এই মাদকের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা ও ছাত্ররা জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে সিগারেট পর্যন্ত ধরেনি। তাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কি তবে মাদকসেবী তৈরির কারখানা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক প্রায় তলানিতে। সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে গেলে দেখা যায় শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের কতটা বিরোধপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। রেজাল্টের দীর্ঘসূত্রিতা তো রয়েছে। তাছাড়া নিজ পছন্দের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক বানানোর টার্গেট নিয়ে রেজাল্ট ম্যানুপুলেট করার অভিযোগ রয়েছে অহরহ।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া কেউ শিক্ষক হতে পারছেন না। শিক্ষকদের অনেকে ক্লাসে পড়ান না বা পড়াতে পারেন না অথবা পড়াতে আগ্রহী থাকেন না। অ্যাটেন্ডেসের ১০ মার্কের মুলা ঝুলিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে নিয়ে অখাদ্য গলাধকরণ করানো হয়।

সহশিক্ষা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা আরো বাড়ানো দরকার। টিএসসি কেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর পর্যাপ্ত রুম নেই। বছরে ১০ হাজার টাকার মতো সামান্য টাকা দেয়া হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই জায়গায় আরেকটু নজর দিলে সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত জাহাঙ্গীরনগরের সহশিক্ষা কার্যক্রম আরো বেগবান হবে।

শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চেয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্সে বেশি সময় দেন। অনেক শিক্ষক সপ্তাহের অন্তত ৩-৪ দিন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেন।

এক সময় এই ক্যাম্পাসে অনেক পরিযায়ী পাখি আসতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এখন পিকিনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। মানুষের পদচারণার কারণে পাখি আর তেমন আসছে না।

পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা, বৈশাখী মেলা এতসব ব্রান্ডিং করে বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিণত করা হয়েছে একটি বিনোদনকেন্দ্রে। অথচ উদ্যেক্তা মেলা, বিজ্ঞান মেলা, বইমেলা, দেশি-বিদেশি স্কলারদের নিয়ে সেমিনার করা অথবা এসব নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রয়াস কম।

শিক্ষকরা শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে বেশি সময় দিচ্ছেন। অনেক শিক্ষকের গবেষণা বা ক্লাস নেয়ার চেয়ে প্রশাসনের পদে আসীন হওয়ার খায়েশ বেশি।

পদ-পদবির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে গত বছর শিক্ষকরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে একই সময়ে ইউজিসির গবেষণায় স্বর্ণপদক তালিকায় আমাদের কোনো শিক্ষকের নাম নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সমাবর্তন হয় না। ৪৯ বছরে মাত্র ৫টি সমাবর্তন হয়ছে। শেষ ২০১৫ সালে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অথচ গ্রাজুয়েটদের জন্য সমাবর্তন একটা অন্যতম উৎসব।

গত ২৮ বছর ধরে ছাত্রসংসদগুলো বন্ধ আছে। ছাত্র নেতৃত্ব বেরিয়ে আসছে না। একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাধারণ ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ নেই। প্রশাসন কাঁঠাল ছুড়ার অপরাধে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়া আয়ত্ব করে ফেলেছে কিন্তু প্রশাসনে ও হলগুলোতে ঘাপটি মেরে থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

এখন ১৪০০ কোটি টাকার বিশাল এক বাজেট এসেছে। আরও বড় বড় ইমারত তৈরি হবে। কিন্তু এতে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হবে? গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে? ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি হবে? মাদকের বিস্তাররোধ হবে? শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ভালো হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট ভুলে আমরা এটাকে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর পাঁয়তারা করছি।

তাই অর্ধশত বছরে এসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে চাই জাহাঙ্গীরনগর তার ত্রুটিগুলো নিয়ে ভাবুক। সমাধানের রাস্তা বের করুক। শুধু ইমারত নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত পরিবর্তন আসুক।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও